পাখিটিকে প্রথম কখন দেখেছি মনে করতে পারছি না, তবে প্রথম ছবি তোলার ক্ষণটি মনে আছে। একটি কনফারেন্সে প্রবন্ধ উপস্থাপন করার জন্য ভারতের কেরালা রাজ্যের কোচি সিটি বা কোচিন গেলাম ২০১০-এর ২৪ নভেম্বরে। কনফারেন্স ভেন্যু ছিল হোটেল শেরাটন কোচিন। হোটেলের রিসোর্ট অংশে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। মূল ভেন্যু থেকে রিসোর্টে স্পিডবোটে যেতে হয়। অবশ্য বিষয়টি আমার কাছে বেশ থ্রিলিংই ছিল। কারণ যতবার ওখানে যাওয়া-আসা করতাম, ততবারই কোনো না কোনো পাখির দেখা পেতাম। কনফারেন্স শেষে ২৯ নভেম্বর সকালে ফেরার জন্য তৈরি হয়ে নিচে নেমে এসেছি। অন্যরা তখনও না নামায় হাতে কিছুটা সময় পেলাম। কাজেই ক্যামেরা হাতে এদিক-ওদিক করছি। একসময় হোটেলের পাশের খোলা জায়গাটায় কিছু মহিষ চড়তে দেখলাম। মহিষের সঙ্গে গো-বকগুলোর বেশ ভাব। গো-বকগুলো তাদের গায়ের পোকা খাওয়ায় ব্যস্ত। ওদের ছবি তোলার সময় হঠাৎ ক্যামেরার ফ্রেমে নীল-বাদামি রঙের একটি পাখি ভেসে উঠল। অনিন্দ্য সুন্দর পাখিটির দেহের নীলের কারুকাজটা চমৎকার। ততক্ষণে সহকর্মীরা সবাই নেমে গেছে। কাজেই স্পিডবোটে উঠতে হবে। কোনো রকমে ৩-৪টি ক্লিক করে দ্রুত ক্যামেরা গুছিয়ে স্পিডবোটে উঠলাম। এরপর এ দেশের বহু জায়গায় বহুবার পাখিটির ছবি তুলেছি। সাম্প্রতিককালে ওর বেশকিছু ভালো ছবি তুলেছি রাজশাহীর সিমলা পার্ক ও পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জের তেলিয়াপাড়া থেকে।

কেরালার কোচি সিটি এবং এ দেশের রাজশাহী ও পঞ্চগড়ে দেখা পাখিটি বাংলাদেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি নীলকণ্ঠ। সাত-কাইয়া, তাওয়া, কেউয়া, থোরমোচা, নীলাচল নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Indian Roller, Indian Blue Roller, Northern Roller বা Southern Roller। বৈজ্ঞানিক নাম Coracias benghalensis। এতদিন দেশের পশ্চিমাঞ্চলের বসবাসকারী Coracias benghalensis benghalensis এবং পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী Coracias benghalensis affinis নীলকণ্ঠের দুটি উপ-প্রজাতি হিসেবে পরিচিতি থাকলেও বর্তমানে বিজ্ঞানীরা ওদের আলাদা দুটি প্রজাতি- নীলকণ্ঠ (Coracias benghalensis) ও ইন্দোচীনা নীলকণ্ঠ (Coracias affinis)  হিসেবে গণ্য করছেন। যাহোক, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে নীলকণ্ঠের বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।

প্রাপ্তবয়স্ক নীলকণ্ঠের দেহের দৈর্ঘ্য ২৬-৩৪ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৬৫-৭৪ সেন্টিমিটার ও ওজন ৯০-১৬৫ গ্রাম। পালকে তিন রকমের নীল রং দেখা যায়, হালকা নীল, আকাশি নীল ও গাঢ় নীল। মাথা, ডানা, পেট ও লেজে এই তিন নীলের চমৎকার সমন্বয় রয়েছে। ওড়া অবস্থায় ডানায় বিভিন্ন মাত্রার নীল চোখে পড়ে। ঘাড়-গলা, কপাল ও বুকের পালক লালচে-বাদামি। গলা, কান-ঢাকনি ও বুকে হালকা সাদাটে লম্বালম্বি দাগ দেখা যায়। চোখ বাদামি। শক্তপোক্ত কালো চঞ্চু। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল হলদে। স্ত্রী-পুরুষের চেহারা একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পালক ফ্যাকাশে ও বুক-গলায় বেশি দাগ থাকে। দেহের হালকা রং ও গলার লালচে-বাদামি দাগের মাধ্যমে ইন্দোচীনা নীলকণ্ঠ থেকে ওদের পৃথক করা যায়।

ওদের মূলত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব উপযুক্ত পরিবেশ, যেমন- গ্রামাঞ্চল, তৃণভূমি, ঝোপঝাড়, উন্মুক্ত এলাকায় দেখা যায়। সচরাচর একাকী বিচরণ করে। নীলকণ্ঠ মূলত কীটপতঙ্গভুক পাখি। গাছের শাখায় বা বৈদ্যুতিক তারে বসে থাকে ও হঠাৎ উড়ে এসে পোকামাকড় ধরে আবার ডালে বা তারে ফিরে যায়। সচরাচর নীরব থাকলেও মাঝেমধ্যে 'চাক চাক' শব্দে ডাকে।

মার্চ থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় ওরা অত্যন্ত কোলাহলপ্রিয় হয়ে যায়। মরা তাল, খেজুর, নারিকেল বা অন্য কোনো উপযুক্ত জীবিত গাছের প্রাকৃতিক কোটর বা খোঁড়লে বাসা বাঁধে। স্ত্রী ৩-৪টি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয় ও ছানাদের লালনপালন করে। ডিম ফোটে ১৭-১৯ দিনে। ছানারা ৩০-৩৫ দিন বয়সে উড়তে শিখে। আয়ুস্কাল ৫-৬ বছর।

লেখক: অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর