দেশে গত শনিবার পর্যন্ত করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণ করেছেন ৬ কোটি ৬৫ লাখ ১৪ হাজার ৮৮৬ জন। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করেছেন ৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ৬৯১ জন। সরকার ১২ কোটি ৮০ লাখ মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ হিসাবে এক ডোজ করে ৫১ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং ৩৩ দশমিক ৪০ শতাংশ মানুষ দুই ডোজ করে টিকা পেয়েছেন। এর বাইরেও বিপুলসংখ্যক মানুষ টিকার অপেক্ষায় রয়েছেন। টিকাদান কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না। এমনকি টিকাদানে জনসাধারণকে আগ্রহী করে তুলতে তেমন প্রচার-প্রচারণাও নেই। এর মধ্যেই টিকা নিয়ে এক ধরনের নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। টিকার দুই ডোজ গ্রহণকারীদের অনেকেই বুস্টার ডোজ নিয়েছেন। এ সংখ্যা কত তার সঠিক হিসাব নেই। ওমিক্রন সংক্রমণের বিষয়টি আলোচনায় আসার পর গোপনে বুস্টার ডোজ গ্রহণের হিড়িক পড়েছে। অনৈতিকভাবে অনেকেই টিকার তৃতীয় ডোজ নিলেও রেকর্ডপত্রে এর উল্লেখ পর্যন্ত নেই।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকার একটি সরকারি হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে তার অফিস কক্ষে টিকার বুস্টার ডোজ নিয়ে কথা হচ্ছিল এ প্রতিবেদকের। তার ভাষ্য, সরকারিভাবে দেশে বুস্টার ডোজ কার্যক্রম শুরু হতে আরও দেরি আছে। কিন্তু চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যারা সরাসরি রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত, তাদের বুস্টার ডোজ এখনই দরকার। গবেষণায় এসেছে, দুই ডোজ টিকার কার্যকারিতা ছয় মাস কিংবা তার কিছু বেশি সময় পর্যন্ত থাকে। এরপর কার্যকারিতা হ্রাস পেতে থাকে। তখন করোনা সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনেকে অবহিত করলেও তাতে সাড়া মেলেনি। এরপর মূলত অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকেই বুস্টার বা তৃতীয় ডোজের টিকা গ্রহণ করেছেন।

তার প্রতিষ্ঠানে কতজন বুস্টার ডোজ নিয়েছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ওই পরিচালক বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। কারণ টিকাকার্ডে বুস্টার ডোজের টিকা যুক্ত হবে না। কিংবা সরকারি পরিসংখ্যানেও আসবে না। তাহলে ওই টিকার হিসাব কীভাবে হবে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, বিতরণকালে ১০ শতাংশ টিকা নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং এটা কাগজে দেখানোও যায়। ফলে বুস্টার ডোজের সংখ্যাকে নষ্ট টিকার সংখ্যা হিসাবে দেখানো যায়। এ কারণে কতসংখ্যক বুস্টার ডোজ প্রদান হয়েছে, তা জানা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন তিনি।

পরিচালকের বক্তব্যের সত্যতা মিলল রাজধানীর বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক কর্মকর্তার বক্তব্যে। আলাপের এক পর্যায়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, গত অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে একটি সরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসক বন্ধু ফোন করে তাকে বুস্টার ডোজ গ্রহণের পরামর্শ দেন। ওই সহকর্মীরা প্রত্যেকেই আগের মাসে বুস্টার ডোজ গ্রহণ করেছেন। এরপর তিনি নিজেও বুস্টার ডোজ নেন।

রাজধানীর সরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসক সমকালকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু মজুদ ছিল অনেক বেশি। টিকা গ্রহীতার সাড়া কম থাকায় চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বুস্টার ডোজ গ্রহণ করেন। এরপরও অনেক টিকা নষ্ট হয়ে যায়।

এভাবেই অনেকটা গোপনে টিকার বুস্টার ডোজ গ্রহণের হিড়িক পড়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গত শনিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে আগামী সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে বুস্টার ডোজ শুরুর সম্ভাবনার কথা বলেছেন। কিন্তু বাস্তবে হাজার হাজার মানুষ এর মধ্যেই বুস্টার ডোজ নিয়েছেন। স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক চিকিৎসক-কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকেই বুস্টার ডোজ গ্রহণ শুরু হয়। কিন্তু সেটি টিকাকার্ডে যুক্ত হয়নি কিংবা সরকারি হিসাবেও আসেনি। সরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের মাধ্যমে এ প্রবণতা শুরু হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। পরে মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি পদস্থ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।

এ পর্যন্ত বিতরণ করা টিকার কত শতাংশ নষ্ট হয়েছে, তা জানতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. সামসুল হককে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনিও সঠিক তথ্য জানাতে পারেননি। ডা. নাজমুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ডা. সামসুল হক বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত আছেন। তার কাছ থেকে জেনে জানানো যাবে। কিন্তু সামসুল হক তার ফোনও রিসিভ করেননি। এ কারণে নষ্ট হওয়া টিকার সঠিক পরিসংখ্যান জানা যায়নি।

তবে স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্নিষ্টদের ধারণা, বিতরণকালে পাঁচ শতাংশ হারে টিকা নষ্ট ধরা হলে বাস্তবে তা আরও কম হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এক থেকে দুই শতাংশ টিকা বুস্টার ডোজ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। এক শতাংশ হারে হলে এক লাখের বেশি এবং শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হারে হলে ৫০ হাজার মানুষ বুস্টার ডোজ নিয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, বুস্টার ডোজ গ্রহণের বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। কারণ সরকারিভাবে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা এখনও দেওয়া হয়নি। সুতরাং কেউ নিয়ে থাকলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

গত জুন-জুলাই থেকে বিশ্বের অনেক দেশে বুস্টার ডোজ গ্রহণ শুরু হয়। কিন্তু দেশে গোপনে তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ গ্রহণ শুরু হয় আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে। অনেকটা গোপনে এ কার্যক্রম শুরু হলেও পরে ঘটনাটি ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়। বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষের নজরে এলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালক সমকালকে বলেন, কোনো মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক দলের নেতা, সচিব বুস্টার ডোজ গ্রহণ করতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়া একজন পরিচালকের পক্ষে সম্ভব নয়। আবার চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বুস্টার ডোজ গ্রহণ করায় সেসব ব্যক্তিকে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে নৈতিক মনোবলও জোরালো থাকে না। এ কারণে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে যারা বুস্টার ডোজ গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তাদের কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া যায়নি।

গোপনে বুস্টার ডোজ গ্রহণের সমালোচনা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম চরম নৈতিকতাবিরোধী। অধিকাংশ মানুষ এখনও টিকা পাননি। এরপরও দুই ডোজ টিকা গ্রহণ করে যারা বুস্টার ডোজ নিয়েছেন, তাদের সম্পর্কে কিছু বলার নেই। সরকারি অব্যবস্থাপনার কারণে এমনটি ঘটছে। কারণ টিকা নিয়ে কোনো প্রচার-প্রচারণা নেই। শহরকেন্দ্রিক কার্যক্রম চলছে ঢিমেতালে। এর বাইরে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনও টিকা পায়নি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, দেশের ষাটোর্ধ্ব ও ফ্রন্টলাইনারদের বুস্টার ডোজের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে এ কার্যক্রম শুরু হবে। বুস্টার ডোজ পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির কার্যক্রম চলছে।