আফগানিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বিশেষ বৈঠকে যোগ দিতে আজ শনিবার পাকিস্তান যাচ্ছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। এর আগে গতকালই ইসলামাবাদে গেছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। দীর্ঘ ৯ বছর পর বাংলাদেশ থেকে মন্ত্রী-সচিব পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল পাকিস্তান সফরে গেল।

ইসলামাবাদ যাওয়ার আগে পররাষ্ট্র সচিব সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি ১৮ ডিসেম্বর এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ১৯ ডিসেম্বর ওআইসির ওই বৈঠকে অংশ নেবেন। এ সফরে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'না, সে রকম কিছু হচ্ছে না।'

তবে সংশ্নিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, সার্বিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় শেষ মুহূর্তে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তা ছাড়া কূটনীতিতে দীর্ঘদিন টানাপোড়েন থাকা দুই পক্ষের মধ্যে মুচকি হাসির সাক্ষাৎ কিংবা কুশল বিনিময়ও একটা বড় 'কূটনীতি' হিসেবেই বিবেচিত হয়।

সূত্র জানায়, আফগানিস্তানে মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হতে থাকার বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্যই ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদ ইসলামাবাদে এই জরুরি বৈঠক ডেকেছে। বৈঠকে ওআইসির সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পরিবর্তে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অংশ নেবেন বলে চূড়ান্ত হয়।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, এর আগে পাকিস্তানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের সর্বশেষ সফর অনুষ্ঠিত হয় ২০১২ সালে। ওই বছর ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে পাকিস্তান সফর করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। এর দুই বছর আগে ২০১০ সালে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সর্বশেষ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। সে সময় ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, ঝুলে থাকা সম্পদের ভাগ-বাটোয়ারা সম্পন্ন করা এবং আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফেরত নেওয়ার প্রসঙ্গ তোলা হয়েছিল। তবে পাকিস্তান এ বিষয়গুলো নিয়ে বিব্রত বোধ করলে বৈঠকটি ফলপ্রসূ হয়নি।

এরপর বাংলাদেশে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার শুরু হলে পাকিস্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। পরে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির রায় ঘোষণা হলে পাকিস্তানের একাধিক রাজনৈতিক দল সেখানে সমাবেশ করে বাংলাদেশ বিদ্বেষী বক্তব্য দেয়। একাত্তরে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর গণহত্যার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হলে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে এর বিরুদ্ধে সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় 'এ ফাঁসির রায় কার্যকরে গভীরভাবে মর্মাহত' বলে বিবৃতি দেয়।

চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে এ ধরনের কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণের পর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি হয়। এ কারণে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ-পাকিস্তান পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক বাতিল হয়ে যায়। এরপর পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আর কোনো কূটনৈতিক যোগাযোগ কার্যত বাংলাদেশের ছিল না।

তবে ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৯ ও ২০২০ সালে দু'দফা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করেন। এ ছাড়া চলতি বছরের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিলেন তিনি।

এদিকে, এই সফর নিয়ে কূটনৈতিক মহলে বেশ গুঞ্জন শুরু হয়েছে। সংশ্নিষ্ট একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ওআইসির সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে এই সংস্থার যে কোনো পর্যায়ে বৈঠকে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার বিষয়টি একটি রুটিন দায়িত্ব। ওআইসি বৈঠকের স্থান হিসেবে ইসলামাবাদকে নির্ধারণ করেছে। সে কারণে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলেরও সেখানে যাওয়ার বিকল্প নেই। আফগানিস্তানে মানবিক সংকটের মতো একটি স্পর্শকাতর ইস্যুতে যোগ না দিলে বরং সেটা ওআইসিতে বাংলাদেশকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলত। অতএব, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র সচিবের এই পাকিস্তান সফর দ্বিপক্ষীয় সফর নয় এবং সেভাবে গুরুত্ব দেওয়ারও কিছু নেই।

অন্য একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ওআইসির জরুরি বৈঠকের স্থান হিসেবে ইসলামাবাদকে বেছে নেওয়া। কারণ, বিগত বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার বৈঠকের স্থান হিসেবে পাকিস্তানের কোনো শহরকে বেছে নেওয়া হয়নি। এমনকি ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও অনেক দেশ পাকিস্তান সফর বাতিল করেছে নিরাপত্তার জন্য। ওআইসির অন্য কোনো বৈঠকের জন্যও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানকে বেছে নেওয়া হয়নি।

তাহলে এবার নেওয়া হলো কেন? এই সূত্রের মতে, এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, গত তিন-চার বছরে ওআইসির অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের উন্নয়ন। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তান ইস্যুতে চীন অনেকটা একচ্ছত্র প্রভাব নিয়ে যুক্ত হয় এবং ওআইসির সঙ্গে চীনের সম্পর্কের আরও উন্নতি ঘটে।

তা ছাড়া উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতিতে চীন বহু আগে থেকেই পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ। এ অবস্থায় পাকিস্তানকে ওআইসির বৈঠকের জন্য স্থান হিসেবে বেছে নেওয়ার নেপথ্যে চীনের ভূমিকা থাকতেই পারে। এ ক্ষেত্রে চীনের লক্ষ্যও হতে পারে বাংলাদেশ। কারণ, ওআইসির মতো সংস্থার বৈঠকে বাংলাদেশ যোগ দেবে এবং এর ফলে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের বরফ গলানো শুরু করার একটা সুযোগও পেতে পারে চীন।

বিষয় : বাংলাদেশের মন্ত্রী-সচিব ওআইসির জরুরি বৈঠক কূটনৈতিক বৈঠক

মন্তব্য করুন