জমিজমা নেই। আর এ কারণে মেধা পরীক্ষায় পঞ্চম হয়েও কনস্টেবল পদে চাকরি পাবেন না- এটা জানার পর বরিশালের আসপিয়া বেগম নামে এক তরুণী জেলা পুলিশ লাইন্সের সামনে হতাশ হয়ে বসে ছিলেন। ওই ছবি মুহূর্তে ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মনে দাগ কাটে আসপিয়ার হাহাকার। এর পর একই ধরনের ঘটনার শিকার হন খুলনায় মিম আক্তার নামে এক তরুণী। মেধাক্রমে প্রথম হয়েও চাকরি পাবেন- এমন নিশ্চয়তা তার নেই। আসপিয়া আর মিম বলছেন, "ভূমিহীন হওয়ায় চাকরি মিলবে না- এটা দুঃখজনক। কোনো বিধি বা আইনে এই নিয়ম থাকলে তা বদলে ফেলার সময় এসেছে। কোনো নিয়োগ পরীক্ষায় 'ভূমিহীনের চাকরি নেই'- এমন বিধিবিধান থাকতে পারে না।"

ঠিক কী কারণে ভূমিহীন হওয়া চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা- এটা জানতে পুলিশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, শুধু পুলিশে নয়, যে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে জেলা কোটার মাধ্যমে যে নিয়োগ সম্পাদন করা হয়, সেখানে চাকরিপ্রত্যাশীর স্থায়ী ঠিকানা দেখা হয়। স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত করতে গিয়ে চাকরিপ্রার্থীর বাবা-মা, দাদা-দাদি এবং অন্য কোনো পূর্বসূরির জমিজমা ও ফ্ল্যাট আছে কিনা, তা যাচাই করা হয়। জেলা কোটার মাধ্যমে চাকরির জন্য আবেদন করেছেন, কিন্তু ওই জেলায় তাদের কোনো জমিজমার অস্তিত্ব না থাকলে 'ভূমিহীন' বলে উল্লেখ করা হয় ওই যাচাইয়ে। এতকাল ধরে জেলা কোটার সব নিয়োগেই স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত হওয়ার পরই চাকরি পেয়ে আসছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। আর যাদের জমিজমা নেই বা ভূমিহীন, তাদের কপাল পুড়েছে।

তবে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশের নাগরিক কিন্তু এক ছটাকও জমিজমা নেই- এই অজুহাতে ভূমিহীনের সংজ্ঞায় ফেলে মেধাবীদের চাকরি থেকে বঞ্চিত করা অন্যায়। ভূমিহীনের পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) থাকলে চাকরি পেতে বাধা কেন! এ ছাড়া নদীভাঙনে অনেক পরিবার রাতারাতি ভূমিহীন হয়ে নতুন কোনো জেলা ও বড় শহরে গিয়ে বসতি তৈরি করছেন। ভাড়া বাসায় সেখানে তারা বছরের পর বছর বসবাসও করে আসছেন। এ ছাড়া চাকরি বা সন্তানের লেখাপড়ার জন্য অনেক পরিবার গ্রাম থেকে জমিজমা বিক্রি করে শহরে আসছে। আবার কেউ পুরো পরিবারসহ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। সন্তানকে লেখাপড়া শিখিয়ে কেউ দেশে ফিরে চাকরি খুঁজছেন। নানা কারণে ভূমিহীন এমনকি গৃহহীন লোকের সংখ্যা সমাজে কম নয়। নগরায়ণ বিস্তৃত হওয়ার কারণে মানুষ তার আদি ঠিকানাও দ্রুত বদলাচ্ছে। চলমান এমন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই 'ভূমি না থাকলে চাকরি হবে না'- এই বিধিবিধান বদলের কথা জোর দিয়েই বলছেন অনেকে। পুলিশের নীতিনির্ধারকরাও বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন। তারা সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন।

শুধু ভূমিহীন হওয়ায় চাকরি পাবেন না- বরিশালের আসপিয়া বেগম এ খবর জানার পর অনশনে বসার হুমকি দেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। দ্রুত তার চাকরির ব্যবস্থা করার দাবিও করেন তিনি। আসপিয়ার পক্ষে কবি নির্মলেন্দু গুণের এমন অবস্থানের পরপরই সমাজের অনেকে তাকে জমি ও ঘরবাড়ি তৈরি করে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। নির্মলেন্দু গুণ সমকালকে বলেন, নদীভাঙনসহ নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে পড়ে কত মানুষ স্থায়ী ঠিকানা হারিয়ে অস্থায়ী ঠিকানার সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে! স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় চাকরি পাবেন না- এটা কোনো সভ্য সমাজের নিয়ম হতে পারে না।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার সমকালকে বলেন, কেউ সংশ্নিষ্ট জেলার বাসিন্দা কিনা, সেটা জানার জন্য কেন তার জমিজমা থাকা লাগবে? এনআইডি, পাসপোর্ট বা নাগরিকত্ব সনদ থাকাই যথেষ্ট। আমার এমন অনেক আত্মীয়স্বজন চাকরি পেয়েছেন, যারা সারাজীবন ভাড়া বাসায় ছিলেন। তাদের জমিজমাও ছিল না। পরবর্তী সময়ে সরকারের উঁচু পদেও তারা গেছেন।

বরিশালের আসপিয়া সমকালকে বলেন, তার বাবার গ্রামের বাড়ি ভোলার চরফ্যাসনের হালিমাবাদ গ্রামে। আর মায়ের বাড়ি পিরোজপুরে। তারা বহু বছর ধরে হিজলায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছেন। এখানে জন্ম, এখানেই পড়াশোনা। সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জমি না থাকার কারণে চাকরি হবে না- এটা জানার পরই হতাশ হয়ে পড়েছি। এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কিছু হতে পারে না।

খুলনার মিম আক্তার বলেন, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার বিষয়টি স্যাররা আগেই আমাকে জানিয়েছেন। পরে জানতে পারি, পুলিশ ভেরিফিকেশনে কোনো সমস্যা। আমার স্থায়ী ঠিকানা নেই। খুলনায় আমাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। দাদাবাড়ি বাগেরহাটের চিতলমারী। খুলনা ও বাগেরহাট কোথাও আমাদের জমিজমা নেই। পরীক্ষায় এত ভালো করলাম, কিন্তু হলো না। আমার সঙ্গে গোটা পরিবারই মর্মাহত হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, চাকরিপ্রত্যাশী কেউ কোনো অপরাধে জড়িত কিনা, তা যাচাই করা হয় স্থায়ী ঠিকানা হিসাব করেই। আর স্থায়ী ঠিকানার মানদণ্ড হলো, কোনো চাকরিপ্রত্যাশীর বাবা-দাদার জমিজমা সংশ্নিষ্ট জেলায় রয়েছে কিনা। এ ছাড়া তাদের কোনো ফ্ল্যাট আছে কিনা। সব চাকরিতে জেলা কোটা এ কারণেই করা হয়, যাতে সব জেলার বাসিন্দারা সমান সুযোগ পান।

শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, যুগের চাহিদা ও বাস্তবতা বিবেচনা করে জেলা কোটায় চাকরিতে যেসব বিষয়ের আলোকে একজনের স্থায়ী ঠিকানা বা ভূমি থাকার বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়- এই সংজ্ঞা পরিবর্তন করা যেতে পারে। সরকার চাইলে এটা যে কোনো সময় পাল্টাতে পারে। তবে বিসিএস চাকরিতে কোটা না থাকায় সেখানে প্রার্থীকে এ ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যে কোনো চাকরিতে জেলা কোটা ও স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহারে জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। পরে ভেরিফিকেশনে ধরা পড়ে চাকরিও গেছে অনেকের।