রাজধানীতে এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, দেশের জনগণ অকুপেশনাল থেরাপির সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত নন। শুধু পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীই নন; প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, অটিজমে আক্রান্ত শিশু থেকে শুরু করে অনেক রোগের ক্ষেত্রেই অকুপেশনাল থেরাপিস্টের নানামাত্রিক ভূমিকা রয়েছে। আমাদের দেশে এক কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধিতা ও মানসিক রোগে ভুগলেও তাদের চিকিৎসার জন্য খুব বেশি সুযোগ এখনও নেই।
তারা বলেছেন, এসব রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফিজিওথেরাপি ও অকুপেশনাল থেরাপির স্নাতক ও ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা উচিত। এতে প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়বে। সেইসঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলোতে নতুন নতুন পদ সৃষ্টি করে এসব পদে থেরাপিস্ট নিয়োগ দিলে সমস্যা কিছুটা লাঘব হবে। আমাদের এসডিজির কাঙ্ক্ষিত মাত্রা অর্জন করতে হলে অকুপেশনাল থেরাপির বিকল্প নেই।
বিশ্ব অকুপেশনাল থেরাপি দিবস উপলক্ষে গত বুধবার বিকেলে সমকালের সভাকক্ষে যৌথভাবে এ আলোচনার আয়োজন করে বাংলাদেশ অকুপেশনাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশন (বিওটিএ), সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি), বেলা রিহ্যাবিলিটেশন সল্যুশন পয়েন্ট এবং সমকাল।
বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলের নির্বাহী সদস্য ডা. শামীম আহম্মদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। তিনি বলেন, আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় নানামাত্রিক যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তার মধ্যে অকুপেশনাল থেরাপি অন্যতম। এই চিকিৎসা ব্যবস্থাটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। আমরা একটি গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে একটি সুন্দর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়তে চাই। আমরা আপনাদের কথা পত্রিকার পাতায় লিখতে চাই। আমি আশা করি, এই লেখাগুলো সমাজে প্রভাব বিস্তার করবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু বলেন, মানুষ অকুপেশনাল থেরাপির ব্যাপারে অজ্ঞ। মানুষকে এই চিকিৎসা সম্পর্কে জানাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে অনেক আহত মুক্তিযোদ্ধাকে সুস্থ করতে দেশে এই ধরনের সেবা শুরু হয়। বর্তমানে ফিজিওথেরাপি দেওয়ার জন্য আমাদের ১০৩টি সেন্টার রয়েছে। এ ছাড়া ৪০টি ভ্রাম্যমাণ সেন্টারও আছে। অনেক এনজিও বা সংগঠন আমাদের কাছে প্রজেক্ট উপস্থাপন করছে, ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের আমরা টাকা দিয়ে থাকি। কেউ সত্যিকারের কাজ করতে চাইলে বলব, আপনারা আমাদের কাছে আসেন, প্রজেক্টগুলো উপস্থাপন করেন, আমরা চেষ্টা করব সহযোগিতা করার জন্য।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, অকুপেশনাল থেরাপিস্টদের কাজের তালিকা দীর্ঘ। তাই আমাদের অনেক বেশি জনবল প্রয়োজন। এই থেরাপিস্টরা না থাকলে আমরা এসডিজির চারটি গোল অর্জন করতে পারব না। একজন মানুষের যে কোনো রকম ডিজঅ্যাবিলিটি থাকলেই স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে মানিয়ে চলা খুব সহজ নয়। প্রাইভেট সেক্টরকেও অকুপেশনাল থেরাপিস্ট প্রশিক্ষণ ও শিক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। আমরা এসব বিষয় নিয়ে কাজ করতে চাই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত এমপি বলেন, অকুপেশনাল থেরাপির বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে। শুধু অন্ধ, বধির বা পক্ষাঘাতগ্রস্তদের নিয়ে যে আমরা কাজ করব, এমন নয়। অকুপেশনাল থেরাপিস্টদের সবকিছু নিয়েই কাজ করতে হয়। অকুপেশনাল থেরাপির মধ্যে আবেগজনিত ব্যাপারটাকেও যুক্ত করতে হবে। করোনাকালীন মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, এটি সমাধানে কাজ করতে হবে।
ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব অকুপেশনাল থেরাপিস্টসের (ডব্লিউএফওটি) সভাপতি ড. সামান্থা শান বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হলেও অকুপেশনাল থেরাপিস্টদের সংকট আছে। আমাদের সম্মিলিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, সাইকোলজিস্ট, স্পিচ থেরাপিস্টসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিতে হবে। এ জন্য ৩৩ সদস্যের কাউন্সিল কমিটি ও সাত সদস্যের নির্বাহী কমিটি করা হয়েছে। ২১টি পদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি অনুমোদন দিলে দ্রুতই আমরা বাকি কাজগুলো করতে পারব।
চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. ইসমাইল খান বলেন, আমাদের দেশে প্রতি তিন হাজার মানুষের জন্য মাত্র একজন চিকিৎসক আছেন। আমাদের অকুপেশনাল থেরাপিস্টদের সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারদের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। সমন্বিতভাবে কাজ করলে এ সমস্যা থেকে খুব দ্রুত পরিত্রাণ পেতে পারব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, দুর্ঘটনা বা অন্যান্য কারণে যারা বিভিন্ন সমস্যায় আছেন, তাদের সুস্থ করে তুলতে অকুপেশনাল থেরাপি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের উচিত বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া।
সিআরপির নির্বাহী পরিচালক ড. মো. সোহরাব হোসেন বলেন, আমাদের দেশে অনেক প্রতিবন্ধী আছে। তাদের চিকিৎসায় দক্ষ থেরাপিস্ট নিয়োগ দিলে সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের ১৩টি জায়গায় আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। একজন রোগী শুধু তার অসুস্থতা নিয়েই আসে না। তার আরও অনেক সমস্যা থাকে। তার চাকরিসহ দৈনন্দিন চলাফেরা নিশ্চিত করতে হলে অকুপেশনাল থেরাপিস্ট নিয়োগ দিতে হবে।
চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের নির্বাহী পরিচালক তালাত মামুন বলেন, প্রায় দুই কোটি লোক মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের অধ্যাপক ড. লিনেট ম্যাকেঞ্জি বলেন, পেশাদার অকুপেশনাল থেরাপিস্টরাই দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন। আমরা অকুপেশনাল থেরাপিস্টের সংখ্যা বাড়াতে পারলে আরও বেশিসংখ্যক মানুষকে এর আওতায় আনতে পারব।
সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিডিডি) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক এ এইচ এম নোমান খান বলেন, শুধু পক্ষাঘাতগ্রস্ত লোকদের জন্যই অকুপেশনাল থেরাপি নয়। আমাদের দেশের বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্যও এ থেরাপি প্রয়োজন। ফিজিওথেরাপি, স্পিচথেরাপিসহ অনেক থেরাপিই আছে। এসব থেরাপি অনেক কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের অধ্যাপক খোন্দকার মোকাদ্দেম হোসেন বলেন, আমরা বন্যা, সাইক্লোনসহ অনেক দুর্যোগের শিকার হই। এসব দুর্যোগকবলিত এলাকায় অনেক শারীরিক প্রতিবন্ধী রোগী পাওয়া যায়। আমাদের দেশে মাত্র তিনশর কিছু বেশি অকুপেশনাল থেরাপিস্ট রয়েছেন। এদের দিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
যুক্তরাজ্যের ইয়র্ক সেন্ট জন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালিসন লেভের ফাউসেট বলেন, বাংলাদেশে অকুপেশনাল থেরাপিস্টদের সংখ্যা বিশ্বের মধ্যে নিচের সারিতে আছে। এ দেশে অনেক রোগী আছে, যারা অকুপেশনাল থেরাপি থেকে উপকৃত হতে পারে। তাই থেরাপিস্টের সংখ্যা বাড়ানো উচিত। এ সংখ্যা বাড়াতে হলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অকুপেশনাল থেরাপি কোর্স বাড়াতে হবে। বাংলাদেশকে সেই সঙ্গে তাদের নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা উচিত।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. ফিরোজ কবির বলেন, ফিজিওথেরাপি ও অকুপেশনাল থেরাপির মতো কোর্স বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই তৈরি হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এ ধরনের কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা ইনস্টিটিউট ছিল। সেটিকে নিটোরে রূপান্তর করে একীভূত করা হয়েছে।
সিআরপির অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের প্রধান মুহাম্মদ জুলকার নায়েন বলেন, রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে। যারা পাস করে বের হবে, তাদের চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারলে আমরা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ তৈরি করতে পারব।
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক (পরিকল্পনা) ডা. রাজীব হাসান বলেন, অকুপেশনাল থেরাপিস্টের ৯৬টি পদ বর্তমানে শূন্য আছে। বারবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও আমরা সেখানে নিয়োগ দেওয়ার মতো লোক পাচ্ছি না। ২১১টি অকুপেশনাল থেরাপিস্টের পদ রয়েছে। আমাদের দেশে পদ সৃষ্টি হলেও সে অনুযায়ী জনবল নেই।
সিআরপির বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশন ইনস্টিটিউটের (বিএইচপিআই) অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের প্রধান শেখ মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক অকুপেশনাল থেরাপি কোর্সটি যত দ্রুত সম্ভব চালু করা প্রয়োজন। কারণ একজন শিক্ষার্থীর অকুপেশনাল থেরাপি কোর্স সম্পন্ন করতে পাঁচ বছর সময় প্রয়োজন। এই কোর্স শুরু করার জন্য বিএইচপিআইর অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা বিদ্যমান থাকবে।
অকুপেশনাল থেরাপি নিয়ে সুস্থ হওয়া জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুস ছোবহান বলেন, আমি সিআরপিতে ছয় মাস ধরে চিকিৎসা নিচ্ছি। অকুপেশনাল ও ফিজিও থেরাপি নেওয়ার পর আমি এখন হাত নাড়াতে পারি, হাঁটতে পারি। আশা করছি, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আমি কর্মস্থলে যোগ দিতে পারব।
ড্রিম ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. হেদায়েতুল আজিজ মুন্না বলেন, আমি একটি দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়েছিলাম। এখনও আমাকে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে হয়। অকুপেশনাল থেরাপি নেওয়ার পর আমি আগের তুলনায় অনেক ভালো আছি।