প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধার দৌড়ে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ১১ মাস আগে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন সারাদেশের দুই হাজার ১৫৫ নিয়োগ প্রার্থী। ১১ মাসেও নিয়োগ পাননি তারা। যদিও তিন বছর ধরে নিয়োগের সব প্রক্রিয়া শেষ। হয়ে গেছে স্বাস্থ্য পরীক্ষাও। বাকি কেবল পুলিশ ভেরিফিকেশন। আর এতেই আটকে গেছে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দুই হাজার ১৫৫ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ। টানা এক বছর ধরে বসে আছেন তারা। হতাশা বাড়ছে তাদের মধ্যে। এ নিয়োগ দ্রুত দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন প্রার্থীরা।
জানা গেছে, নন-ক্যাডার (দশম গ্রেড) দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদায় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। এক বছর পর ২০১৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। একই বছরের নভেম্বরে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলা বিষয়ের ভাইভার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মৌখিক পরীক্ষা। বিভিন্ন বিষয়ের (সাবজেক্ট) ভাইভা চলতে থাকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত। মৌখিক পরীক্ষা শেষে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে দুই হাজার ১৫৫ জনকে চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)।
চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর প্রায় এক বছর হতে চলেছে। এখনও সুপারিশপ্রাপ্তরা নিয়োগ পাননি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ ভেরিফিকেশনে বিলম্ব হচ্ছে। প্রাক-চাকরিজীবন বৃত্তান্ত যাচাই ফরম পূরণ করে জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারিত হয়েছিল এ বছরের ১১ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি। করোনার কারণে পুলিশ ভেরিফিকেশনের কাজ শুরু হয় অনেক দেরিতে। সব সাবজেক্টের পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হয়েছে। শুধু বাংলা বিষয়ের ভেরিফিকেশন এখনও চলমান। জানা যায়, একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত এখনও শেষ হয়নি।
নিয়োগ প্রার্থীরা জানান, এরই মধ্যে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার কাজও শেষ হয়ে গেছে। প্রথমে ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ১ জুলাই থেকে সারাদেশে লকডাউন শুরু হলে স্বাস্থ্য পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার পরে আবারও স্বাস্থ্য পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয় ১ থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত। সে সময়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষার কাজ শেষ হয়েছে।
নিয়োগ প্রার্থীদের একজন সহকারী শিক্ষক (বাংলা) পদে নিয়োগের সুপারিশপ্রাপ্ত জাহিদ হাসান নয়ন সমকালকে বলেন, তিন বছর আগে ২০১৮ সালে এ নিয়োগের সার্কুলার হয়েছিল। একটি নিয়োগ কার্যক্রম তিন বছর ধরে চললে বেকারত্বের অভিশাপ কেমন করে কমবে? এ নিয়োগের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর দীর্ঘ ১১ মাস অতিক্রান্ত হতে চলেছে। তবুও নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়ার সুপারিশকৃত শিক্ষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা।
জাহিদ হাসান নয়ন বলেন, এখন পর্যন্ত নিয়োগ না হওয়ায় পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, মা-বাবার কাছে বিশ্বাসের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছি। তাদের কাছে অবিশ্বাসের পাত্র হিসেবে পরিণত হয়েছি। তারা ভাবছে, তাদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে রেখেছি। বর্তমানে আমি ঝিনাইদহ শহরে থাকি। বাড়িতেও যেতে পারছি না। কারণ, একেকজন একেকরকম কটু কথা শোনায়।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, মাত্র দুই হাজার ১৫৫ প্রার্থীর পুলিশ ভেরিফিকেশন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষায় টানা ১১ মাস সময় গেছে। এটা শেষ করতে আরও কত দিন লাগবে, তা অনিশ্চিত। এতে করে সরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষক সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে। বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে দুই হাজার ১৮০টি পদ শূন্য আছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আরও অনেক শিক্ষক অবসরে চলে যাবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-১) ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেন সমকালকে বলেন, সরকারি চাকরিতে পুলিশ ভেরিফিকেশন আর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগের সুযোগ নেই। মাঠ পর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ কাজ করতে একটু সময় প্রয়োজন। সেই সময়টাই লাগছে। তবে ভেরিফিকেশন কাজ প্রায় শেষ। শিগগিরই সুপারিশপ্রাপ্তদের নিয়োগ আদেশ জারি করা হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য অনুযায়ী, জাতীয়করণকৃত এবং পুরোনো মিলে দেশে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৬৮৭টি। এর মধ্যে পুরোনো ৩৫১টি। এসব প্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষকের পদ সাড়ে ১০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে দুই হাজার ১৮০টিই শূন্য। মাউশির এক কর্মকর্তা জানান, প্রায় প্রতিদিনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবসর, মৃত্যু, পদত্যাগসহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষকের পদ শূন্য হচ্ছে। এতে শিক্ষক সংকট বাড়ছে।