প্রথমে আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কার। এরপর হারালেন মেয়র পদও। গাজীপুরের সদ্য সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের ভাগ্যে আর কী অপেক্ষা করছে এ নিয়ে এখনও নানা গুঞ্জন আছে রাজনৈতিক মহলে। এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা হয়েছে। মানহানি ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এই মামলা করা হয়। তিনটি মামলারই বাদী হয়েছেন 'মানবিক বাংলাদেশ সোসাইটি' নামে একটি সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। আদালত থেকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগসহ (সিআইডি) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও কিছু ইউনিটকে এই মামলা তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। বিদ্যমান বাস্তবতায় এই ধরনের মামলার ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরাও দিয়েছেন নানা মত। এমন প্রশ্নও অনেকের- মামলার পর জাহাঙ্গীর গ্রেপ্তার হচ্ছেন নাকি তার ব্যাপারে এখন ধীরে চলো নীতি নেওয়া হচ্ছে?

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, মানহানির মামলা প্রমাণ করার নজির খুব একটা নেই। আদালতে এসব প্রমাণ করাও কষ্টসাধ্য। তবু বিশিষ্ট কাউকে কটাক্ষ করলে মানহানির মামলা করা হয়। তা বছরের পর বছর নানা পর্যায়ে পড়ে থাকতেও দেখা যায়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল সমকালকে বলেন, বাংলাদেশে মানহানির মামলা শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করে অর্থ আদায়ের কোনো কেসস্টাডি তার জানা নেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অনেক মামলা হচ্ছে। চূড়ান্ত কোনো রায় পেলে এর ভালোমন্দ দিকগুলো হয়তো আরও সামনে আসবে। অনেক সময় একই ঘটনায় অনেককে মামলা করতে দেখা যায়।

পুলিশের উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা বলছেন, একই ঘটনায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক মামলা হওয়ার পর আদালতের নির্দেশে পৃথক পৃথক ইউনিট তা তদন্ত করে। তবে বিচারের সময় আইন মন্ত্রণালয় বা উচ্চ আদালতের অনুমতি নিয়ে কমন অপরাধের জন্য একটি আদালতে বিচার হতে পারে।

আশপাশে কেউ নেই: পট পরিবর্তনের পর গাজীপুরের সাবেক মেয়রের আশপাশে এখন কেউ নেই। দীর্ঘদিন যারা তাকে ছায়ার মতো ঘিরে রেখেছেন, তাদের মধ্যে কেউ খোলস বদলেছেন। কেউ আবার গা-ঢাকা দিয়েছেন। গত ১৯ নভেম্বর আওয়ামী লীগ থেকে জাহাঙ্গীরের প্রাথমিক সদস্যপদ আজীবনের জন্য বাতিল করা হয়েছে। এরপর ২৫ নভেম্বর মেয়রকে তার পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। মেয়র পদ হারানোর পরপরই জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মুজিবর রহমান ওরফে বেনসন মুজিবর, আশরাফুল আলম রানা ওরফে শুটার রানা ও মনির হোসেন গা-ঢাকা দিয়েছেন। আর সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর গাজীপুরের গাছা এলাকার বাসায় বেশিরভাগ সময় অবস্থান করলেও সেখানে নেতাকর্মীদের আনাগোনা নেই। জাহাঙ্গীর তার ঘনিষ্ঠ দু-চারজনকে বলছেন, ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই স্বপদে ফিরবেন তিনি। তবে সরকারের একাধিক সূত্র বলছে, জাহাঙ্গীর তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে হাইকমান্ডের কাছে আস্থা হারিয়েছেন। আপাতত তার হারানো রাজত্ব ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে মামলায় গ্রেপ্তারের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন ধীরে চলো নীতি নিয়ে আছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী এই নীতি যে কোনো সময় পাল্টেও যেতে পারে।

ছয় মামলা: মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ২ ডিসেম্বর নওগাঁর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্টেট আদালতে মামলা করেন নাহিদ রনি নামে এক যুবক। রনি মানবিক বাংলাদেশ সোসাইটি নামে একটি সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। মামলাটি আমলে নিয়ে নওগাঁর আমলি আদালত-৫-এর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার জাহান পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ৩০ জানুয়ারির মধ্যে এ ব্যাপারে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলে করতে বলা হয়েছে।

২৯ নভেম্বর জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে। ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আসসামছ জগলুল হোসেনের আদালতে বাদী হয়ে মামলার আবেদন করেন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক উপকমিটির সদস্য মোহাম্মদ ওমর ফারুক আসিফ। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন এবং নথি পর্যালোচনার জন্য মামলাটি সিআইডির ওপরে ন্যস্ত করেন। একই সঙ্গে মামলা তদন্ত করে ৬ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

এর আগে রাজবাড়ী ১ নম্বর আমলি আদালতে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে মামলা করেন শশী আক্তার। তিনি মানবিক বাংলাদেশ সোসাইটি নামে একটি সংগঠনের রাজবাড়ী পৌর কমিটির সভাপতি। আদালতের বিচারক সুমন হোসেন বিষয়টি তদন্ত করে ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পিবিআইকে আদেশ দিয়েছেন।

২৫ নভেম্বর দুপুরে মাদারীপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্টেট আদালতে মামলাটি করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাবুল আকতার।

২৬ নভেম্বর পঞ্চগড়ের আদালতে আরেকটি মামলা হয়। মামলার বাদী আশিকুজ্জামান (২৫) নামে এক তরুণ। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও পঞ্চগড় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মানবিক বাংলাদেশ সোসাইটি নামে সংগঠনের পঞ্চগড় জেলা শাখার সভাপতি।