দেশে এক কোটির বেশি শিশুকে করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৩০ লাখ ডোজ টিকা দেওয়া হবে। এই কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার পরীক্ষামূলকভাবে মানিকগঞ্জে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১১১ শিক্ষার্থীকে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে।
গতকাল মানিকগঞ্জের কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষামূলক টিকাদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে এক কোটি শিশু টিকা পাবে। হাতে এখন ৬০ লাখ ডোজ ফাইজারের টিকা আছে। সারাদেশে ২১টি জায়গায় টিকাদান কার্যক্রম চালানো হবে। ঢাকায় একটি বড় অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও টিকা দেওয়া হবে।
মানিকগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫০, মানিকগঞ্জ সুরেন্দ্র কুমার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫০, জাহিদ মালেক উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ এবং কাটিগ্রাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ জনসহ মোট ১২০ জন মাধ্যমিক শিক্ষার্থীকে পরীক্ষামূলক টিকা প্রদানে মনোনীত করা হয়। তাদের মধ্যে ১১১ শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়া হয়েছে। টিকা নেওয়ার আগে জন্মনিবন্ধন কার্ডের মাধ্যমে টিকা নিবন্ধন করে শিক্ষার্থীরা। টিকা দেওয়ার পর তাদের বিশ্রাম কেন্দ্রে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। তাদের ১০ থেকে ১৪ দিন পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ছেলেমেয়েরা স্কুলে আসছে। তারা যাতে করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত থাকে, সে জন্য পরীক্ষামূলকভাবে স্কুল শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া হলো।
এদিকে, করোনার টিকা দিতে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের তালিকা চেয়েছে সরকার। আগামী ১৮ অক্টোবরের মধ্যে এই তথ্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক এই নির্দেশনা দেন।
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মানিকগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোবাশ্বির রহমান রাফি ও জাহিদ মালেক উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসমিয়া আক্তার তোয়াকে দুপুর ১২টায় ফাইজারের টিকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রথম শিশু শিক্ষার্থী হিসেবে করোনার টিকা নিয়ে বেজায় খুশি রাফি। টিকা নেওয়ার পর সে জানায়, প্রথমে একটু ভয় ভয় লাগছিল। টিকা দেওয়ার পর খারাপ লাগেনি। প্রথম মেয়ে শিশুর টিকা নিয়ে তোয়া জানায়, স্কুল খোলার পর থেকে ভয়ে ভয়ে ক্লাস করেছি। এখন টিকা নিয়ে নিশ্চিন্তে ক্লাস করতে পারব।
অভিভাবকরাও খুশি হয়েছেন তাদের সন্তানরা টিকা পাওয়ায়। তারা বলেন, নিরাপদে ক্লাস করতে শিশুদের করোনার টিকা দেওয়া হয়েছে। এতে তারা আতঙ্কে থাকবে না।
মানিকগঞ্জ জেলার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. লুৎফর রহমান জানান, প্রথম পর্যায়ে শহরের দুটি স্কুলের ৫০ জন করে ১০০ শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও পরে বিশেষ বিবেচনায় মন্ত্রীর নামে স্থাপিত গড়পাড়া জাহিদ মালেক উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ ও সদর উপজেলার আটি গ্রামের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ জনসহ মোট ১২০ জনকে টিকা দেওয়ার জন্য মনোনীত করা হয়। মনোনীত অধিকাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত হলেও ৯ জন শিক্ষার্থীর জ্বরসর্দি থাকায় তাদের টিকা দেওয়া হয়নি। ১১১ শিক্ষার্থীকে পরীক্ষামূলকভাবে টিকা দেওয়া হয়েছে। তারা আগামী ১৪ দিন পর্যবেক্ষণে থাকবে।
মানিকগঞ্জ কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, টিকা নেওয়ার পর কোনো শিশু যদি অসুস্থ বোধ করে কিংবা যদি কারও কোনো ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়, তা পর্যবেক্ষণের জন্য মেডিকেল টিম ছিল। এ ছাড়া টিকা নেওয়া শিশুরা বাড়িতে যাওয়ার পর কোনো ধরনের সমস্যায় পড়ছে কিনা, সেদিকেও সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি বলে তিনি জানান।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে এ বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করে সরকার। এতদিন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুরা এই কার্যক্রমের বাইরে ছিল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে ইতোমধ্যে পাঁচ কোটি মানুষকে করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়া হয়েছে। আগামী বছর জানুয়ারির মধ্যে দেশের ৫০ ভাগ মানুষকে করোনার টিকা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সময়মতো টিকা সংগৃহীত হলে আগামী এপ্রিলের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ মানুষকে টিকা দেওয়া যাবে। তিনি বলেন, দেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। এখন সংক্রমণের হার ২.৪। মৃতের সংখ্যাও অনেক কম।