‘ভাত দে’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ এমন কালজয়ী অনেক ছবির নির্মাতা  আমজাদ হোসেন চলে যাওয়ার তিন বছর পূর্ণ আজ। ২০১৮ সালের এই দিন ৭৬ বছর বয়সে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দেশবরেণ্য এই চলচ্চিত্রকার। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন অভিনেত্রী ববিতা


সেই ষাটের দশকে এ দেশের চলচ্চিত্রের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছিলেন। অল্প সময়েই হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয়। বাংলা চলচ্চিত্রের প্রবাদপুরুষ আমজাদ হোসেন- যিনি একাধারে অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার, সংলাপকার, গীতিকার, নাট্যকার, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক। চলচ্চিত্রের মানুষ তাকে আপন করে নিয়েছেন। এই অর্জন সম্ভব হয়েছে কাজের প্রতি তার অসামান্য নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও ভালোবাসার কারণেই। তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে আরও নিখুঁতভাবে গড়ে তুলতে চাইতেন। একজন প্রকৃত ও গুণী শিল্পী হিসেবে এই নিষ্ঠা তার ছিল। জহির ভাইয়ের [জহির রায়হান] সঙ্গে আমজাদ ভাইকে সবসময় দেখেছি। বাসায় আসতেন প্রায়ই। যেজন্য ছোটবেলায় তাকে দেখে দেখে বড় হয়েছি। একদিন 'নয়নমনি' ছবির প্রস্তাব নিয়ে বউসহ তিনি আমাদের বাসায় এলেন। ছবির গল্প শুনিয়ে বললেন, এটি অদ্ভুত সুন্দর গল্প। এই ছবিটি আপনাকে করতে হবে। আমার শিডিউল চাইলেন। তখন আমি ব্যস্ত। হাতে অনেক ছবি। অনুরোধ করে আবারও বললেন, 'অভিনয় করে দেখুন, আপনার ভালো লাগবে।' এভাবেই 'নয়নমনি'র কাজ শুরু। সত্যিই 'নয়নমনি' ছবিটি আমাকে অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।

ওই সময় এটি মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবসহ অনেক আন্তর্জাতিক উৎসবে এটি অংশ নিয়েছিল। মস্কো উৎসবে কলকাতার খ্যাতিমান নির্মাতা মৃণাল সেন ছবিটি দেখে প্রশংসা করেছেন। 'নয়নমনি'র পর 'সুন্দরী', 'কসাই', 'বড় বাড়ির মেয়ে', 'গোলাপী এখন ট্রেনে' ছবিতে অভিনয় করেছি। মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে তিনি আরেকটি ছবি নির্মাণ শুরু করেছিলেন। এটি শেষ করতে পারেননি। এতে আমি অভিনয় করেছিলাম। এটি শেষ হলে অসাধারণ একটি ছবি হতো। কতশত স্মৃতি তার সঙ্গে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে রঙিন দিনগুলো। অশ্রুসিক্ত করে আমাকে। আমার প্রিয় পরিচালক আমজাদ হোসেন। ষাট দশকের পাকিস্তানি ছবির দাপটের মধ্যে এ দেশে কম বাজেটের বাংলা ছবি নির্মাণ করা রীতিমতো যুদ্ধ ছিল। আমজাদ হোসেন ছিলেন এ দেশের সিনেমার পক্ষে সেই লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান যোদ্ধা। তিনি নিরলস পরিশ্রমে বাংলা চলচ্চিত্রকে দৃঢ় ভিত্তিমূলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে একটা মাইলফলক 'গোলাপী এখন ট্রেনে'। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছিল ছবিটি। কী অসাধারণ এর নির্মাণশৈলী। ছবিটিতে ছিল বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের গল্প। গোলাপীকে প্রশ্ন করা হচ্ছে 'তোমরা যে ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাসে এসে ঢুকলা, তোমরা টিকেট কেটেছো?' উত্তরে সে বলছে, 'বাংলাদেশে কোনো কেলাস [ক্লাস] নাইক্যা, আমরা হগলেই এক কেলাসের [ক্লাস] মানুষ।'- এই সংলাপটি কী অসাধারণ ভাবেই না আমজাদ ভাই সেলুলয়েডের পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। 'গোলাপী এখন ট্রেনে'র কাজে জামালপুরে যাচ্ছি। সেই সময় ট্রেনেই আমজাদ ভাই লিখলেন 'হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ' গানটি।

এখনও এটি মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তার গ্রামীণ ছবির প্রতি ঝোঁক ছিল। যেজন্য প্রায় ছবিরই শুটিং করতেন গ্রামে। প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যেও মানিকগঞ্জে নয়নমনির শুটিং করেছি। নিজেদের প্রোডাকশন মনে করে গ্রামেগঞ্জে ঘুরেছি। দীর্ঘ সময় চলচ্চিত্র অঙ্গনে আমাদের পদচারণা ছিল। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে জেনেছি- পরিচালনা, অভিনয় আর লেখালেখির প্রতি তার আছে অকৃত্রিম ভালোবাসা। শিল্পীসত্তাকে সমৃদ্ধ করতে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। চলচ্চিত্রকার-লেখক পরিচয়ের বাইরেও একজন সাদা মনের মানুষ ছিলেন তিনি। সবসময় তাকে মনে হয়েছে আমাদেরই একজন। তার মতো আবেগী মানুষ জীবনে খুব কমই দেখেছি। সবার বিপদে-আপদে এগিয়ে আসতেন। সময়কে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রচেষ্টা ছিল তার। খ্যাতির মোহ কখনও পেয়ে বসেনি। বাংলা চলচ্চিত্র যতদিন আছে, আমজাদ হোসেনের অবস্থান অমলিন থাকবে। আর ক'দিন পরই তার মৃত্যুবার্ষিকী। দেখতে দেখতে কেটে যাচ্ছে তিনটি বছর। একজন আমজাদ হোসেন আমাদের বাঙালি জাতির অহংকার, চলচ্চিত্রের গর্ব। তারমতো গুণী মানুষ সৃষ্টি দিয়েই আজীবন বেঁচে থাকবেন।