'যা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছে ওরা'- মাঝিপাড়ায় পৌঁছার আগে থেকেই এমন মন্তব্য শুনছিলাম। সেখানে পৌঁছার কিছুক্ষণ পর মন্তব্যটার পুনরাবৃত্তি শুনলাম খোদ রামনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ছাদেকুল ইসলামের মুখে। ছাদেক বিএসসি নামে পরিচিত এই ভদ্রলোক একদা শিক্ষকতা করতেন। গত ১৭ অক্টোবর রাতে আগুনে পোড়া রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মাঝিপাড়াতেও তার ছাত্রদের কেউ কেউ আছেন, ছাত্রস্থানীয় অনেকজন। তাকে ঘিরে ভিড় জমে ওঠা তাই স্বাভাবিক। ভিড়ের লোকজনকে সাক্ষী মানলেন তিনি। সাক্ষ্যদানকারীরা একবাক্যে স্বীকার করলেন, অনেক পেয়েছেন মাঝিপাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন। তবে আগের সেই আনন্দ আর নেই বলে জানালেন দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা আনন্দ দাস। এরপর আনন্দদের নিরানন্দ দিন শুরুর বর্ণনা শুনতে হলো পুরো একটা বেলা।
ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পীরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে এক কিলোমিটার পশ্চিমে গিয়ে চতরাগামী পাকা রাস্তা। সেখান থেকে আরও তিন কিলোমিটারের মতো দক্ষিণে গেলে আখিরা নদী। এই নদীতীরেই মাঝিপাড়ার অবস্থান। এই নদীকে কেন্দ্র করে একদা রামনাথপুরে মাঝিপাড়া নামে জেলেপাড়াটি গড়ে উঠেছিল। ছোট এই নদীতীরবর্তী ৬৬টি জেলে পরিবারের জীবিকা নির্বাহের একটি উপায় আখিরা নদী থেকে মাছ ধরা। তবে এখন আর নদীতে তেমন মাছ পাওয়া যায় না। তাই পাড়ার জেলেরা বিভিন্ন এলাকা থেকে পুকুরে চাষ করা মাছ কিনে এনে এ-হাটে ও-হাটে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
দক্ষিণপাড়ার আনন্দ দাসও ফেরি করে মাছ বিক্রি করেন। 'ক্ষতিগ্রস্ত মাঝিদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা এখন স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরেছে'- ছাদেক বিএসসি এই কথা বলে চলে যাওয়ার পরই সমবেতজন তাদের কষ্টের কথা বলতে শুরু করলেন। ষাটোর্ধ্ব কালীপদ দাস বললেন, 'হামরা আর কাউক বিশ্বাস করবার পারোছি না বাহে। ছোটবেলা থাকি যাদের সাথে খেলা করি বড় হইনু, তারাই বোলে (নাকি) ছইলগুলাক নাগেয়া দেচে।' কালীপদও দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা। তবে তাদের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল উত্তরপাড়ায়, আখিরা সেতুর কাছে। কথা বলার সময় সেতুর অন্য পাড়ে আসামিপক্ষের নারীরা স্থানীয় বটেরহাটে জড়ো হয়ে বিক্ষোভের চেষ্টা করছিলেন। কালীপদ বিক্ষোভকারী নারীদের দেখিয়ে আরও বললেন, 'ওই দ্যাখো তো ওমরাগুলা কতো কষ্টে আছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো অন্যায় করছে।
বাকিরা তো করে নাই। সউগ মানুষগুলাক ধরি নিয়া যাওছে।'
বিক্ষোভ করতে জড়ো হওয়া নারীরা অবশ্য বেশিক্ষণ সেখানে অবস্থান নিতে পারেননি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিরোদা রানী রায় গেলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে। তিনি শুনলেন ওই নারীদের কথা। নারীদের কেউ একজন বেশ উঁচু স্বরে বলছিলেন, 'মিছা সন্দেহ করি কাউক ধরি নিয়া যান না।'
তদন্ত চলছে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করার। গতকালও তদন্তকাজে এসেছিলেন কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) গোলাম রাব্বানী। তার সঙ্গে কথা হয় দুপুরের পর। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে কিনা- জানতে চাইলে বলেন, 'সেটা কঠিন। আমরা প্রত্যেকের কাছে আলাদা করে জানতে চাইছি সেদিনের ঘটনা, যেন তদন্ত নিয়ে কোনো সন্দেহ দেখা না দেয়।'
তদন্ত চলছে, প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ আটক হচ্ছে এবং সন্দেহ-অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে পুরো করিমপুর গ্রামে। তাই মাঝিপাড়ার জেলেরা ঘটনার আট দিন পরও পাড়ার বাইরে যাওয়ার সাহস করছেন না। মাঝিপাড়ায় গিয়ে প্রথমেই যাওয়া হয়েছিল পরিতোষের বাড়িতে। এই পরিতোষের বিরুদ্ধেই কাবা শরিফ অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগটি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি ঘটায় উজ্জ্বল হোসেন। উজ্জ্বলের ছড়ানো ঘৃণায় ঘৃতাহুতি দিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতা সৈকত মণ্ডল। পরিতোষের মা ভারতী রানী ও বাবা প্রসন্ন দাসের ভাষ্য অনুযায়ী, উজ্জ্বল ছিল পরিতোষের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ভারতী বলছিলেন, 'মোর সোনাধন কোনা ছোট্ট থাকি বটেরহাটোত উজ্জ্বলের সাথে নেকাপড়া (পড়ালেখা) করছিল। উজ্জ্বল কিছুদিন আগোতও (কয়েক দিন আগেও) হামার বাড়িত আসিছিল (আসছিল)।'
পরিতোষ, উজ্জ্বল ও সৈকত তিনজনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক। এই তিনজনের পেছনে হয়তো আরও বড় কোনো পক্ষের হাত রয়েছে- এই সহজ সমীকরণ জেলেপাড়ার উত্তর-দক্ষিণের নারীরাও করছেন। তবে তাদের একাংশ দক্ষিণপাড়া যেন উত্তরপাড়াকে ঈর্ষা করতে শুরু করেছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের সবাই উত্তরপাড়ার বাসিন্দা। ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯টার দিকে উত্তরপাড়ায় যখন আগুন দেওয়া হয়, তখন পুলিশের পাহারা ছিল দক্ষিণপাড়ায়। এই দক্ষিণপাড়ার ছেলে পরিতোষের বিরুদ্ধেই কাবা শরিফ অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছিল। পরের দিন থেকে উত্তরপাড়ায় ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে।
আগুনের রাত পোহাতেই ১৮ অক্টোবর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০০ শাড়ি, ২০০ লুঙ্গি এবং ২০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ১৯ অক্টোবর জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদের দেওয়া ১০০ বান্ডেল টিন ও তিন লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। ওই দিনই সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ৬৬ পরিবারকে ছয় লাখ ৬০ হাজার টাকা বিতরণ এবং ১৫ জন জেলেকে মাছ ধরার জাল দেওয়া হয়েছে। ২০ অক্টোবর ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘু পরিবারের ৩৩ জনকে পাঁচ হাজার টাকা করে এবং ২৮ জনকে ১০ হাজার টাকা করে মোট চার লাখ ৪৫ হাজার টাকা, ২৫ প্যাকেট গোখাদ্য ও ৪০ প্যাকেজ শিশুখাদ্য বিতরণ করেন। জেলা পরিষদের পক্ষে ২৫ জনকে তিন হাজার টাকা করে ৭৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। ২১ অক্টোবর জেলা প্রশাসক আসিব আহসান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ৬৬ পরিবারের মধ্যে ২০০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ৬৬টি কম্বল, ৬৬টি শাড়ি ও ৬৬টি লুঙ্গি বিতরণ করেন। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি সংস্কার করে দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও দুটি মন্দিরের জন্য জেলা পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে ১১ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। ৪০ শিক্ষার্থীকে ৪০ সেট নতুন বই, জাতীয় পরিচয়পত্রের ১৬টি সার্টিফায়েড কপি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে বেসরকারি সংস্থা রেড ক্রিসেন্ট, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন, আরডিআরএসের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে মোট ৩৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
দক্ষিণ মাঝিপাড়ার লোকজন অবশ্য ত্রাণ পাচ্ছেনই না বলা চলে। তাদের দাবি, তারাও ভালো নেই। কাজ করতে বাইরে যেতে পারছেন না বলে খাবারেরও সংকট দেখা দিয়েছে। দক্ষিণপাড়ার দেবী রানী দাস অবশ্য বলছিলেন, 'কেউ তো ইলিপ (রিলিফ) চাই নাই। কাম করি খাবার চাই হামরা। হামার বেটা মানুষগুলা গেরাম থাকি বাইর হবার না পারলে নয়া টিনের ঘর দিয়া কী হইবে?'
দেবী রানীর কথা শুনে মনে হচ্ছিল, কোথায় যেন কেউ একজন এই কথাটি আগেও বলেছিল আমাকে। পরে মনে পড়ল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সহিংসতার শিকার হওয়া যশোরের অভয়নগর উপজেলার মালোপাড়ার সেই মেয়েটির কথা। অভয়নগরের ওই গ্রামটি পীরগঞ্জের মাঝিপাড়ার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছিল। উন্নয়নও ঘটেছিল অভূতপূর্ব। তবু ওই গ্রামের একটি মেয়ে প্রিয়া সরকার বলেছিল, 'সব উন্নয়ন নিয়ে যান, আমাদের ৫ জানুয়ারির আগের দিনগুলো ফিরিয়ে দেন।'

বিষয় : সরেজমিন পীরগঞ্জ

মন্তব্য করুন