বয়স্কদের তুলনায় বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা বেশি এবং তারা এ বিষয়ে পদক্ষেপের ব্যাপারেও বেশি আগ্রহী বলে উঠে এসেছে ইউনিসেফ ও গ্যালাপ পরিচালিত এক জরিপের।এই সচেতন তরুণদের ৯১ শতাংশ চায়, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সরকারের ‘দৃঢ় পদক্ষেপ’ নেওয়া উচিত। 

বিশ্ব শিশু দিবসের প্রাক্কালে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ ও যুক্তরাষ্ট্রের জরিপ সংস্থা গ্যালাপের ‘দ্য চেঞ্জিং চাইল্ডহুড’ শীর্ষক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। 

চলমান বিশ্বের হালহকিকত নিয়ে একাধিক প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি ও শিশুদের অভিজ্ঞতা জানতে এই যৌথ জরিপ পরিচালিত হয়েছে। এই জরিপের জন্য বাংলাদেশসহ ২১টি দেশের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী এবং ৪০ বছরের বেশি বয়স্ক ২১ হাজারের বেশি মানুষের মতামত নেওয়া হয়।

জরিপের তথ্য বলছে, রাজনৈতিক নেতাদের জন্য শিশুদের কথা শোনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ– এমন মতপ্রকাশকারী তরুণের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে দ্বিতীয়। 

জরিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষ চারটি দেশের মধ্যে রয়েছে যেখানে তরুণরা বিশ্বাস করে যে, শিশুদের অর্থনৈতিক অবস্থা তাদের মা-বাবার চেয়ে ভালো হবে। অন্যদিকে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তরুণদের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বাস খুবই কম।

তরুণ জনগোষ্ঠীর ৮১ শতাংশ বিশ্বাস করে যে, শিক্ষার অবস্থা আগের প্রজন্মের তুলনায় উন্নত হয়েছে, যা বাংলাদেশকে শীর্ষ পাঁচটি দেশের মধ্যে স্থান করে দিয়েছে।

বাংলাদেশি তরুণদের ১৯ শতাংশ জানান, তারা প্রায়শই উদ্বেগ ও শঙ্কা বোধ করেন এবং ১৪ শতাংশ বলেন, তারা প্রায়শই বিষণ্ণ বোধ করেন বা কিছু করার প্রতি কম আগ্রহ বোধ করেন। 

বাংলাদেশের তরুণরা সঠিক তথ্যের উৎস হিসেবে সরকার, বিজ্ঞানী, ধর্মীয় সংগঠন এবং জাতীয় গণমাধ্যমের ওপর বয়স্কদের তুলনায় কম আস্থাশীল। 

বয়স্কদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি তরুণ-তরুণী প্রতিদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করার কথা জানায়, যা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রজন্মগত পার্থক্যের দিক থেকে বাংলাদেশকে তৃতীয় স্থানে জায়গা করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৫ শতাংশ জানায় যে, সমকামী ব্যক্তিদের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা কিছুটা বা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই হার জরিপের আওতাভুক্ত দেশগুলোর গড় হারের চেয়ে বেশি। জরিপে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোতে গড়ে ৭১ শতাংশ তরুণ এ বিষয়ে সহমত প্রকাশ করে।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন, ‘আজকের বিশ্বে হতাশার কোনো অভাব নেই। যেমন, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, দারিদ্র্য ও অসমতা, ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস এবং ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদ হতাশার কারণ হতে পারে। তবে এখানে আশাবাদী হওয়ারও একটি কারণ আছে – শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠী বয়স্কদের বিবর্ণ দৃষ্টিতে আজকের বিশ্বকে দেখতে চায় না। বিশ্বের তরুণ জনগোষ্ঠী তাদের পুরোনো প্রজন্মের তুলনায় আশাবাদী, অনেক বেশি বিশ্বমুখী এবং বিশ্বকে একটি ভালো স্থানে পরিণত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আজকের তরুণ জনগোষ্ঠীর মাঝে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তবে তারা নিজেদেরকে এক্ষেত্রে সমাধানের অংশ হিসেবে দেখে’

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি মি. শেলডন ইয়েট বলেন, ‘জলবায়ু বিষয়ক কর্মকাণ্ড নিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের কণ্ঠস্বর উচ্চকিত ও স্পষ্ট। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন এবং আরও বেশি কিছু করা যে প্রয়োজন সে বিষয়ে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সোচ্চার। বিশ্ব সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে অন্যান্য দেশের সমবয়সীদের তুলনায় কিছু বিষয়ে ভিন্নতা থাকতে পারে, তবে তাদের স্বপ্ন মূলত একই – একটি উন্নত ভবিষ্যতের জন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

গ্যালাপের সিনিয়র পার্টনার জো ডালি বলেন, ‘তরুণদের মনে কী আছে তা আমরা জানতে পারব না যদি আমরা তাদের জিজ্ঞাসা না করি। ইউনিসেফের জরিপ পরবর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে শোনা এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার গুরুত্বকে জোরালো করে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনে নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকবে; আমাদের সন্তানদের জন্য একটি উন্নত বিশ্ব রেখে যাওয়া নিশ্চিত করতে বয়স্ক প্রজন্মের জন্য তাদের ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

বিশ্ব শিশু দিবস উপলক্ষে যেসব দেশে জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে সেগুলো হলো: আর্জেন্টিনা, বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ক্যামেরুন, ইথিওপিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, লেবানন, মালি, মরক্কো, নাইজেরিয়া, পেরু, স্পেন, যুক্তরাজ্য, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জিম্বাবুয়ে।

জরিপের আওতাভুক্ত এলাকার মধ্যে ছিল গ্রামীণ এলাকাসহ পুরো দেশ। টেলিফোনের মাধ্যমে বেসামরিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক,  প্রতিটি বয়সও শ্রেণির জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে এমন জনগোষ্ঠীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।

প্রতি বছর ২০ নভেম্বর পালিত হওয়া বিশ্ব শিশু দিবসের লক্ষ্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, শিক্ষা ও সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত লাখ লাখ শিশুর জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ-বিষয়ক যেকোনো আলোচনায় তাদের বক্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা।