পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো সংস্কার করা হচ্ছে। বিদ্যমান জনবল কাঠামো পরিবর্তন করে নিম্ন পর্যায়ের ক্যাডার পদের সংখ্যা কমানো হচ্ছে। তার পরিবর্তে বাড়তি উচ্চপদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ জন্য বিভিন্ন ইউনিটে পুলিশ সুপার (এসপি) ও সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) ১৭৮টি পদ বিলুপ্ত করা হবে। এরই মধ্যে এসব পদ বিলুপ্ত, সমন্বয় ও সৃজনের ব্যাপারে আর্থিক অনুমোদন দিয়েছে অর্থ বিভাগ। এরপর সচিব কমিটির অনুমোদনের জন্য সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ।

মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, আগামী ১৮ অক্টোবর সোমবার মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সম্মতি হলেই পূর্বের বিভিন্ন ইউনিটের এসপি ও এএসপির ১৭৮টি পদ বিলুপ্ত হবে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বিলুপ্ত পদের বিপরীতে চারটি অতিরিক্ত আইজিপি (গ্রেড-২), ডিআইজি ১৮টি, অতিরিক্ত ডিআইজি ৮৮টি, পুলিশ সুপার (এসপি) ২০টি এবং ৪৮টি অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের পদ সৃষ্টি করা হবে। এ জন্য প্রতিবছর ব্যয় হবে সাত কোটি ৭৭ লাখ চার হাজার ২০০ টাকা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ২ আগস্ট পুলিশ অধিদপ্তর থেকে ২২৮টি পদ সৃজন, বিলুপ্ত, সমন্বয় বিবরণসহ একটি প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব ও আইজিপির উপস্থিতিতে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়। এতে বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের মোট পদসংখ্যা ৩ হাজার ১২৩ পদ অপরিবর্তিত রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী বিলুপ্ত, সৃজন ও সমন্বয়-সংক্রান্ত আলোচনা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সাংগঠনিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার আনা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, এটি প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে অনুমোদন নিতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ তৈরি করা হয়েছে।

সূত্র বলছে, পুলিশ অধিদপ্তর থেকে পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মাধ্যমে বিভিন্ন পদবির (এসপি ও এএসপি) ১৭৮টির চেয়েও আরও বেশি সংখ্যক (২২৮টি) পদ বিলুপ্ত করে সমসংখ্যক উচ্চতর পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল- অতিরিক্ত আইজিপির চারটি, ডিআইজির ১৮টি, অতিরিক্ত ডিআইজির ১০০টি, এসপির ২০টি ও অ্যাডিশনাল এসপি ৮৬টিসহ ২২৮টি পদ সৃজন ও সমন্বয় এবং ১২২টি যানবাহন টিওঅ্যান্ডইভুক্ত করলে পুলিশ অধিদপ্তর থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয়। ওই প্রস্তাবটি সম্মতি প্রদানের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে সম্মতি প্রদানের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে পত্র দেওয়া হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ওই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে পরে অর্থ মন্ত্রণালয়কে সম্মতি প্রদানের অনুরোধ করে। অর্থ বিভাগ পর্যালোচনা শেষে ২০টি পুলিশ সুপার (এসপি) ও ১৫৮টি সহকারী পুলিশসহ (এএসপি) ১৭৮টি বিলুপ্ত করে সমপদে অতিরিক্ত আইজি (গ্রেড-২) চারটি, উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ১৮টি, অতিরিক্ত ডিআইজি ৮৮টি, পুলিশ সুপার (এসপি), ২০ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ৪৮টিসহ ১৭৮টি পদ সৃজন ও সমন্বয়ের সম্মতি প্রদান করে। পদগুলোর বেতন স্কেল এবং নিয়োগের যোগ্যতা/শর্ত অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে।

১৯৮৩ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ পদগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে র‌্যাবের কোটাসহ পুলিশের এএসপির মঞ্জুরি করা পদ রয়েছে এক হাজার ৩৬৭টি।

এসএসপি পদসংখ্যা কমিয়ে উচ্চপদ সৃষ্টির খবরে মাঠপর্যায়ে কর্মরত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (পুলিশ পরিদর্শক) অনেকের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, একজন যোগ্য পুলিশ পরিদর্শকের স্বপ্ন থাকে এএসপি হিসেবে পদোন্নতি পাওয়া। অনেক যোগ্য পরিদর্শক এএসপি নয়, পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ সুপারও হয়েছেন। আগামীতে আরও অনেকেই হবেন। কিন্তু নিচের পদ যদি কম হয়, তাহলে পদোন্নতির স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাবে।

তারা বলেন, এএসপি পদ বিলুপ্ত করে উচ্চপর্যায়ে পদ সৃষ্টির জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চলছিল বলে তারা অবগত ছিলেন। তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির সঙ্গে দেখা করে তাদের যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। এএসপির পদসংখ্যা কমানো হবে না বলে তাদের মৌখিকভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছিল।

তারা মনে করেন, পুলিশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ননক্যাডার পদ থাকা জরুরি। কারণ, তারাও সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে এসআই পদে যোগদান করে পরিদর্শক পদোন্নতি পান। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা তদন্ত করে থাকেন। তারাও পদোন্নতির স্বপ্ন দেখেন। নিচের পদ বিলুপ্ত করে উচপর্যায়ে নতুন পদ সৃষ্টি করা আদৌ কাম্য নয়। এতে মাঠপর্যায়ে কর্মরত ননক্যাডার পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বাড়াবে।