দেশে নারী ও শিশুর প্রতি ধর্ষণ, হত্যা ও পারিবারিক সহিংসতার মতো ঘটনাগুলো বিগত মাসগুলোর তুলনায় নভেম্বর মাসে কিছুটা কম হলেও তা এখনও উদ্বেগজনক। ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি মনিটরিং প্রতিবেদন নভেম্বর ২০২১’ অনুযায়ী নভেম্বর মাসে ২৭৭ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে নারী ১৩৯ জন এবং শিশুর সংখ্যা ১৩৮ জন। নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনার মধ্যে ২৩ নারী ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন সাত জন নারী। আর ধষর্ণের চেষ্টা করা হয়েছে সাত জনকে।

মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল এ তথ্য জানান। 

তিনি বলেন, নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতারোধে দেশে যথেষ্ট কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও অপরাধ দমনে ও নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। বিচারহীনতা, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা ও অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে।

এমএসএফ’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ মাসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ছয় জন নারী ও শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ছয় জন। অ্যাসিড নিক্ষেপ করা হয়েছে এক নারীকে। দু’জন নারী নিখোঁজ হয়েছেন। এছাড়াও নভেম্বর মাসে ৩১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিশোধ, পারিবারিক বিরোধ, যৌতুক, প্রেমঘটিত জটিলতা ইত্যাদি কারণে এ হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হয়েছে। 

এমএসএফ মনে করে, দেশে শিশু ও নারীদের প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, শ্লীলতাহানি, যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের ঘটনা যে হারে ঘটে চলেছে তাতে করে সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব, বিশেষ করে সমাজে অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা আরও জোরদার করতে হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচন কমিশনসহ দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে সহিংসতামুক্ত ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সবধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে উৎকণ্ঠা, সহিংসতা, হানাহানি ও হতাহতের মাত্রা নতুনভাবে যোগ হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরে ৯৮টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় কমপক্ষে ৪৭ জন নিহত, ৭৮ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত এবং ৫০০ এর বেশি মানুষ সংঘর্ষ-সহিংসতায় আহত হয়েছেন। নিহত ৪৭ জনের মধ্যে ১৬ জন প্রতিপক্ষের গুলিতে এবং ৪ জন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে প্রায় সকলেই ভোটে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের সমর্থক বা কর্মী। সবচেয়ে বেশি নরসিংদী জেলায় নিহত হয়েছেন ১১ জন। অন্যদিকে ২৯ নভেম্বর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নিহতের ঘটনা ঘটে; যা ছিল ১১ জন।

এছাড়াও প্রতিবেদনে নভেম্বর মাসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৯ জন নিহত হয়েছেন এবং ১২ জনকে আটক করার ঘটনা তুলে ধরা হয়। এ মাসে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে এবং কারা হেফাজতে মারা গেছেন তিন জন। পুলিশী হেফাজতে আসামির মৃত্যুর বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত ও কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যাপক ব্যবহারে জনমনে নানা উদ্বেগ আর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রবলভাবে সমালোচিত হওয়া সত্ত্বেও এ আইনে মামলার নামে হয়রানি কমেনি বরং ধারাবাহিকভাবে এর অপব্যবহার বেড়েই চলেছে। এ মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় দু’জন সাংবাদিক, দু’জন নারী, দু’জন ছাত্র, একজন রাজনৈতিক নেতা ও চার জন সাধারণ নাগরিকসহ মোট ১১জনকে গ্রেপ্তার।  অপরাপর তিন জন সাংবাদিক, দু’জন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে।

নভেম্বর মাসের অন্যতম একটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল গণপিটুনিতে হতাহতের ঘটনা। প্রচলিত আইন অবজ্ঞা করে গণপিটুনীর ঘটনাগুলোকে বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড বলে এমএসএফ মনে করে। এমএসএফ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ মাসে অন্তত পাঁচটি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে একজন নিহত ও সাত জন আহত হয়েছেন।