সাজাপ্রাপ্ত অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে বিএনপি। সভা-সমাবেশ, গণঅনশন, মানববন্ধনসহ নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠন। নেতারা আশা করছেন, আইন বা রাজনৈতিকভাবে না দেখে মানবিক বিবেচনায় সরকার খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে অনুমতি দেবে।
২০ দলীয় জোটের পাঁচটি শরিক দল গত রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে একই আবেদন জানানোর পর গতকাল মঙ্গলবার আইনমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিলেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। তাদের স্মারকলিপি গ্রহণের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, 'সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'
দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত খালেদা জিয়াকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে সর্বশেষ গত ১১ নভেম্বর তার পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ফের আবেদন করা হয়। খালেদা জিয়ার পক্ষে তার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি একটি আবেদন দেওয়া হয়েছে। সেটা আইন মন্ত্রণালয়ে মতামতের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মতামত পেলেই বিস্তারিত জানা যাবে।
এর পর ১২ দিনেও খালেদা জিয়ার পরিবারের ওই আবেদন বিষয়ে কোনো মতামত দেয়নি আইন মন্ত্রণালয়। আবেদনটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এক সপ্তাহের মধ্যে মতামত দেওয়া হবে বলে সংশ্নিষ্ট সূত্রে গতকাল জানা গেছে। এরই মধ্যে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের একঠি প্রতিনিধি দল গতকাল মঙ্গলবার আইনমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিয়েছে।
৭৭ বছর বয়সী খালেদা জিয়া বর্তমানে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। সরকারের নির্বাহী আদেশে তার সাজা স্থগিত রাখা হলে তিনি জেলের বাইরে গুলশানে নিজের বাসায় থাকছেন। দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিল রোগে ভুগছেন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নিতে পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগেও আইনমন্ত্রী বলেছেন, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী এরূপ অনুমতি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে
হলে খালেদা জিয়াকে ফের কারাগারে গিয়ে নতুন করে আবেদন করতে হবে। তাহলে সরকার সেটা বিবেচনা করতে পারে।
আইনমন্ত্রীকে স্মারকলিপি :খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠানো বিষয়ে গতকাল সচিবালয়ে গিয়ে দুই পাতার লিখিত স্মারকলিপি আইনমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য সচিব মো. ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। স্মারকলিপি গ্রহণের পর আনিসুল হক সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন। সচিবালয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ কথা জানান তিনি।
সেখানে আইনমন্ত্রী বলেন, 'ফৌজদারি ৪০১ ধারা আলোচনায় আমি এখন যেতে চাই না। কারণ, আজ আপনারা আমার অতিথি।' আইনের ব্যাখ্যায় অনেক ক্ষেত্রে মতপার্থক্যের সম্ভাবনা থাকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, উনারা যে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা, উপধারার কথা বলেছেন, সেখানে তারা বলেছেন কোথাও বিদেশ যাওয়া যাবে না কথাটি বলা নেই। সেখানে বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে বলা না থাকলেও একটা কথা বলা আছে, সেটা হলো- শর্তযুক্ত বা শর্তমুক্ত। সেখানে দুটি শর্ত দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, 'আমি সে আইনের দিকে যাব না। উনারা যে স্মারকলিপি দিয়েছেন, সেটা অবশ্যই পর্যালোচনা করব। তবে সিদ্ধান্ত ও মতামতের ব্যাপারে সময় ও আলোচনার প্রয়োজন আছে।'
তিনি বলেন, যখন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা হয়, তখন উনার পরিবারের পক্ষ থেকে যে আবেদন করা হয়েছিল, সেটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক দিক বিবেচনায় দেখেছেন। তখন কিন্তু কোনো দাবি তুলতে হয়নি, প্রধানমন্ত্রী নিজেই সেটা করেছেন।
আনিসুল হক বলেন, 'স্মারকলিপির বিষয়ে আমাকে একটু সময় দিতে হবে। আমি এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করব। খালেদা জিয়ার চিকিৎসা হচ্ছে, সেটা সবাই জানেন। তাই আমি এটা নিয়ে একটু আলাপ-আলোচনা করি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গুরুত্ব দিয়ে যতটুকু সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, আমরা সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেব।'
আইনমন্ত্রীকে দেওয়া দুই পাতার স্মারকলিপিতে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় আমরা উদ্বিগ্ন। তার জীবন রক্ষার্থে মানবিক দিক বিবেচনায় উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে প্রেরণ করা অতীব জরুরি। এই পরিপ্রেক্ষিতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারামতে শর্তহীনভাবে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে অথবা বিশেষ আদেশে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিতে সরকারের প্রতি দাবি জানানো হয়।
আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, ফজলুর রহমান, নিতাই রায় চৌধুরী, ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, আইনজীবী আহমেদ আজম খান, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, তৈমূর আলম খন্দকার, আবেদ রাজা, আব্দুল জব্বার ভূঁইয়া, গাজী কামরুল ইসলাম সজল, মোহাম্মদ আলী ও ওমর ফারুক ফারুকী উপস্থিত ছিলেন।
স্মারকলিপি দেওয়ার পর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি জয়নুল আবেদীন সমকালকে বলেন, 'রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে আমরা আইনমন্ত্রীকে মানবিক কারণে দেখার অনুরোধ করেছি। সরকার তাদের আবেদনটি মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করবেন বলে প্রত্যাশা করি।'
পরে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন সমকালকে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশের একজন জ্যেষ্ঠ নাগরিক। তিনি বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাকে দ্রুত বিদেশে নিতে সরকারের কাছে পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে। সেটা এখন আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য রয়েছে। এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চান তারা। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা বিবেচনা করে মানবিক দৃষ্টিতে সরকার তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।