কুমিল্লা নগরীর পূজামণ্ডপ থেকে পবিত্র কোরআন শরিফ উদ্ধার ও মণ্ডপে হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন ইকবাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কক্সবাজার সৈকত থেকে বৃহস্পতিবার রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সমকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, নোয়াখালীতে পূজামণ্ডপে হামলার ঘটনায় যারা জড়িত তাদের মধ্যেও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে ইকবালকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসময় সে সৈকতে ঘোরাফেরা করছিল। তার বয়স ৩৫ বছর। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পরে তাকে কুমিল্লা জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

পুলিশ বলছে, ইকবাল হোসেন কুমিল্লা নগরীর পার্শ্ববর্তী একটি মসজিদ থেকে পবিত্র কোরআন শরীফ সংগ্রহ করে নানুয়ারদীঘির পাড় পূজামণ্ডপে রাখেন। বিষয়টি সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত হয়।

বুধবার গণমাধ্যমে ইকবাল হোসেনের নাম আসায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তবে কোরআনটি কোথায় থেকে আনা হয়েছিল এটা নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। বৃহস্পতিবার সমকালের হাতে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নানুয়ার দীঘির পাড়ের অদূরে দারোগাবাড়ি মাজারের মসজিদ থেকেই কোরআন শরীফটি সংগ্রহ করে মণ্ডপে রাখেন ইকবাল। 

সমকালের হাতে আসা ১৭ মিনিটের ওই সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার দিন রাতে কয়েক দফায় ইকবাল হোসেন মাজার সংলগ্ন মসজিদে প্রবেশ করেন। রাত ১০টা ৫৮ মিনিটে তিনি মসজিদে যান। পরে বের হয়ে আসেন। এ সময় মসজিদে দুইজন মুসল্লি ছিলেন। পরে আবার রাত ২টা ১২ মিনিটে মসজিদের একটি বক্স থেকে কোরআন নামিয়ে ফ্লোরে রেখে বের হয়ে যান। সর্বশেষ রাত ২টা ১৭ মিনিটে আবারও মসজিদে গিয়ে কোরআন হাতে বের হয়ে যান। 

এদিকে মণ্ডপে কোরআন রাখার বিষয়ে ইকবালের নাম গণমাধ্যমে প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার দিনভর এলাকার লোকজন ও সংবাদমাধ্যম কর্মীরা নগরীর সুজানগর এলাকা ইকবাল হোসেনের বাড়িতে ভিড় করেন। ইকবাল সুজানগরের নুর আহমেদ আলমের বড় ছেলে।

ঘটনাস্থলের আশেপাশের অন্তত ১২টি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে মণ্ডপে কোরআন রাখা যুবক ইকবাল হোসেন বলে নিশ্চিত হলেও এর নেপথ্যে কে বা কারা- সে বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, পরিবারের তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে ইকবাল হোসেন সবার বড়। এলাকায় ভবঘুরে হিসেবে পরিচিত ইকবাল প্রায়ই নেশা করতো। নেশার টাকার জন্য পরিবারের শোকজনের ওপর ক্ষিপ্ত হতো সে। কখনো বাস চালকের সহকারী, কখনো রং মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করলেও নেশার জগতে পা রাখায় কোথাও তাকে লোকজন কাজে রাখতে চাইতো না। প্রথম বিয়ে করেন বরুড়ায়। আয়েশা বেগম নামে তার সেই স্ত্রীর সঙ্গে পাঁচ বছর আগে বিচ্ছেদ হয়। সেই সংসারে তার এক ছেলে রয়েছে। দ্বিতীয় বিয়ে করেন চৌদ্দগ্রামের কাদৈ গ্রামের রুমি আক্তারকে। অন্তঃসত্ত্বা রুমিও তাকে ছেড়ে গেছেন। আদালতে মামলাও করেছেন। সেই সংসারে তার একটি মেয়ে আছে। 

ইকবালের মা বিবি আমেনা বেগম বলেন, 'আমার ছেলে নেশা করে। নেশার টাকার জন্য স্ত্রী ও আমাদের মারধর করতো। ১০/১২ বছর আগে সে নেশা শুরু করে। পরে বাসে ও রংয়ের কাজ করতে দেওয়া হলেও নেশার কারণে কেউ তাকে কাজে রাখতে চায়নি।'

তিনি আরও বলেন, 'মাঝেমধ্যে বাড়ি থেকে কিছু না বলেই কোথায় যেন চলে যেত সে (ইকবাল)। ১১ অক্টোবর সন্ধ্যার পর বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি। আমার ছেলে যদি মণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার মতো পাপ করে থাকে তাহলে তার বিচার হওয়া উচিত। আইনে তার যতো বড় শাস্তি হউক আমরা তাতে প্রতিবাদ করবো না।' আমেনা বেগম বলেন, 'সে কখনো মোবাইল ব্যবহার করে না, তাই কোথায় আছে তাও জানি না।'

কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, 'ঘটনার পর থেকে ঘটনাস্থলের আশেপাশের ভবন ও সড়কে স্থাপন করা কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। ১২টি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে এবং স্থানীয়ভাবে তদন্তে আমরা যে যুবককে শনাক্ত করেছি।'

গত ১৩ অক্টোবর নগরীর নানুয়ারদীঘির পাড় পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনায় কুমিল্লা নগরের কয়েকটি পূজামণ্ডপে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এছাড়া জেলার সদর দক্ষিণ ও দাউদকান্দির দুটি মণ্ডপে হামলা হয়। 

এর জেরে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, নোয়াখালীর চৌমুহনী, রংপুরের পীরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় পাঁচটি, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় দুটি, দাউদকান্দি ও দেবিদ্বার থানায় একটি মামলা হয়। এসব মামলায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

মাজারের মসজিদ থেকে কোরআন নিয়েছিল ইকবাল: পুলিশ

মাজারের মসজিদ থেকে কোরআন নিয়েছিল ইকবাল: পুলিশ।। সিসি ক্যামেরার নতুন ফুটেজ

Posted by Samakal on Thursday, October 21, 2021