রাজধানীর ৭২, কাকরাইল ঠিকানার চার তলা পুরাতন ভবনটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কার্যালয়ের বিপরীতে। ক্রয় সূত্রে এ জমি ও ভবনের মালিক ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ২০১৫ সালের মে মাসে বীমা কোম্পানিটি ৩২ শতাংশ আয়তনের এ জমি ২২৩ কোটি টাকায় কেনে মফিজুল ইসলাম ও তার পুত্র সেলিম মাহমুদের কাছ থেকে। ফারইস্ট লাইফের কাছে বিক্রির মাত্র ১০ মাস আগে এ জমি তারা ১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকায় কেনেন। সম্পর্কে তারা দুইজন ফারইস্ট লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের শ্বশুর ও শ্যালক। নজরুল ইসলাম চেয়ারম্যান থাকার সময়ে এ জমি কেনাবেচা হয়।
এ জমি কেনাবেচার মাধ্যমে চেয়ারম্যানের শ্বশুর ও শ্যালক ১৯৮ কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যক্তিগতভাবে লাভ করেন। ফারইস্ট লাইফের কাছ থেকে দাম বুঝে পাওয়ার পরই উপহার হিসেবে ১১৫ কোটি টাকা নজরুল ইসলামের স্ত্রী তসলিমা ইসলামের অ্যাকাউন্টে জমা দেন। আবার তসলিমা ইসলামও তার স্বামীকে ৫০ কোটি টাকা উপহার দেন। বিশাল অঙ্কের এ উপহারের তথ্য তারা ওই বছরের আয়কর নথিতেও উল্লেখ করেন।
সম্প্রতি শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির উদ্যোগে এক বিশেষ নিরীক্ষায় এমন অস্বাভাবিক দামে জমি কেনাবেচার মাধ্যমে ফারইস্ট লাইফের অর্থ লোপাট এবং এর শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের দুর্নীতির তথ্য উদ্ঘাটন করেছে। কমিশনের প্রতিবেদনে এ-সংক্রান্ত সকল লেনদেনকে সুস্পষ্ট মানি লন্ডারিং অপরাধ উল্লেখ করে অর্থ মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং সিআইডিকে দিয়েছে। পরে এসব সংস্থা মিলে এ বিষয়ে একটি যৌথ তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিএসইসির কমিশনার মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান এ. ওয়াহাব অ্যান্ড কোংকে বিশেষ নিরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ফারইস্টের ওপর নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। বিশেষ এ নিরীক্ষায় দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, উদ্যোক্তা-পরিচালক এমএ খালেক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেমায়েত উল্লাহ এসব অনিয়ম থেকে লাভবান হয়েছেন। অন্যরাও জড়িত থাকতে পারেন।
কমিশনের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন বিষয়ে জানতে সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, উদ্যোক্তা এমএ খালেক এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেমায়েত উল্লাহকে বারবার ফোন করা হয়। তাদের সকলের ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। অন্য কোনো উপায়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনে বিএসইসি জানিয়েছে, গত এক যুগে ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরের ৮৫৮ কোটি টাকারও বেশি মূল্যে ফারইস্ট লাইফ বেশ কিছু জমি ও ভবন কিনেছে। প্রতিটি ক্রয় হয়েছে পরিচালনা পর্ষদের স্বার্থসংশ্নিষ্টদের কাছ থেকে এবং বাজারের চেয়ে অনেক বেশি দামে।
ফারইস্ট লাইফ ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মাঝে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে মোট ৩৬৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা আমানত রাখে। এর বিপরীতে উদ্যোক্তা এমএ খালেক ৩১২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ঋণ নেন এবং তিনি খেলাপি হন। পরে ওই তিন ব্যাংক ফারইস্ট লাইফের আমানত দ্বারা ওই ঋণ সমন্বয় করেছে।
বিএসইসির প্রতিবেদনে এসব ঘটনায় ফারইস্ট লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, উদ্যোক্তা এমএ খালেক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেমায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ এনেছে। এতে বলা হয়েছে, তাদের পারস্পরিক যোগসাজশ ও পরিকল্পনার অর্থ লোপাট হয়েছে। অস্বাভাবিক দামে জমি কেনাবেচার বাইরে তারা নিজেদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে শত শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি সাধন করেছেন। যেমন, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ফারইস্টের গচ্ছিত আমানতকে তৃতীয় পক্ষের জামানত হিসেবে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থসংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠান পিএফআই সিকিউরিটিজের নামে ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ১৩৬ কোটি টাকা ঋণ নেন এমএ খালেক। ব্রোকারেজ হাউসটি ঋণ পরিশোধ না করায় ফারইস্ট লাইফের আমানত থেকে ১৮৫ কোটি টাকা কেটে নিয়েছে ব্যাংক। একইভাবে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এমএ খালেকের প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি, পিএফআই প্রপার্টিস, মিথিলা টেক্সটাইল, মিথিলা প্রপার্টিস এবং আজাদ অটোমোবাইলসের নামে নেওয়া ২১৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েও তা পরিশোধ করেনি। কিন্তু এসব ঋণের বিপরীতে ইসলামী ব্যাংক, এসআইবিএল এবং ইউনিয়ন ব্যাংক ফারইস্ট লাইফের আমানত থেকে ২৯৩ কোটি টাকা সুদে-আসলে কেটে নিয়েছে। এভাবে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ঋণের জামানত দিয়ে সেই ঋণ খেলাপি হয়ে পড়লে ব্যাংকগুলো বীমা কোম্পানিটির আমানত থেকে অর্থ কেটে নিয়েছে। এভাবে ফারইস্টের মোট লোকসান হয়েছে ৯৭৭ কোটি টাকার বেশি।
ফারইস্ট লাইফের আর্থিক দুর্নীতির সময়ে এ প্রতিষ্ঠানে স্বতন্ত্র পরিচালক ছিলেন বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর বর্তমান চেয়ারম্যান ড. এম মোশাররফ হোসেন। তিনি এক সময় ফারইস্ট লাইফে উচ্চ পদেও কর্মরত ছিলেন। জানতে চাইলে ড. এম মোশাররফ হোসেন সমকালকে বলেন, সংস্থার অভ্যন্তরীণ তদন্তটি দুই বছর আগে হয়। তদন্তে সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। এ কারণে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। তবে উদ্যোক্তা-পরিচালক এমএ খালেক প্রায় ৩৭৪ কোটি টাকা ফেরত দেন। এ ঘটনায় কার কী পরিমাণ দায় তা নির্ধারণের জন্য নতুন করে তদন্ত চলছে।

বিষয় : ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সে অর্থ লোপাট

মন্তব্য করুন