সুশাসন নিশ্চিত না হলে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বহুত্বের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠাই স্থিতিশীল শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে।  শনিবার ঢাকায় শুরু হওয়া বিশ্বশান্তি সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে প্যানেল আলোচনায় এ মত দিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞ আলোচকরা।

ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্যানেল আলোচনার শুরুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, কারও একার পক্ষে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। শান্তি প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। শান্তি সম্মেলন উপলক্ষে ফশফন ফরেন সার্ভিস একাডেমি চত্বরে একটি আর্ট ক্যাম্পেরও উদ্বোধন করেন তিনি।

দিনের শুরুতে প্রথম প্যানেল আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল 'পিস, জাস্টিস অ্যান্ড রাইটস'। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের সঞ্চালনায় এতে অংশ নেন আর্জেন্টিনার লেমকিন ইনস্টিটিউট অব জেনোসাইডের কো-প্রেসিডেন্ট প্রিভেনশন ইরিনা ভিক্টোরিয়া মাসিমিনো, সিডনি পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ার আর্চি ফিলিপ ল, ওমানের ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ সাদ আল মোকাদ্দেম, জাপানের ইউএন কমিটি অন দ্য রাইটস অ্যান্ড দ্য চাইল্ড অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটসের আইনজীবী ড. মিকিকো ওটানি, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য পবিত্র সরকার, ইরাকের ইতিহাসবিদ আহমদ জালালউদ্দিন মোস্তাক এবং কানাডার মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ মিখাইল ফিগোরা।

প্যানেল আলোচনার উদ্বোধন করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শান্তির দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। তার রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল শান্তি প্রতিষ্ঠা। তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি এর বিশ্ব স্বীকৃতি পেয়েছিলেন 'জুলিওকুরি' পদকে ভূষিত হয়ে।

তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শান্তি প্রতিষ্ঠার সেই মূল নীতিতেই বিশ্বাস করেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে যেমন শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তেমনি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘে রেজুলেশন নেওয়া হয়েছে তার প্রস্তাবেই। এ কারণেই বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে এই শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের কোন দিকে দৃষ্টি দিতে হবে, তা নিয়েই দু'দিনব্যাপী বিষয়ভিত্তিক প্যানেল আলোচনা হবে।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার শান্তি প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য। এটা যেমন একটি দেশের অভ্যন্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য, তেমনি বিশ্ব ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

লেমকিন ইনস্টিটিউটের ইরিনা ভিক্টোরিয়া মাসিমিনো বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হচ্ছে সুশাসন। সুশাসন না থাকলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না। ন্যায়বিচার না থাকলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, শান্তির দর্শন একাডেমিক পরিসরে ব্যাপকভিত্তিক আলোচনার বিষয়বস্তু হলেও বাস্তবে বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশে সুশাসনের অভাব রয়েছে। বিশ্ব ব্যবস্থা যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সে ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার ও সমঅধিকারের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত নয়। এ কারণেই শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংকট প্রকট।

সিডনি পিস ফাউন্ডেশনের আর্চি ফিলিপ বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পরমতসহিষ্ণুতা এবং সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠা খুব জরুরি। প্রথমেই বুঝতে হবে, যার জন্ম যে দেশেই হোক না কেন, এখন প্রত্যেক মানুষই আসলে বিশ্ব নাগরিক। শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্ব নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গি খুবই প্রয়োজন।

ওমানের ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মোকাদ্দেম বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদার নীতির প্রকাশ ঘটেছে প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বিপন্ন রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে। এখানেই শান্তি প্রতিষ্ঠার দর্শনেরও প্রতিফলন ঘটে। কারণ, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমেই শান্তি প্রতিষ্ঠার বাস্তব পরিবেশ তৈরি করা যায়। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, আমরা যেন কেউ কারও বিপদের কারণ না হই।

দ্বিতীয় প্যানেল আলোচনার শিরোনাম ছিল :পিস থ্রো সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ওয়েলবিং। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজার সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচক ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার পিস জেনারেশনের নির্বাহী পরিচালক ইরফান আমালি, ভুটানের সেন্টার ভুটান স্টাডিজ অ্যান্ড গ্রোস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস রিসার্চ সেন্টারের প্রেসিডেন্ট দাসো করমা উরা, যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ফর উইমেন পিসবিল্ডার্সের নির্বাহী পরিচালক মারিয়া ভিক্টেরিয়া ক্যাবরেরা বালেজা, মরিশাসের ডিজঅ্যাবিলিটি রাইটস অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইনার আলি জুকহুন ওএসকে এবং বাহরাইনের সোস্যাল ইনফ্লুয়েন্সার সাইকা নুরা আল খলিফা।

ইন্দোনেশিয়ার ইরফান আমালি বলেন, বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রতিটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম, বর্ণ এবং গোত্রের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেন। বহুত্বের মধ্যে এই ঐক্য প্রতিষ্ঠার সফলতাই হচ্ছে শান্তি প্রতিষ্ঠার মূলমন্ত্র। রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিটি দেশের সরকারকে এই মূলমন্ত্র গ্রহণ করতে হবে। তেমনি সাধারণ মানুষকেও একই চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

ভুটানের দাসো করমা উরা বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক বৈষম্য দূর করতে হবে। যে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য যত বেশি, সে সমাজে অশান্তি তত বেশি। বৈষম্য দূর করতে হলে প্রতিটি দেশেই সবার সমান শিক্ষার অধিকার এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল শিক্ষিত রাষ্ট্র গঠন করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মারিয়া ভিক্টোরিয়া বলেন, উন্নত কিংবা অনুন্নত উভয় সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নানা মাত্রায় এখনও বিদ্যমান। সমাজ ও রাষ্ট্রের সত্যিকারের উন্নয়নের জন্য নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করা জরুরি।