ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে বিশ্রাম পাচ্ছে না মাটি

বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস আজ

মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে বিশ্রাম পাচ্ছে না মাটি

.

জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:৫৮ | আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১২:১৭

ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক– মাটির এই তিন ধরনের বৈশিষ্ট্যের কথা বলেন মৃত্তিকাবিজ্ঞানীরা। মাটি নরম না শক্ত, রং– এগুলো ভৌত চরিত্রের অংশ। বিভিন্ন ধরনের পদার্থ মাটির রাসায়নিক চরিত্র নির্ধারণ করে। অন্যদিকে, মাটিতে থাকে অতি ক্ষুদ্র অণুজীব থেকে ছোট ছোট পোকা ও কেঁচোর মতো প্রাণী। এদের উপস্থিতি মাটির জৈব চরিত্র ঠিক করে দেয়। তবে বাংলাদেশে মাটির ওপরের অংশে তো বটেই, নিচের অংশও দূষণের হাত থেকে বাঁচানো যাচ্ছে না। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মাটি নিয়ে বছর বছর গবেষণা করলেও মাটির যত্ন নেওয়ার যেন কেউ নেই।

এ পটভূমিতে আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘মাটি ও পানি : জীবনের উৎস’। এ উপলক্ষে আজ সকালে রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল মিলনায়তনে সেমিনারের আয়োজন করেছে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা জামালপুরে চাষ করা বেগুনে ক্ষতিকর সিসা, ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের অস্তিত্ব পেলে তা নিয়ে গেল বছর বেশ হইচই পড়ে। শুধু বেগুন নয়, অন্য ফসলেও ভারী ধাতুর উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়ছে; যার অন্যতম কারণ মাটিদূষণ। শিল্পদূষণ, প্লাস্টিক-পলিথিনদূষণ, ইটভাটা, জাহাজভাঙা শিল্প, কৃষিকাজে সার-কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মাটিকে বিষিয়ে তুলছে। দূষণের কারণে মাটি হারাচ্ছে ফসল উৎপাদনের ক্ষমতা। সারাদেশের মাটিতেই দেখা যাচ্ছে প্রয়োজনের চেয়ে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, দস্তা ও বোরনের ঘাটতি। এ ছাড়া অঞ্চলভেদে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজেরও অপূর্ণতা থাকছে। আবার দূষিত মাটিতে যে ফসল উৎপাদন হচ্ছে, তা খেলে দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে মানুষ।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমামুল হক বলেন, যদি মাটি দূষিত হয়, তাহলে সেই দূষণ খাদ্যচক্রের মাধ্যমে চলে আসে।

উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণার (উবিনীগ) নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৩টি কীটনাশক আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ করেছে। এর বেশ কয়েকটি বাংলাদেশে অবাধে বিক্রি ও ব্যবহৃত হলেও সরকারি নজরদারি নেই। ডিলার যেভাবে বলে দিচ্ছে, কৃষক সেভাবে ব্যবহার করছেন; যার মাত্রা প্রায়ই বেশি হয়ে থাকে। এ ছাড়া হাইব্রিড ফসলে কীটনাশক বেশি দিতে হয়। এসব কারণে মাটিতে ক্ষতিকর ধাতব বেশি মিলছে।

সিলেটের দক্ষিণ সুরমার ৯ ইউনিয়নে ভৌত চরিত্র অনুযায়ী ৯ ধরনের মাটি রয়েছে। গেল বছর মাটির সব ধরনের রাসায়নিক গুণ পরীক্ষা করেছে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট। তাতে দেখা গেছে, মাটিতে প্রয়োজনীয় রাসায়নিকের পরিমাণ কম। দক্ষিণ সুরমার মতো ৪৬০ উপজেলার মাটির গুণাগুণ বা রাসায়নিকের তথ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। তাতেও অভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। এ পরিস্থিতিতে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট প্রতি উপজেলার ভূমি ও মাটি ব্যবহার নির্দেশিকা তৈরি করেছে। জমিতে কোন ফসলের জন্য কোন সার কী পরিমাণে ব্যবহার করতে হবে, এর পরামর্শ আছে নির্দেশিকায়।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, মাটিতে অন্তত ২ শতাংশ জৈবপদার্থের উপস্থিত থাকলে তাকে মোটামুটি মানের মাটি বলে ধরা হয়। ন্যূনতম ৫ শতাংশ হলে সেটাকে আদর্শ মাটি বলা হয়। তবে বাংলাদেশের জমিতে এ হার ১ দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। দেশে মোট ১ কোটি ১৬ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে জৈবপদার্থের ঘাটতি রয়েছে। ছয় দশক আগে দেশে প্রথম যখন রাসায়নিক সারের ব্যবহার শুরু হয়, তখন হেক্টরপ্রতি এর মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৮ কেজি। বর্তমানে ৭৫ গুণ বেড়ে হেক্টরপ্রতি প্রায় ৬৬০ কেজি রাসায়নিক সার ব্যবহার হচ্ছে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, বাজার থেকে সংগ্রহ করা ৪৭ ব্র্যান্ডের আমদানি করা কীটনাশকের নমুনা পরীক্ষা করে সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রমিয়ামের মতো ভারী ধাতু পাওয়া গেছে।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন বলেন, সার্বিকভাবে দেশের মাটির স্বাস্থ্য ভালো নেই। মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে মাটির কোনো বিশ্রাম নেই। সার-কীটনাশকের অতি ব্যবহারে মাটির তিনটি চরিত্রই ক্ষতিগ্রস্ত।

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে প্রকাশিত ‘হেভি মেটাল অ্যান্ড পেস্টিসাইডস টক্সিসিটি ইন এগ্রিকালচারাল সয়েল অ্যান্ড প্লান্টস ইকোলজিক্যাল রিস্কস অ্যান্ড হিউম্যান হেলথ ইমপ্লিকেশনস’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, ভারী ধাতু মাটিতে অণুজীবের টিকে থাকার পরিবেশ বদলে দেয়; উদ্ভিদের ডিএনএর গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি ফসলের মাধ্যমে মানুষের দেহে পৌঁছে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী ফরহাদ কাদের বলেন, ব্যাঙের ছাতার মতো প্রচুর বৈধ-অবৈধ কারখানা গড়ে উঠছে কৃষিজমির ধারে। সেগুলো নজরদারির মধ্যে আনতে হবে, পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে হবে। খাদ্যচক্রে অতিমাত্রায় যাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক না থাকে, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তদারকি বাড়াতে হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, গবেষণায় যখন নতুন কোনো তথ্য আসে, সেটা পর্যালোচনা করা হয়। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের তদারকি অব্যাহত আছে।

আরও পড়ুন

×