জেল-জরিমানা বাড়িয়ে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, উচ্চ আদালতের বহু নির্দেশনাও আছে। টাস্কফোর্স ও কাউন্সিলের প্রায় ২০০ সুপারিশ জমেছে। কিন্তু সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমেনি, বরং বেড়েছে। কারণ হিসেবে পরিবহন খাত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতাতেই ঘাটতি রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর। জনবলসহ নানা ঘাটতির কারণে জরুরি কাজগুলোও ঠিকমতো করতে পারছে না।
এমন পরিস্থিতিতে আজ শুক্রবার পালিত হচ্ছে 'জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস'। ২০১৭ সাল থেকে প্রতি বছর ২২ অক্টোবর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য 'গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি'। যদিও ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ছাড়া দেশের কোনো মহাসড়কেই গতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা নেই। নিয়ন্ত্রণে নজরদারি নেই। গাড়ি চলে খেয়ালখুশি মতো।
সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা রয়েছে, লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি ফিটনেস সনদ পাবে না। কিন্তু সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সক্ষমতা নেই সড়কে সচল প্রায় ১২ লাখ গাড়ি যাচাই করে ফিটনেস সনদ দেওয়ার। গত ২০ বছরে বিআরটিএর জনবল বেড়ে প্রায় তিন গুণ হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে সংস্থাটির কাজ বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ।
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত তিন চাকার যানবাহন, ব্যাটারিচালিত রিকশা, অবৈধ নছিমন-করিমন জাতীয় মহাসড়কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে আরও ছয় বছর আগে। কিন্তু বাস্তবে এসব গাড়ির চলাচল বন্ধ হয়নি। হাইওয়ে পুলিশেরও সক্ষমতা নেই এমন লাখো যানবাহন বন্ধ করার। বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে রয়েছে। কিন্তু মহাসড়কে আইন প্রয়োগে কেউ নেই। ধীরগতির যান বন্ধে শুধু সভাই হচ্ছে। গত ১ সেপ্টেম্বরও অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সভা হয়েছে এ বিষয়ে।
সেপ্টেম্বর মাসের হিসাব অনুযায়ী, বিআরটিএতে অনুমোদিত ৮২৩টি পদের ১২১টি শূন্য রয়েছে। সংস্থাটি জনবল বাড়িয়ে তিন হাজার ৮২০ জন করার প্রস্তাব করেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু অনুমোদন পায়নি। পরে বিআরটিএ দুই হাজার ২৮২টি পদ করে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৩১৫টি পদ বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন করে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় ৯৬টি পদ বৃদ্ধি অনুমোদন করেছে।
বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে, সবচেয়ে ব্যস্ত সার্কেল মিরপুরে মোটরযান পরিদর্শক পদ আছে ১৯টি। তাদের ১০ জন গাড়ির ফিটনেস যাচাই করেন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা মহানগরে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১৭ লাখ ৩৩ হাজার ১৯৩টি। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা আট লাখ ৬২ হাজার ৭৫৪টি। বাকি আট লাখ ৪৩৯টি যানবাহনকে জিপ, বাস, মাইক্রোবাস ও পণ্যবাহী যানবাহনকে প্রতি বছর ফিটনেস সনদ নিতে হয়। নতুন প্রাইভেটকার প্রথমে পাঁচ বছরের জন্য ফিটনেট সনদ পায়। পরে প্রতি দুই বছরে সনদ হালনাগাদ করা হয়। এ হিসেবে ঢাকায় বছরে প্রায় পাঁচ লাখ গাড়িকে ফিটনেস সনদ নিতে হয় ২৪৩ কর্মদিবসে। এ ক্ষেত্রে একজন পরিদর্শককে দিনে গড়ে ২০০ গাড়ির ফিটনেস যাচাই করতে হবে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, দিনে ১০০ গাড়ির ফিটনেস দিতে হলেও গাড়িপ্রতি সর্বোচ্চ চার মিনিট সময় পাবেন একজন পরিদর্শক। তাই কোনোরকম দেখেই ফিটনেস সনদ দেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার মিরপুর বিআরটিএতে সরেজমিন ঘুরেও এ দৃশ্য দেখা গেছে।
মিরপুরে যন্ত্রের মাধ্যমে অর্থাৎ ডিভিআইসি ফিটনেস সনদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ডিভিআইসিতে ঘণ্টায় ১৫টি গাড়ির ফিটনেস যাচাই করা যায়। দুটি যন্ত্রে দিনে সর্বোচ্চ ১২০টি যানবাহন পরীক্ষা করা সম্ভব। বাকি গাড়ি চোখের দেখাতেই ফিটনেস দিতে হয়। তার ওপর যন্ত্র দুটি প্রায়ই বিকল থাকে। গত মাসে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মিরপুর বিআরটিএতে পরিদর্শনে গিয়ে যন্ত্রটি বিকল পান।
বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান সমকালকে বলেন, ২০১৪ সালে দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ। এখন তা ৪৮ লাখ। সে অনুযায়ী জনবল বৃদ্ধি না হলে গ্রাহককে কীভাবে ভালো সেবা দেবে? নিয়ন্ত্রণের কাজটিই বা কীভাবে করবে? একটি গাড়িকে ফিটনেস দিতে ১৯ রকমের কারিগরি দিক যাচাই করতে হয়। তিন-চার মিনিটে তা সম্ভব নয়।
বিআরটিএর বর্তমান চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার সমকালকে গত মাসে বলেন, মন্ত্রণালয়ে জনবল বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় ৯৬টি পদ বৃদ্ধির অনুমোদন দিয়েছে।
খাত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সমস্যা রয়েছে চালকের লাইসেন্স ও দক্ষতাতেও। ঠিকাদারের জটিলতায় বিআরটিতে প্রায় ১৩ লাখ লাইসেন্সের আবেদন ঝুলে রয়েছে দুই বছর ধরে। চলতি মাসে ১০ তারিখ এসব লাইসেন্স মুদ্রণের কাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনীর মেশিন অ্যান্ড টুলস ফ্যাক্টরি।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সাত বছরে ঝুলে থাকার পর ২০১৮ সালে জেল-জরিমানা বাড়িয়ে কঠোর সড়ক পরিবহন আইন করা হয়। কিন্তু পরিবহন মালিক শ্রমিকদের দাবিতে আইনটি শিথিল করা হচ্ছে। শাস্তি কমিয়ে করা সংশোধনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে রয়েছে। সড়কে নিয়ম ভঙ্গে জেল-জরিমানা কমবে।
তবে আইনের সুফল নেই। হাইওয়ে পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়কে মৃত্যু ও দুর্ঘটনা বেড়েছে আগের বছরের তুলনায়। গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দুই হাজার ২৯১ দুর্ঘটনায় দুই হাজার ২২১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে তিন হাজার ২৫৯ দুর্ঘটনায় তিন হাজার ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনা বেড়েছে ৪২ শতাংশ। মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
যাত্রী কল্যাণ সমিতি নামে একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ছয় বছরে ৩১ হাজার ৭৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩ হাজার ৮৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৯১ হাজার ৩৫৮ জন। ২০১৫ সালে আট হাজার ৬৪২ জনের মৃত্যু হয়। ২০২০ সালে করোনার লকডাউনে ৬৭ দিন যান চলাচল বন্ধ থাকলেও ছয় হাজার ৬৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে সড়কে।
জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তা দশকের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অঙ্গীকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেছেন, পণ্যবাহী ভারী যানবাহন এবং হালকা অনিরাপদ যানবাহন একই সড়কে চলাচলে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু ঘটছে।


বিষয় : সড়ক দিবস

মন্তব্য করুন