আমরা এগিয়ে চলেছি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অতিক্রম করে। সামনেই পূর্ণ হবে বিজয়ের ৫০ বছর। এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালাও আমরা উদযাপন করছি। বছরটি সমকালের ১৭ বছরে পদার্পণের বছরও। এই সময়ে সংবাদমাধ্যমের সংকট ও সংগ্রাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে- করোনা মহামারির বৈতরণী পাড়ি দিয়ে মুদ্রিত সংবাদপত্র কি পৌঁছাতে পারবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে? কীভাবে মোকাবিলা করবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা 'ফেক নিউজ'-এর ঝোড়ো হাওয়া কিংবা সংবাদমাধ্যমের ওপর ক্রমবর্ধমান হারে খÿহস্ত হয়ে ওঠা রাজনৈতিক, সামাজিক এবং করপোরেট শক্তিকে? কীভাবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে সমুন্নত রাখবে সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানকে?
সমকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজনের এই সময়ে আমরা আবার মনে করতে চাই- বিশ্বজুড়েই সংবাদমাধ্যমের পথচলা কখনও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, এখনও নেই। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়; বরং বাড়তি নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সংকট এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এখানকার সংবাদমাধ্যম বিকশিত হয়েছে। আর চলমান করোনা পরিস্থিতি যে সংকট তৈরি করেছে, সেটা ধরনের দিক থেকে নতুন হলেও মোকাবিলার অভিজ্ঞতার দিক থেকে এখানকার সংবাদমাধ্যমের জন্য অভূতপূর্ব নয়।
এই ভূখণ্ডের সংবাদমাধ্যম কয়েক শতক ধরে লড়াই-সংগ্রাম করেই সামনে এগিয়েছে। উপমহাদেশের প্রথম সংবাদপত্র 'বেঙ্গল গেজেট' ও তার সম্পাদক জেমস অগাস্টাস হিকি কিংবা বর্তমান বাংলাদেশ তথা পূর্ববঙ্গের প্রথম সংবাদপত্র 'রঙ্গপুর বার্তাবহ' কীভাবে শাসকশ্রেণির রোষানলে পড়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, আমি সেই আলোচনায় যাচ্ছি না। পূর্ববঙ্গের অপর 'প্রতিবাদী' পত্রিকা গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার 'বিদ্রোহী' সম্পাদক কাঙাল হরিনাথের উদাহরণও টানছি না। খোদ বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা-সংগ্রামে সংবাদপত্রের যে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা, তা বিশ্ব-ইতিহাসে বিরল। সাংবাদিকতার উৎকর্ষের ইতিহাসের নানা পর্বে ইউরোপ বা আমেরিকার ভূমিকা নিশ্চয়ই রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবাদপত্র যেভাবে এ দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের সংগ্রাম ও প্রত্যয় নিজের করে নিয়েছিল, তেমন উদাহরণ আর কোথাও নেই।
ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়- আজকের বাংলাদেশ তথা সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠীর জাতীয়তাবোধ সংহত করা, স্বাধিকার আন্দোলন সর্বব্যাপ্ত করে তোলা এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন জাগিয়ে রাখতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশক ধরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি প্রধান ভূমিকা পালন করেছে এই ভূখ থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলো।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোটা জাতিকে স্বাধীনতার জন্য জাগিয়ে তুলেছিলেন। তার পাশে সহযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল স্বাধীনতার সপক্ষের সংবাদপত্রগুলো। তিনি ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলজুড়ে ছুটে বেড়িয়ে মানুষকে নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখাতে যেসব অগ্নিঝরা শব্দ উচ্চারণ করতেন, তা-ই পরদিন অক্ষর হয়ে প্রতিধ্বনিত হতো সংবাদপত্রে। তার ঐতিহাসিক ছয় দফার পক্ষে বিভিন্ন দৈনিকে যে সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় প্রকাশ হয়, তা 'বাঙালির ম্যাগনাকার্টা' হিসেবে পরিচিত ছয় দফার পক্ষে জনমত গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
শুধু তাই নয়, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে একাত্তরের মার্চ পর্যন্ত এ দেশের ছাত্র-জনতা-পেশাজীবী রাজপথে যে রক্ত ও আগুন ঝরিয়েছেন, সেখানে শামিল হয়েছিলেন সাংবাদিকরাও। সমকালের প্রয়াত সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের কাছে শুনেছি, তারা কীভাবে দিনভর মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিয়ে সন্ধ্যায় বার্তাকক্ষে গিয়ে সেই সংবাদই লিখতেন। বস্তুত ঢাকা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোর সিংহভাগ তখন সাংবাদিকতার ধ্রুপদি 'অবজেকটিভিটি' নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নাগরিকের আশা-আকাঙ্ক্ষার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। রাজপথের সংগ্রাম প্রতিফলিত হয়েছিল সাংবাদিকের কলমে।
ষাটের দশকের সাংবাদিকতা কতটা 'রাজনৈতিক' হয়ে উঠেছিল, সেই প্রমাণ পাওয়া যায় ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর 'অপারেশন সার্চলাইট' পরিকল্পনাতেও। মুক্তিসংগ্রামের পীঠস্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাঙালি-অধ্যুষিত ইপিআর সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স, মুক্তিযুদ্ধপন্থি রাজনৈতিক দলের অফিসগুলো এবং অলিগলিতে 'যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে' ব্যারিকেড গড়ে তোলা জনতার পাশাপাশি ওই ঘৃণ্য গণহত্যার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল সংবাদপত্রগুলোর কার্যালয়ও।
ওই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, দ্য পিপলসসহ বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র অফিসে হামলা চালায়। কামানের গোলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভবন ও ছাপাখানা। আগুনে ভস্মীভূত হয় অন্যান্য উপকরণ। সাংবাদিক-সাহিত্যিক শহীদ সাবের অফিসেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মধ্যরাতে অফিসে থাকা সাংবাদিকদের বেশিরভাগ কীভাবে কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে বের হতে পেরেছিলেন ফয়েজ আহমদ, এবিএম মূসাসহ বরেণ্য সাংবাদিকদের জবানিতে পরবর্তী সময়ে আমরা জানতে পেরেছি।
কেবল ২৫ মার্চ রাতে নয়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পুরোটা সময় ধরে বাঙালি সাংবাদিকরা শিকার হয়েছেন হত্যা, নির্যাতন, কারাভোগ ও হয়রানির। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার খবর যাতে ঢাকার বাইরে থাকা নাগরিকদের কাছে পৌঁছাতে না পারে, যাতে করে বিশ্ববাসী এই বর্বরোচিত সামরিক শাসকের স্বরূপ জানতে না পারে- সে জন্য প্রথম রাতেই সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছিল হানাদার বাহিনী। পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতে কয়েক দিন পর যদিও কোনো কোনো সংবাদপত্র প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়েছে; ডিসেম্বরে হানাদার বাহিনীর নতজানু পরাজয়ের আগ পর্যন্ত জারি থেকেছে ইতিহাসের কঠোরতম সেন্সরশিপ।
তারপরও কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের দোসররা বাঙালি সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করতে পারেনি। মুক্তাঞ্চল কিংবা সীমান্তের ওপার থেকে অর্ধশতাধিক সংবাদপত্র প্রকাশ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে। সম্মানী বা ভাতা দূরে থাক; দপ্তরহীন, যানবাহনহীন অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কলম সমুন্নত রেখেছেন সাংবাদিকরা। ছাপাখানার অভাবে হাতে লিখে সাইক্লোস্টাইল করে সংবাদপত্র প্রকাশেরও নজির রয়েছে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও অনেক সাংবাদিক ছিলেন, যারা একসঙ্গে হাতে অস্ত্র ও কলম ধরেছেন। ঘাতক বাহিনী বিজয়ের আগ মুহূর্তে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান যে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে, তাদের মধ্যে ছিলেন শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন, সেলিনা পারভীনসহ অনেক সাংবাদিক। আমরা সব সময়ই সাংবাদিকদের এই সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
বলা বাহুল্য, স্বাধীন বাংলাদেশেও সংবাদমাধ্যমের সংকট ও সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি। বিশেষত, আশির দশকের শেষভাগে তৎকালীন এরশাদ সরকার সংবাদমাধ্যমের ওপর হয়ে উঠেছিল খÿহস্ত। এক সাপ্তাহিক যায়যায়দিনই দুইবার নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বিশেষত, ক্ষমতার শেষ বছর ১৯৯০ সালে এইচ এম এরশাদ ও তার নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রযন্ত্র যেন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ওই বছরই দু'জন সাংবাদিক নিহত ও ১২ জন কারারুদ্ধ হন। এরশাদের শাসনামলে বিশেষ ক্ষমতা আইনের অপব্যবহারের চূড়ান্ত হয়েছিল সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। অন্তত ৩১টি পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ছিল তথাকথিত 'প্রেস অ্যাডভাইস'। গণমাধ্যম বিষয়ক একটি গবেষণায় দেখেছিলাম, এরশাদের ক্ষমতাকালে ৬৯৩ দিনই 'প্রেস অ্যাডভাইস' এসেছিল। 'বিজ্ঞাপন অস্ত্র' ব্যবহার তো ছিল প্রায় নিত্যকার বিষয়।
গর্বের বিষয়, শত নির্যাতন ও দমন-পীড়ন সত্ত্বেও সাংবাদিকরা মাথা নোয়াননি। অনেকেই ভেঙে পড়েছেন, কিন্তু মচকে যাননি। ১৯৯০ সালের নভেম্বরে ডা. শামসুল আলম খান মিলন হত্যার পর অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠা পরিস্থিতিতে ঘি ঢেলেছিল সাংবাদিক সমাজ। সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতারা যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত কোনো পত্রিকা প্রকাশ হবে না। পশ্চিমা বিশ্বে আমরা প্রতিবাদস্বরূপ সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠা সম্পূর্ণ বা আংশিক খালি রাখার উদাহরণ দেখি। কিন্তু এভাবে সপ্তাহজুড়ে পত্রিকা প্রকাশ না করার 'সাহস' আর কেউ দেখাতে পারেনি।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এসে সাংবাদিকদের সেই বজ্রকঠিন ঐক্য আমরা ধরে রাখতে পারিনি। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, বেতার, অনলাইন- সাংবাদিকতার সংখ্যা ও গুণগত সম্প্রসারণ হয়েছে। কিন্তু পেশাগত ঐক্যের স্বপ্ন ক্রমেই ফিকে হয়েছে। শুধু তাই নয়, সাংবাদিকতার যে সুমহান ব্রত শত বছরের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল, তাতেও চিড় ধরেছে। সাংবাদিকদের অনৈক্যের সুযোগ নিয়েছে বা নিচ্ছে সুবিধাবাদী সব গোষ্ঠী। এই আত্মসমালোচনা আমাদের করতেই হবে।
বিষয়টি নিয়ে নাগরিকদেরও ভাবতে হবে। বিভিন্ন পেশাজীবীর মধ্যে নিজেদের জন্য ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস ও চর্চা বিরল নয়। কিন্তু সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, তাদের সংগ্রাম ও ত্যাগ সামষ্টিক স্বার্থে। রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ যখন নাগরিকের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে না, তখন মানুষের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায় 'ফোর্থ এস্টেট'। সংবাদপত্র হয়ে ওঠে দুর্বলের শক্তি, অবলার কণ্ঠস্বর, নিপীড়িতের শেষ আশ্রয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আপাত দুর্বল ও কোণঠাসা শক্তি যখন সবল হয়ে ওঠে, তখন প্রথমেই গলা টিপে ধরতে চায় সংবাদমাধ্যমের। সংবাদমাধ্যমের অবদান, আত্মত্যাগ ও সামষ্টিক স্বার্থের প্রতি নিবেদন তখন তারা বিস্মৃত হয়ে যায়।
কেবল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল কিংবা অর্থশালী পেশাজীবী গোষ্ঠীর 'চিরায়ত' প্রবণতার কথা বলছি না; স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে আমাদের সংবাদমাধ্যমে আরও কিছু নতুন নতুন প্রতিপক্ষ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেভাবে কথায় কথায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও মামলার ঘটনা ঘটছে, তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। অথচ সবারই এবং বিশেষভাবে ক্ষমতাসীনদের মনে রাখতে হবে, সংবাদমাধ্যম কারও প্রতিপক্ষ নয়। সংবাদমাধ্যম বরং দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠারই গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমই পারে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে সহায়তা করতে। সংবাদমাধ্যমের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আঘাত গণতন্ত্র, সুশাসন এবং সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আঘাতের নামান্তর।
সরাসরি আঘাত ছাড়াও স্বাধীন সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধের আরেকটি হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বহুল আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। আমরা সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে প্রথম থেকে এই আইনের ব্যাপারে উদ্বেগ ও আপত্তি প্রকাশ করে এসেছি। দেশের ইতিহাসে সম্ভবত প্রথমবারের মতো ২০১৮ সালের অক্টোবরে খোদ সম্পাদকরা এ ব্যাপারে রাজপথে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছিলেন।
যদিও আইনটির নিবর্তনমূলক ধারাগুলো সংশোধন বা রহিত হয়নি। শুধু সাংবাদিক ও তথ্যমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা নন, উন্নয়ন সহযোগীরাও এর সুনির্দিষ্ট কয়েকটি ধারার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিল। এমনকি বিলের অন্তত আটটি ধারায় পরিবর্তনের সুপারিশ করেছিল ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি নিজেই। তারপরও আইনটি শেষ পর্যন্ত পাস হয়েছে এবং যত দিন যাচ্ছে, এর কুফল সাংবাদিক সমাজ ভোগ করছে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিপুল সম্প্রসারণের এই যুগে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন ও বিধিবিধানের প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করে না। কিন্তু এর নামে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের অধিকার ও কর্মপরিবেশ সীমিত, এমনকি খর্ব করার ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যে দেশের সাংবাদিকতা বিকাশ লাভ করেছে জাতীয় স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে; যে দেশের সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও ন্যায্যতা ও নৈতিকতার প্রশ্নে বরাবরই সোচ্চার ও সংবেদনশীল থেকেছেন; সেই দেশে এ ধরনের আইন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমি বিশ্বাস করি, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি, তাহলে সাফল্য নিশ্চয়ই আসবে।
২০০৫ সালে জন্মলগ্ন থেকেই সমকাল মহান মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত, বিজ্ঞানমনস্ক, মুক্তবুদ্ধির বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছে। মানবাধিকার, নারীর মর্যাদা, আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠা আমাদের সম্পাদকীয় নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের এই সময়ে তাই আমাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মূল প্রতিপাদ্য 'বাংলাদেশের হৃদয় হতে'। হৃদয়ে বাংলাদেশকে ধারণ করেই আমরা এগিয়ে যেতে চাই। এ প্রসঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে মনে করিয়ে দিতে চাই, স্বাধীনতার চেতনা ও স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠায় সমকালকে কম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি। মানবতাবিরোধী অপরাধের শীর্ষস্থানীয় খলনায়কদের অপেক্ষাকৃত লঘু শাস্তির বিরুদ্ধে আমরা যখন 'এই রায় মানি না' শীর্ষক প্রধান শিরোনাম করেছিলাম, তখন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিসহ বিভিন্ন মহলের চোখ রাঙানি সইতে হয়েছে। সাংবাদিকতার গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে সমকালের সাংবাদিক গৌতম দাস ও আব্দুল হাকিম শিমুলকে। তারপরও আমরা দেশ, জাতি ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতায় পিছু হটিনি।
১৭ বছরে পদার্পণ একটি পত্রিকার জন্য মোটেই কম সময় নয়। সমকাল স্বাধীনতার চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও সার্বভৌম সাংবাদিকতার মশাল নিয়েই এগিয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে যেমন সহকর্মীদের, তেমনই পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতা একান্ত কাম্য। সমকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।
শুরুতেই করোনা পরিস্থিতির কথা বলেছি। বৈশ্বিক এই দুর্যোগ আমাদের সাময়িক থমকে দিয়েছিল, কিন্তু থামিয়ে দিতে পারেনি। মানুষ ও সমাজ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ঘুরে দাঁড়িয়েছে সমকালও। আমি বিশ্বাস করি- নিবর্তনমূলক নানা পদক্ষেপ ও আস্ম্ফালন সৎ, সাহসী এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কাছে পরাভূত হবে। আগেই বলেছি, সাংবাদিকতার পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এই অবস্থাকে মোকাবিলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বাঙালি কবি বলেছেন- 'সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কী ভয়।' আমরাও সেই আপ্তবাক্য প্রতিধ্বনিত করে বলতে চাই- মাভৈঃ মাভৈঃ।