সরকার অনেক দিন ধরেই বলে আসছে, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। কিন্তু বাস্তবে কৃষক সঠিক সময়ে যথামূল্যে তা পাচ্ছেন না। এখন যেমন রবি মৌসুম শুরু হয়েছে, সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে সারের জন্য হাহাকার। পাশাপাশি সামনে আসছে বোরো মৌসুম। তখন কী হবে তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। কেন এমন হচ্ছে? সমকালের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তিনটি চক্রের অপতৎপরতায় দেশে সার নিয়ে এমন সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। আর এর ফল হিসেবে কৃষকরা সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। যখন পাচ্ছেন, তখন তা কিনতে হচ্ছে নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে। এতে কৃষকরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি ভর্তুকির সার নয়ছয় হওয়ায় সরকারও পড়ছে ক্ষতির মুখে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সার পরিবহন ঘিরে একটি চক্র গড়ে উঠেছে। এ চক্রটি নানা কৌশলে সার গুদামে নিয়ে যেতেই বিলম্ব করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে বাড়তি দামের পরিবেশ সৃষ্টি করে। এরপর রয়েছে দুর্নীতিবাজের চক্র। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ চক্রটি গুদাম থেকেই সার 'হাওয়া' করে দেয় এবং পাচার ও কালোবাজারিতে সহায়তা করে। তৃতীয় চক্রটি আমদানিকারকদের। কাগজে-কলমে অনেক প্রতিষ্ঠান সার আমদানিতে যুক্ত দেখা গেলেও, বাস্তবে এগুলোর মালিক অল্প কিছু ব্যবসায়ী। দেশে যেহেতু সারের বড় অংশই আমদানি করতে হয়, তাই এই ব্যবসায়ীরা সহজেই বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৪ লাখ ৪১ হাজার টন ইউরিয়া সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো উৎপাদন করে ৮ লাখ ৭৭ হাজার টন। বাকি ১৬ লাখ টন আমদানি করা হয় বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেটসহ (ডিএপি) অন্যান্য সারের ক্ষেত্রেও চিত্র প্রায় একই রকম। মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার উপপ্রধান বদিউল আলম জানান, এ বছরের শুরুতে ইউরিয়া সারের মজুদ ছিল ৯ লাখ ৫৬ হাজার টন। এরপর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে আমদানি হয়েছে সাড়ে সাত লাখ টন এবং উৎপাদন হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টন। মোট ২০ লাখ ৫৬ হাজার টনের মধ্যে ১০ লাখ ২৮ হাজার টন সার ডিলারদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। বাকি আট লাখ ৯০ হাজার টন ইউরিয়া সার বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) কাছে মজুদ আছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, চাহিদা ২৪ লাখ ৪১ হাজার টনের বিপরীতে জোগান ২০ লাখ ৫৬ হাজার টন। ফলে প্রায় চার লাখ টন আমদানি হয়নি। এটি ঘাটতি রয়েছে। এর দায় অবশ্যই আমদানিকারকদের। আবার চার লাখ টন সার কম আমদানি করার পরও বছর শেষে মজুদ আছে প্রায় ৯ লাখ টন। এর মধ্যে ডিসেম্বর মাসে চাহিদা তিন লাখ টন বাদ দিলে 'উদ্বৃত্ত' থাকবে ছয় লাখ টন। তার অর্থ হলো, প্রয়োজনের তুলনায় সার সরবরাহ করা হয়েছে অনেক কম। সেই কমের পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ টন (চার লাখ টন ঘাটতিসহ)।

আমদানি ও কারখানা পর্যায় থেকে ক্ষুদ্র বিক্রেতা পর্যায় পর্যন্ত পাঁচটি ধাপ পেরিয়ে সার যায় কৃষকের হাতে। আমদানি ও কারখানার সার থাকে বিসিআইসির হাতে, এর পর যায় সারাদেশের বাফার গুদামে, সেখান থেকে নিয়ে যায় সারাদেশের ডিলাররা, এরপর পান বিক্রয় প্রতিনিধিরা, তার পর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হাত হয়ে কৃষকের কাছে।

পরিবহন ঠিকাদার চক্র: রবি মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী সরকার আগেভাগেই জেলায় জেলায় সারের বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু সময় মতো তা সরকারি গুদামে যাচ্ছে না। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পরিবহন ঠিকাদাররা সার সরবরাহে বিলম্ব করছেন।

২০২১-২২ অর্থবছরে তিউনিসিয়া থেকে এমভি ভোলা নামের একটি মাদার ভ্যাসেলে ৩৩ হাজার টন টিএসপি আনা হয়। ৩১ আগস্ট বিএডিসি ২০ হাজার টন খুলনা থেকে বিভিন্ন গুদামে এবং ১৩ হাজার টন চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন গুদামে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এ কাজের জন্য প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। দায়িত্ব পেয়েছিল মেসার্স পোটন ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সময়মতো পরিবহন না করায় বিভিন্ন অঞ্চলে খোলা জায়গায় প্রায় সাড়ে আট হাজার টন টিএসপি সার পড়ে থাকে।

তিউনিসিয়া থেকেই ২০২০-২১ অর্থবছরে চুক্তির আওতায় ২০২১-২২ অর্থবছরে এমভি ববিক নামের একটি জাহাজে দ্বিতীয় লটে ৩০ হাজার ২৬০ টন কালো টিএসপি সার আনা হয়। গত ১১ অক্টোবর বিএডিসির কার্যাদেশে খুলনা থেকে ১৮ হাজার ২৬০ টন বিভিন্ন গুদামে এবং চট্টগ্রাম থেকে ১২ হাজার টন বিভিন্ন গুদামে পৌঁছানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। ঠিকাদার ছিল মেসার্স কে. এন এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানও সার সরবরাহ করে ঢিলেঢালাভাবে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে রাশিয়া থেকে তিনটি মাদার ভ্যাসেলে আনা ৯২ হাজার টন এমওপি সারের মধ্যে ২৫ হাজার টন এখনও সরকারি গুদামগুলোতে পৌঁছায়নি। এই সারের পরিবহন ঠিকাদার ছিল সার সেক্টরের আলোচিত প্রতিষ্ঠান মেসার্স পোটন ট্রেডার্স।

এ বিষয়ে পোটন ট্রেডার্সের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) শাহাদৎ হোসেনের ভাষ্য, জাহাজগুলো বন্দরে আসামাত্রই তো আনলোড করা যায় না। বিভিন্ন জেলায় পাঠাতে সময় লাগে।

পরিবহনে নিয়ম বদলের খেসারত: সার পরিবহনের নিয়ম বদলানোর পর থেকেই সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, ইউরিয়া সার পরিবহনের কাজটি বিসিআইসি কয়েকটি চক্রকে (সিন্ডিকেট) দেয়। টিএসপি ও ডিএপি সার পরিবহনের দায়িত্ব দেয় বিআরটিসিকে। পরিবহন সংস্থা কারখানা থেকে বা আমদানি করা সার নিয়ে বিভিন্ন জেলায় বাফার গুদামে পৌঁছে দেয়। সেসব গুদাম থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার ডিলার বরাদ্দ অনুযায়ী সার তুলে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি করেন।

ক'জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, আগে ডিলাররা নিজ খরচে কারখানা থেকে সার পরিবহন করে নিয়ে যেতেন। বিসিআইসি পরিবহন ব্যয় সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করে দিত। সে অনুযায়ী ডিলাররা কৃষক পর্যায়ে সার বিক্রি করতেন। যে কারণে যথাসময়ে ঠিক দামে কৃষক সার পেতেন। এখন কারখানা থেকে সার যায় বাফার গুদামে। সেখান থেকে নিজ নিজ জেলায় সার নিয়ে যান ডিলাররা। এই গুদামে যেতেই বিলম্ব করে পরিবহন সিন্ডিকেটটি।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে বছরে প্রায় দুই লাখ টন টিএসপি ও ডিএপি সার পরিবহন হয়। এখানে উৎপাদিত প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) টিএসপি সারের দাম বর্তমানে এক হাজার টাকা। কিন্তু উত্তরবঙ্গে কৃষক পর্যায়ে তা দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হয়। একইভাবে ডিএপি সারের সরকার নির্ধারিত মূল্য প্রতি বস্তা ৭০০ টাকা। কৃষক পর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকায়। একইভাবে ইউরিয়া সারের মিল রেট ৭০০ টাকা, কৃষকের কাছে বিক্রি ৯০০ থেকে এক হাজার টাকায়।

একটি সূত্র জানায়, টিএসপি কমপ্লেক্স সম্প্রতি সার পরিবহনে প্রতিদিন অন্তত ৩০টি ট্রাকের জন্য চাহিদাপত্র দেয়। কিন্তু বিআরটিসি ট্রাক দিচ্ছে গড়ে ২০টি। একইভাবে ৩০-৩৫টি ট্রাকের চাহিদার বিপরীতে ডিএপি সার কারখানাকে ট্রাক দিচ্ছে গড়ে ৮-১০টি। এ পরিবহন ও সরবরাহ সংকটে কৃষক পর্যায়ে যেতে সারের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

গুদামের সার গায়েব: পরিবহন ঠিকাদার ও গুদামের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কৃষকদের জন্য আমদানি করা সার আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি জামালপুরের সরিষাবাড়ীর যমুনা সার কারখানা থেকে ২০ হাজার টন ইউরিয়া সার গায়েব হয়েছে। এ ঘটনায় ২ ডিসেম্বর ওই কারখানার তিন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে।

এর আগে গত আগস্টে ভুয়া বিল-ভাউচারে সিলেটের শাহজালাল সার কারখানার ৩৮ কোটি ৭১ লাখ ২৪ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা পায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা করে দুদক।

এ ছাড়া চলতি বছরের মার্চে বিএডিসির খুলনার গুদামে সংরক্ষিত ৭২৮ টন সারের হদিস পাওয়া যায়নি। খুলনায় বিএডিসির যুগ্ম পরিচালকের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি মজুদ নিরূপণ কমিটি গুদামগুলো পরিদর্শনকালে এই গরমিলের বিষয়টি ধরা পড়ে।

আমদানিকারক চক্র: ভর্তুকি দিয়ে টিএসপি সার আমদানি করছে সরকার। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) তালিকাভুক্ত ৩২টি প্রতিষ্ঠান নন-ইউরিয়া সার আমদানি করবে। এসব প্রতিষ্ঠান সার আমদানিতে সরকারের ভর্তুকি পেয়ে থাকে। দেখা গেছে, এ প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা হলেও মালিকানা অল্প কয়েকজনের। যেমন- নোয়াপাড়া ট্রেডার্স, সাইফুল্লাহ গালফ ও তায়িবা সাইফুল্লাহ নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিক সাদিকুর রহমান। ডেইলি ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেড, বঙ্গ ট্রেডার্স লিমিটেড, এশিয়া ওয়ান ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেড, ডিরেক্ট কোম্পানি লিমিটেড ও ইউরেশিয়া ট্রেডিং কোম্পানি- এই পাঁচটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিক শেখ জসিম উদ্দিন। দু'জনই আটটি প্রতিষ্ঠানের মালিক।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) চেয়ারম্যান কামরুল আশরাফ খান পোটন বলেন, একই মালিক ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির নামে দরপত্রে অংশ নিতে পারেন। ভর্তুকি পাওয়া কোম্পানিগুলোর মালিক একজনও হতে পারেন। এখানে আমাদের হাত নেই।

কামরুল আশরাফ পোটনের বিরুদ্ধে আমদানি করা সার গুদামে পৌঁছে না দিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে।

ডিলারদের অনেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমদানিকারকদের সিন্ডিকেটের কারণে তাদের ভুগতে হচ্ছে। হাতেগোনা কয়েকজন ব্যক্তি নন-ইউরিয়া সার আমদানি করে থাকেন। তারাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন।

একটি সার কোম্পানির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো ছোট ডিলার যদি দাম বাড়ায়, তাহলে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সারের দাম বাড়ত। কিন্তু সারাদেশেই যেহেতু সারের দাম বেড়েছে, সেহেতু বলা যায় দাম বৃদ্ধির পেছনে আমদানিকারক ছাড়া অন্য কারও হাত নেই।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, দেশের কোথাও যাতে সারের সরবরাহ এবং দাম নিয়ে ছলচাতুরী, কারসাজি ও কালোবাজারি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখছি। সারের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। বিশ্ববাজারে সারের দাম তিনগুণ বেড়েছে; কিন্তু দেশে সারের দাম বাড়ানো হবে না। কেউ যেন কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সুযোগ না নিতে পারে, সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সতর্ক আছেন।