ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি সেলে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ। আরেক সেল থেকে সেখানে নিয়ে আসা হয় ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে। তাজউদ্দীন তখন পবিত্র কোরআন শরিফ পড়ছিলেন। অন্য কোথাও যেতে হবে বলে মনসুর আলী কাপড় পাল্টে নিয়েছিলেন। হাত-মুখ ধুয়ে নিয়েছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তাদের সবাইকে এক সেলে একত্রিত করার পরপরই গুলি ছুড়তে শুরু করে চক্রান্তকারীদের নির্দেশে আসা বিপথগামী সেনা সদস্যরা। লুটিয়ে পড়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর জাতীয় চার নেতার রক্তাক্ত দেহ।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর রাতের সেই কলঙ্কিত ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন ধরে রাখা কারাগারের স্থাপনাগুলো ঘিরে তৈরি হচ্ছে জাতীয় চার নেতা স্মৃতি জাদুঘর। পুরান ঢাকার পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের 'মৃত্যুঞ্জয়ী' সেল হবে এই স্মৃতির অন্যতম স্মারক। থাকবে নেতাদের ব্যবহূত আসবাবসহ জিনিসপত্র, ঘাতকের বুলেটের চিহ্ন ধরে রাখা দরজার লোহার শিক। নেতাদের জীবন ও কর্ম ছাড়াও ঐতিহাসিক তথ্য-চিত্র রাখা হবে প্রদর্শনের জন্য। সব কাজ শেষ হলে আগামী বছরের মাঝামাঝি এ জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরোনো কেন্দ্রীয়
কারাগারের স্থানে জাতীয় চার নেতা স্মৃতি জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু কারা স্মৃতি জাদুঘরসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠবে। এই কর্মযজ্ঞের প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব আলী রেজা সিদ্দিকী সমকালকে বলেন, বিশাল এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী। এর বিভিন্ন অংশে নানারকম কাজ চলছে। জাতীয় চার নেতার স্মৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কারা স্থাপনাগুলোর পুরোনো চেহারা অবিকৃত রেখে একটি আধুনিক জাদুঘর গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে অডিও-ভিজুয়াল কনটেন্ট থাকবে। আলো ও শব্দ ব্যবহার করে আমরা ইতিহাস বলার চেষ্টা করব।
জাতীয় চার নেতা স্মৃতি জাদুঘর এলাকায় রয়েছে কারাগারের চারটি ভবন। এগুলো নীলনদ, জেলসুপারের বাসভবন, সেল ১৫ ও মৃত্যুঞ্জয়ী সেল নামে পরিচিত। এর মধ্যে সেল ১৫ ছাড়া অন্যগুলো ঔপনিবেশিক আমলে (১৮১৫ সাল, মতান্তরে ১৮১৯) পাগলাগারদ হিসেবে নির্মাণ করা হয়। এখন সেখানে চার নেতার আবক্ষ মূর্তি সংবলিত ছোট বাগান ও ঝরনা রয়েছে। তবে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে এই বাগান ও ঝরনা নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হবে। চার নেতার আবক্ষ মূর্তি আরও ভালোভাবে প্রদর্শনের সুবিধার্থে নতুন করে প্রতিস্থাপন করা হবে। সেল ১৫ আংশিক ভেঙে ভাস্কর্য প্যাভিলিয়ন ও গ্যালারি হিসেবে পুনর্নির্মাণ করা হবে। কারাগারের ভেতরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার জাতীয় চার নেতার সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্যগুলো প্রদর্শিত হবে এখানে। জেলসুপারের বাসভবনটি এই অঙ্গনে ঢোকা ও বের হওয়ার 'গেটহাউস' হিসেবে ব্যবহূত হবে। আর বিদেশি বন্দি সেলের প্রদর্শন গ্যালারি হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে নীলনদ। বঙ্গবন্ধু কারা স্মৃতি জাদুঘর ও জাতীয় চার নেতার স্মৃতি জাদুঘরের মধ্যে একটি হাঁটার পথ তৈরি করা হবে।
পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারটি ঐতিহাসিকভাবে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন ও পারিপার্শ্বিক উন্নয়নের জন্য একটি নকশা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে প্রথম হওয়া 'ফর্ম থ্রি আর্কিটেক্টস'-এর নকশায় এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে পুরো কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান স্থপতি দিদারুল ইসলাম ভূঁঁঞা বলেন, কারাগারের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা অংশটি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর, জাতীয় চার নেতা স্মৃতি জাদুঘরসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা 'কারা জাদুঘর' হিসেবে রাখা হয়েছে। মূল কারাগার এলাকার এক পাশে চকবাজার সংলগ্ন এলাকাটিকে নাগরিক চত্বর বানানোর নকশা করা হয়েছে। সেখানে উদ্যান ও পুকুরঘেরা খোলা জায়গায় স্বস্তিতে সময় কাটাতে পারবে মানুষ। অন্যদিকে কারা জাদুঘরের উত্তরে অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা অপসারণ করে আধুনিক স্থাপনা সিনেপ্লেক্স, জিমনেশিয়াম, কমিউনিটি সেন্টার, সুইমিং পুলসহ অত্যাধুনিক নাগরিক সুবিধা সংবলিত একটি অংশ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে একদিকে কারা জাদুঘর আমাদের রাজনৈতিক ও স্থাপত্যশৈলীর ইতিহাস ধরে রাখবে; অন্যদিকে পুরান ঢাকার বর্তমান চাহিদা পূরণেও উন্মুক্ত স্থান ও আধুনিক সুবিধা থাকবে।
'ফর্ম থ্রি আর্কিটেক্টস'-এর সহযোগী স্থপতি জান্নাতুল ফেরদৌস নিসা সমকালকে বলেন, কারাগারে জাতীয় চার নেতার ব্যবহূত চেয়ার-টেবিল, খাট, বইপত্র, পবিত্র কোরআন শরিফসহ স্মৃতিবহ সবকিছুই আধুনিক উপায়ে সংরক্ষণ করা হবে। সবই অবিকৃত অবস্থায় থাকবে, যেন দর্শনার্থীরা সেই সময় ও ইতিহাসকে উপলব্ধি করতে পারেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর তার ঘনিষ্ঠ এই চার আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে সেখানেই ঘটে বেদনাবিধুর এ হত্যাকাণ্ড। এ দিনটি জেলহত্যা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ওই ঘটনার পরদিন ৪ নভেম্বর তৎকালীন কারা-উপমহাপরিদর্শক আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তাতে বলা হয়, রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনের নেতৃত্বে চার-পাঁচজন সেনা সদস্য কারাগারে ঢুকে গুলি চালিয়ে চার নেতাকে হত্যা করে। পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে ১৮০৬ সালে ২৫ একর জমির ওপর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মিত হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত এ কারাগার ঘিরে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস।