মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আলোচিত ১০ স্কুল স্থাপন প্রকল্প নিয়ে পদ্মা সেতুর মতোই কাল্পনিক দুর্নীতির তথ্য প্রচার করা হয়েছে- গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে এই বক্তব্য দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা.দীপু মনি। এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট উদ্ৃব্দত করে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে আলোচ্য প্রকল্পে দুর্নীতি হওয়ার কথা ব্যাপক প্রচার পায়। তবে জাতীয় সংসদে মন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর তদন্ত কমিটির রিপোর্ট নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সংশয় সৃষ্টি হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে সমকালের পক্ষ থেকে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে অনুসন্ধান চালানো হয়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব এবং বর্তমানে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর মোমিনুর রশীদ আমিনের তদন্ত প্রক্রিয়ায় পদে পদে নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ কিংবা ভূমির মূল্য নির্ধারণ চূড়ান্ত না করা হলেও এ কার্যক্রমে দুর্নীতি চেষ্টার কল্পিত তথ্য দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য সংশ্নিষ্ট কমিটি, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা এবং গণপূর্ত বিভাগের ভূমিকা, সংশ্নিষ্ট ভূমি অধিগ্রহণ ও মূল্য নির্ধারণ কমিটির ভূমিকা এবং আরডিপিপিতে ডিসি অফিস থেকে ভূমি অধিগ্রহণ ও ব্যয় সংক্রান্ত প্রাক্কলন সংগ্রহ করে নথিতে উপস্থাপনের দায়িত্বে থাকা প্রকল্পের গবেষণা কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাকের নাম ও বক্তব্য তদন্ত কমিটির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়নি। বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমন সব কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যারা ভূমি অধিগ্রহণের সঙ্গে কোনো স্তরেই সংশ্নিষ্ট নন।
এ ছাড়া, তদন্ত প্রক্রিয়ার সময় সংশ্নিষ্টদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তদন্ত কমিটির প্রধানের দেওয়া চিঠিতে দেখা গেছে, তিনি এ চিঠি পাঠিয়েছেন অতিরিক্ত সচিব হিসেবে, 'তদন্ত কমিটি'র সভাপতি হিসেবে নয়। এটি সরাসরি সরকারি তদন্তের নিয়মের লঙ্ঘন। তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে তিনি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের সময় নিজের জন্য বরাদ্দ গাড়ি ব্যবহারের বদলে প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করেছেন। যা অনৈতিক কার্যকলাপের পর্যায়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ভুলে ভরা অনুমাননির্ভর তদন্ত রিপোর্টের কারণে সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ব্যবহূত হয়েছে, সরকারের সুনামও ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এ ঘটনার তদন্তেও একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা উচিত বলে সংশ্নিষ্টরা অভিমত দিয়েছেন।
তদন্ত প্রক্রিয়ায় অনিয়ম :অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২০ সালের ৩ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) মোমিনুর রশীদ আমিনের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। এই তদন্ত কমিটি গঠনের ভিত্তি ছিল ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর একটি দৈনিকে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট। প্রতিবেদন প্রকাশের দুই মাস পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির প্রধান ছয় মাস পর ২০২০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ই-মেইলে প্রকল্প অফিস, মাউশি এবং ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের সংশ্নিষ্ট কমকর্তার বক্তব্য জানতে চান। তবে ই-মেইলগুলোতে তিনি স্বাক্ষরের সঙ্গে নিজেকে তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে উল্লেখ না করে শুধু অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) পরিচয় দেন।
এই ই-মেইলে এটিও জানতে চাওয়া হয়নি যে, সংশ্নিষ্টদের বক্তব্য তদন্ত কাজের জন্য চাওয়া হচ্ছে কিনা। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম উল্লেখ করে সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয় মাত্র। এই চিঠিতে স্বাক্ষরের সঙ্গে ৮ সেপ্টেম্বরের তারিখ দেওয়া হলেও কার্যত এটি সংশ্নিষ্টদের কাছে ই-মেইলে পাঠানো হয় ১২ সেপ্টেম্বর রাত ১২টার পর। সেখানে জানানো হয়, ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চিঠির জবাব দিতে হবে। সরকারি বিধি (পরিমার্জিত, ২০১৮) অনুযায়ী তদন্তের প্রয়োজনে কারও বক্তব্য জানতে হলে তদন্ত কমিটিতে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান, তদন্তের কোন প্রয়োজনে বক্তব্য চাওয়া হচ্ছে ইত্যাদি জানাতে হবে। শুনানির নোটিশ দিতে হবে এবং শুনানি নিতে হবে। কিন্তু কোনো নিয়মই মানেননি তদন্ত কমিটির প্রধান মোমিনুর রশীদ আমিন। তিনি এক দিনের মধ্যে সংশ্নিষ্টদের ই-মেইলে পাঠানো বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করেছেন। নিয়মানুযায়ী সংশ্নিষ্টদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ কিংবা শুনানিও করেননি।
তদন্ত রিপোর্টে জমির মূল্য প্রাক্কলনের জন্য দায়িত্বে থাকা ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা, চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপূর্ত বিভাগ এবং ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসের সংশ্নিষ্ট ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তাদের ভূমিকা তুলে ধরা হয়নি। অথচ যদি ভূমি অধিগ্রহণ এবং ব্যয় নির্ধারণে কোনো দুর্নীতি হয় তাহলে নিয়মানুযায়ী ডিসি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তাই মূলত দায়ী থাকবেন। কিন্তু তদন্ত রিপোর্টে তাদের সংশ্নিষ্টতার কথা, এমনকি কারও নামও উল্লেখ করা হয়নি। শুধু কানুনগো ও সার্ভেয়ারের কথা বলা হয়েছে।
প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিতে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের (উন্নয়ন) নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি রয়েছে। এই কমিটিই মূলত জমি অধিগ্রহণের জন্য মূল্য চূড়ান্ত করার ক্ষমতা রাখে। তদন্ত রিপোর্টে এই কমিটির ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়নি।
তদন্ত রিপোর্টে প্রকল্পের সদস্য সচিব হিসেবে মাউশির সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা) দিল আফরোজ বিনতে আছিরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প সংক্রান্ত নির্দেশিকা ও বিধি অনুযায়ী সরকারি কোনো প্রকল্পে সদস্য সচিব পদ নেই; আলোচ্য এ প্রকল্পেও নেই। প্রকল্পের কয়েকটি উপকমিটি আছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি (পিআইসি)। এই উপকমিটির সদস্য সচিব ছিলেন দিল আফরোজ বিনতে আছির। প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হওয়ার পর বাস্তবায়ন পর্যায়ে যাওয়ার পর এই উপকমিটির কাজ শুরু হওয়ার কথা। অথচ এ প্রকল্প একনেকে অনুমোদনই হয়নি। ভূমি অধিগ্রহণ কিংবা জমির মূল্য নির্ধারণের সঙ্গেও এই উপকমিটির কোনো সর্ম্পকই নেই। কিন্তু এই উপকমিটির সদস্য সচিবকে পুরো প্রকল্পের সদস্য সচিব হিসেবে তদন্ত রিপোর্টে ভুলভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে সংশ্নিষ্ট নথিতে প্রতি পাতায় ডেস্ক অফিসারের স্বাক্ষরকে 'দুর্নীতির অভিপ্রায়' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ডেস্ক অফিসার গবেষণা কর্মকর্তা এবং অন্যান্যদের পাঠানো নথি সংক্রান্ত ফইলে স্বাক্ষর করতে বাধ্য। ডেস্ক অফিসার শুধু তথ্য সরবরাহ করা সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরের সঠিকতা নিশ্চিত করতেই প্রতি পাতায় স্বাক্ষর করেন। ভূমি অধিগ্রহণ, মূল্য নির্ধারণ কিংবা এ সংক্রান্ত কোনো ধরনের তথ্য যাচাই তার পুরোপুরি এখতিয়ারবহির্ভূত।
সংশ্নিষ্ট নথিতে দেখা যায়, আরডিপিতে ডিসি অফিস থেকে প্রাক্কলন সংগ্রহ করে নথিতে উপস্থাপন করেছেন গবেষণা কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক (অর্থ ও হিসাব)। অর্থাৎ, ডিসি অফিসের সঙ্গে ভূমির মূল্য নির্ধারণ এবং অধিগ্রহণ সংক্রান্ত কাজের প্রাক্কলন নিয়ে কোনো দুর্নীতির অভিপ্রায় থাকলে তার জন্য দায়ী হওয়ার কথা আব্দুর রাজ্জাকের। এ ব্যাপারে তিনি সমকালকে জানান, তিনি নিয়মানুযায়ী 'ফাইল নোট' দিয়েছেন। কিন্তু আরডিপি প্রণয়ন বা এখানে কোনো তথ্য দেওয়ার এখতিয়ার তার নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
শিক্ষা সচিব ও তদন্ত কমিটি প্রধানের বক্তব্য : এই তদন্তে ভুলভাবে তথ্য উপস্থাপনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে শিক্ষা সচিব মাহবুব হোসেন বলেন, এই প্রকল্প নিয়ে এর আগে প্রাথমিক তদন্ত হয়েছে। সেই তদন্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের আগে সরকারি নিয়ম ও বিধি অনুসরণ করতে হয়। প্রাথমিক তদন্তে যদি কেউ ভুলভাবে অভিযুক্ত হন তা হলে পরবর্তী এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাও উঠে আসবে। সরকারি নিয়মানুযায়ী কারও বিরুদ্ধে শুধু প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। সরকারি বিধি অনুযায়ী অভিযুক্তদের বক্তব্য ও প্রাথমিক তদন্তের তথ্য যথাযথভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পরই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই যাচাই-বাছাইয়ের কাজ এখন চলছে।
অনিয়মের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তদন্ত কমিটির প্রধান মোমিনুর রশীদ আমিন দাবি করেন, তিনি সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়ায় অনুসন্ধান করে এই তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। তদন্তে ভূমি অধিগ্রহণ-সংশ্নিষ্ট প্রকৃত দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভূমিকার কথা এড়িয়ে যাওয়া এবং সংশ্নিষ্ট নন এমন ব্যক্তিদের ভুলভাবে অভিযুক্ত করার বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, তার অনুসন্ধানে যাদের অনিয়মের অভিপ্রায়ের সংশ্নিষ্টতা পেয়েছেন, তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে প্রকল্প পরিচালক দায় এড়াতে পারেন না, সে কথাই বলেছেন।


বিষয় : পদে পদে অনিয়ম

মন্তব্য করুন