ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এ জনপদের অধিবাসীদের অন্তরলোক শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে চলেছে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোকরশ্মি শিক্ষার্থীদের জীবন ছাপিয়ে সব পর্যায়ের মানুষের চিন্তা ও কর্মকে করেছে দীপ্তিমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে যেমন জ্ঞাননির্ভর অসাম্প্রদায়িক বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনার সংযোজন ঘটেছে, তেমনি এ ক্যাম্পাসে অবস্থিত বহু ধর্ম-সম্প্রদায়-দর্শনের মানুষের ধর্মীয় স্থাপনা ও ভাস্কর্য সব মত-পথের মিলনস্থল হিসেবে একে চিত্রায়িত করেছে। এই ক্যাম্পাসে সব ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থান একে-অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিক্ষা দেয়। এখান থেকেই অসাম্প্রদায়িকতার দর্শন সারাদেশের মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে থাকে। এ ক্যাম্পাসজুড়ে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতীকের অবস্থান একদিকে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের বার্তা দেয়, অন্যদিকে তা এক ধর্ম-দর্শনের মানুষের পক্ষে অন্য ধর্ম সম্প্রদায়ের সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিয়েছে।
গুরুদুয়ারা নানক শাহি 
একেশ্বরবাদী ভক্তিবাদ প্রচারের অন্যতম পুরোধা ছিলেন গুরু নানক। তার ধর্ম-দর্শন ইসলামের সুফিবাদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। তিনি ধর্মীয় হানাহানি ভুলে মানব ধর্মের জয়গান করতে বলেছেন। শিখ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপাসনালয় গুরুদুয়ারা নানক শাহি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন ও রোকেয়া হলের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। ধারণা করা হয়, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ১৬০৬-১৬২৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে কোনো এক সময়ে এটি নির্মিত হয়েছিল। শিখ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি সংগত বলে অভিহিত হয়। প্রতি বছর বহু পুণ্যার্থী গুরুদুয়ারা ভ্রমণে আসেন।
জগন্নাথ হল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে জগন্নাথ হল রয়েছে। এ হলে বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে শান্তি ও সংহতিপূর্ণভাবে বসবাস করে। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পাহাড়ি-সমতলীয় নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা প্রীতিময় পরিবেশে অবস্থান করেন।
গৌতম বুদ্ধ 
জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে অহিংস মানবতাবাদী বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহামতি গৌতম বুদ্ধের একটি পদ্মাসনে অধিষ্ঠিত মূর্তি রয়েছে। ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল গৌতম বুদ্ধের মূর্তির নির্মাণকাজ শেষ হয়। নিজের মতো সবাইকে ভালোবাসা, মনকে পরিশুদ্ধ রাখা, অকুশল কর্ম থেকে বিরত থেকে কুশল কর্ম সম্পাদন করাই হলো বুদ্ধের শিক্ষা। জগন্নাথ হল বহু ধর্মের চর্চা ও মিলন কেন্দ্ররূপে মানবতার জয়গান গেয়ে চলেছে। মহামতি গৌতম বুদ্ধের মূর্তিটি সব ধর্মের মধ্যে সম্প্রীতির প্রতীকরূপে বিদ্যমান রয়েছে।
শ্রীচৈতন্য দেব
হিন্দু ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব এবং বাংলায় ভক্তিবাদের প্রচারক শ্রীচৈতন্য দেবের একটি মূর্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে নির্মিত হয়েছে। ভক্তিবাদের মূল সুর ছিল অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী সমাজ বিনির্মাণ। 
স্বামী বিবেকানন্দের ভাস্কর্য
স্বামী বিবেকানন্দ জগদ্বিখ্যাত মানবতাবাদী ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সম্প্রীতির বাণী প্রচার করে সবার কাছে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছেন। স্বামী বিবেকানন্দের একটি ভাস্কর্য ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে স্থাপিত হয়। 
উপাসনালয়
জগন্নাথ হলে বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষার্থীরা হল প্রাঙ্গণে অবস্থিত একটি মাত্র উপাসনালয়ে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নিজ নিজ ধর্মের উপাসনা করেন। ধর্মীয় সম্প্রীতির এটি একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শনের প্রবক্তাদের মূর্তি ও ভাস্কর্য এ হলকে সর্বধর্মীয় তীর্থকেন্দ্রে পরিণত করেছে।
সমাধি মন্দির 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে অবস্থিত সমাধি মন্দির। এটি বালিয়াটির জমিদার জগন্নাথ রায়ের মায়ের নামে উৎসর্গীকৃত। জগন্নাথ হল নির্মাণকালে কিশোরী লাল রায় চৌধুরী তার ঠাকুর মায়ের স্মরণে এটি নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে এ মন্দিরে একটি শিবলিঙ্গ স্থাপিত হয়।
গ্রিক সমাধি সৌধ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র প্রাঙ্গণে গ্রিক সমাধি সৌধ রয়েছে। এর অভ্যন্তরে মোট ১০টি সমাধিলিপি রয়েছে। সমাধি সৌধটি একটি স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে আদিতে রমনা এলাকায় নির্মিত হলেও পরে এটি বর্তমান এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। বাংলায় বসবাসরত গ্রিক ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের স্মরণে এটি নির্মিত হয়। সঠিক নির্মাণকাল জানা না গেলেও ধারণা করা হয়, এটি ১৮৬০ সালের মধ্যে নির্মিত।
শিববাড়ি মন্দির
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিকেল সেন্টারের পাশে শিববাড়ি মন্দির অবস্থিত। এ মন্দিরের প্রথম অংশে স্বামী ব্রজানন্দের সমাধি কক্ষ, দ্বিতীয় অংশে শিবলিঙ্গ এবং তৃতীয় অংশে সাধক পুরুষদের সমাধি রয়েছে। মন্দিরে একটি শিবলিঙ্গ পাথর রক্ষিত আছে। এ কারণে মন্দিরটির সঙ্গে সঙ্গে এ মহল্লাটি শিববাড়ি নামে পরিচিত। শিববাড়ি এলাকায় অবস্থিত আরও একটি প্রাচীন মন্দির রয়েছে।
কবি নজরুলের সমাধি সৌধ 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে প্রেম, দ্রোহ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কবি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি সৌধ রয়েছে। এই প্রাঙ্গণে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং প্রয়াত কয়েকজন অধ্যাপকের কবর রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অংশে বেশ কয়েকটি মসজিদ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের নাম মসজিদ আল জামিয়া। মসজিদ আল জামিয়া ১৯৬৬ সালে নির্মিত হয়। এটি কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির উত্তর-পশ্চিম পাশে অবস্থিত।
এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজুড়ে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা, সমাধি সৌধ, কবর ইত্যাদির পাশাপাশি অবস্থান এই ক্যাম্পাসকে ধর্মীয় সম্প্রীতির আদর্শ কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
সহযোগী অধ্যাপক; ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়