বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী গাজীপুরের বাহাদুরপুরের তরুণ তারেক হোসেনের একটি মোবাইল ফোনসেট নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছিল। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী মোবাইল ফোনটিসেট শোরুম থেকে কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্যও ছিল না। এ অবস্থায় অনলাইনের বিজ্ঞাপনে চোখ রাখেন তিনি। একদিন বিক্রয় ডটকমে মোবাইল ফোনের ছবিসহ একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে তার। মূল্য দেওয়া আছে ১০ হাজার ৫০০ টাকা। যেটির নতুন সেটের বাজারমূল্য ২৬ হাজার টাকা।

সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞাপনে থাকা ফোন নম্বরে যোগাযোগ করেন তারেক। দর-কষাকষির পর ফোনটির মূল্য নির্ধারণ হয় ১০ হাজার টাকা। বিক্রেতা তার কাছে অগ্রিম পাঁচ হাজার টাকা দাবি করে। কিন্তু প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কায় ফোন হাতে পাওয়ার আগেই অনলাইন পরিচয়ের সূত্রে টাকা দিতে অপারগতা জানান তারেক।

এ সময় ওই বিক্রেতা তার আস্থা অর্জন করতে ফোনে নিজেকে গাজীপুরের পুলিশ লাইন্সের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেয়। একজন পুলিশ সদস্যের জাতীয় পরিচয়পত্র ইমোতে পাঠিয়ে সেটিকে নিজের বলে দাবি করে সে। বিষয়টিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে তারেক সেই বিক্রেতাকে অগ্রিম পাঁচ হাজার টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন। এরপর কুরিয়ার সার্ভিসে ফোন পাঠানো হয়েছে- এই কথা বলে আরও পাঁচ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয় তার কাছ থেকে। নির্ধারিত সময়েও ফোনটি হাতে না আসায় আগের ফোন নম্বরে যোগাযোগ করে সেটি বন্ধ পান তিনি। তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, তিনি প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়েছেন।

তারেক হোসেন গতকাল শনিবার সমকালকে বলেন, তিনি ওই পুলিশ সদস্যের জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে গাজীপুর পুলিশ লাইন্সে গিয়েছিলেন। জানতে পেরেছেন, ওই নামে আসলেই পুলিশ সদস্য রয়েছেন; তবে তিনি গাজীপুরে নন, অন্য জেলায় কর্মরত। এমনকি ওই পুলিশ সদস্যও এই প্রতারক চক্রের শিকার হয়েছিলেন ফোনসেট কিনতে গিয়ে। চক্রটির তিন সদস্যকে গত শুক্রবার ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলো সোজায়েত আহমেদ শিখন, আল আমিন ও শাহিনুর রহমান বিপ্লব। তাদের কাছ থেকে ১২টি মোবাইল ফোনসেট, ২৭৯টি সিম, সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের ১৬টি বুকিং বই, বুকিংয়ের ১০টি সিল, দুটি ল্যাপটপ ও আটটি মোবাইল বক্স উদ্ধার করা হয়েছে। এসব প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হতো। চার পুলিশ সদস্যের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে প্রতারক চক্র এই প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিল।

সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বলেন, গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জন করতে প্রতারক চক্র দুটি অভিনব পথ বেছে নিয়েছিল। প্রথমত, পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র পাঠাতো ক্রেতার কাছে। দ্বিতীয়ত, সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের বুকিং স্লিপ পাঠানো হতো। জাতীয় পরিচয়পত্র তারা প্রতারণা করে সংগ্রহ করেছিল। আর সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের আসল বুকিং বই টাকার বিনিময়ে সংগ্রহ করেছিল। বিক্রয় ডটকমে বিজ্ঞাপন দিয়ে মোবাইল ফোন বিক্রির নামে মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চক্রের সদস্যদের ব্যবহূত সব সিমই ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করা। এসব সিম তারা বিভিন্ন উৎস ও ভাসমান সিম বিক্রয় প্রতিনিধির কাছ থেকে কিনেছে। সিম বিক্রয় প্রতিনিধিরা চক্রের সদস্যদের কাছে বিক্রির উদ্দেশ্যেই সাধারণ মানুষের সিম রেজিস্ট্রেশন করার সময় একাধিকবার আঙুলের ছাপ নিয়ে রাখত। পরে তাদের নামে সিম তুলে প্রতারক চক্রের সদস্য আল আমিনের কাছে ৩৫০ টাকায় বিক্রি করত। আল আমিন চক্রের মূল হোতা সোজায়েত আহমেদ শিখন ও শাহিনুর রহমান বিপ্লবের কাছে এই সিম বিক্রি করত ৫০০ টাকায়। এ ছাড়া আল আমিন সুন্দরবন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে কুরিয়ারটির বুকিং বই সংগ্রহ করত। প্রতিটি বইয়ের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৩৫ হাজার টাকা দিত সে। এ বইয়ের জন্য সে সোজায়েত ও শাহিনুরের কাছ থেকে নিত ৩৮ হাজার টাকা।

ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করা সিম দিয়ে জিমেইল অ্যাকাউন্ট খুলত চক্রের সদস্যরা। ভুয়া জিমেইল এবং ভুয়া রেজিস্ট্রেশনকৃত ফোন নম্বর ব্যবহার করে বিক্রয় ডটকমে অ্যাকাউন্ট খোলা হতো। বিভিন্ন সময় ৭২০টি ভুয়া জিমেইল অ্যাকাউন্ট খুলেছে এ চক্র। বিক্রয় ডটকমের প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন মোবাইল ফোনের ছবি আপলোড করে বিক্রির বিজ্ঞাপন দিত তারা। এসব পোস্ট দ্রুত এবং বেশি প্রচারের উদ্দেশে ওই প্রতিষ্ঠানকে পোস্টপ্রতি ২০৯ টাকা দিত অধিক প্রচারের তালিকায় রাখার জন্য। ক্রেতার কাছে চক্রের সদস্যদের কেউ পুলিশ সদস্য সাজত, কেউ সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী পরিচয় দিত।

পুলিশ সদস্য পরিচয় ব্যবহার করে ক্রেতার বিশ্বাস অর্জনের পর পণ্যের মূল্যের অর্ধেক টাকা অগ্রিম নিয়ে নিত তারা। ফোন বুকিং করার সময় বাকি টাকা পরিশোধ করার কথা জানানো হতো। বুকিং রসিদে যেসব সিল প্রয়োজন, সবই তৈরি করেছিল তারা। পরে ইমোতে ফোন বুকিংয়ের রসিদ পাঠিয়ে দেওয়া হতো এবং কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী পরিচয়ে ফোন বুকিং করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হতো ক্রেতাকে। নিশ্চিত হয়ে ক্রেতা বাকি টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পাঠিয়ে দিত। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফোন তার কাছে কখনোই পৌঁছাত না। এভাবে বহু মানুষের কাছ থেকে চক্রটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মহিদুল ইসলাম।