কোনো সূত্র থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায়নি, পর্যবেক্ষকরাও আস্থা পান না যে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে সমালোচিত তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধ বন্ধ হয়েছে এবং আর হবে না। তবে একটি বিশেষ ঘটনার পর থেকে গত ১৪ দিন একেবারে সুনসান, একটিও 'বন্দুকযুদ্ধ' নয়, একজনও সন্দেহভাজন অপরাধী বিনাবিচারে গুলি খেয়ে মরেনি।
অথচ গত ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও পররাষ্ট্র বিভাগ 'গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে' বাংলাদেশের র‌্যাব (র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) এবং এই সংস্থাসহ পুলিশের বর্তমান ও সাবেক ৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগের ৯ দিনের মধ্যে ৫ দিন ঘটেছে 'বন্দুকযুদ্ধ'। মারা গেছে ৯ জন। অর্থাৎ গড়ে দিনে একজন করে।
২০০৪ সাল থেকে নিয়মিত ঘটে আসা এ ধরনের ঘটনাগুলোকে 'ক্রসফায়ার', 'এনকাউন্টার' ও 'বন্দুকযুদ্ধ' নামে অভিহিত করা হয়েছে। পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সাধারণত বলা হয়, অপরাধ মামলার এক বা একাধিক আসামি ধরা পড়ার পর তাকে নিয়ে পুলিশ তদন্তে গেলে বা অন্য আসামি ধরতে গেলে দু'পক্ষে গোলাগুলি হওয়ায় আসামির মৃত্যু হয়েছে। প্রায় সব ঘটনা গভীর বা শেষ রাতে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ হিসেবে 'রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিপীড়ন' ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের উল্লেখ করা হয়েছে যা তাদের পর্যবেক্ষণে ২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযানে বিশেষভাবে বেড়েছে এবং তখন এই কর্মকর্তারা দায়িত্বে ছিলেন।
চলতি ডিসেম্বর মাসের ১ থেকে ৯ পর্যন্ত 'বন্দুকযুদ্ধ' ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ৩০ নভেম্বর গভীর রাতে কুমিল্লায় কাউন্সিলর হত্যাকাণ্ডের এজাহারভুক্ত দুই আসামির মৃত্যু। পরের দিন ১ ডিসেম্বর একই হত্যা মামলার প্রধান আসামির মৃত্যু হয়। ৪ ডিসেম্বর ভোলার চর কুকরিমুকরিতে দু'জন নিহত হয়, যাদের র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে জলদস্যু। ৬ ডিসেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ায় দু'জন নিহত হয়, দায়ের মামলা অনুযায়ী তারা ডাকাত দলের সদস্য। এরপর ৯ ডিসেম্বর বরগুনার পাথরঘাটায় দু'জন নিহত হয়।
এভাবে ৯ দিনে ৯ জনের মৃত্যুর পর ১০ থেকে গতকাল ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত পক্ষকাল 'বন্দুকযুদ্ধহীন' থাকা ছাড়াও সাম্প্রতিককালে আরও অন্তত পাঁচ মাস এরূপ বিরতি ছিল। গত বছরের জুলাইয়ে কক্সবাজারে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান পুলিশের চেকপোস্টে গুলিতে নিহত হন। সেই মৃত্যুকে বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু আখ্যা দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা চলে। এই মামলাটি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। সংবাদমাধ্যমে প্রবাশিত খবর অনুযায়ী যেখানে সিনহা হত্যাকাণ্ডের আগের ছয় মাসে অন্তত ১৭১ জন 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত হয় সেখানে পরবর্তী ৫ মাসে মাত্র ৫টি 'বন্দুকযুদ্ধ' হয়েছে।
র‌্যাব ও সাত কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা 'বন্দুকযুদ্ধ' বন্ধ হওয়ার কারণ অথবা আপাতত বন্ধ কিনা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা এ বিষয়ে কিছুই বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, 'আমরা বরাবরই বলছি পরিস্থিতির ওপরে নির্ভর করে ক্রসফায়ারের বাড়া-কমা বা বন্ধ হওয়া। জনগণের প্রতিক্রিয়া বা কোনো শক্ত মহলের চাপ। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পরে দেখছি ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটছে না। তবে এটি নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই যে, এর মধ্য দিয়ে ক্রসফায়ারের বিলুপ্তি ঘটেছে।'
তিনি মেজর সিনহা হত্যার পর কিছুদিন বন্ধ থাকা ও আবার শুরু হওয়ার দৃষ্টান্ত স্মরণ করে বলেন, 'এই যে কখনও কখনও ক্ষোভে-চাপে বন্ধ হচ্ছে, এটা থেকে স্পষ্ট যে, ক্রসফায়ারটি বাস্তবতা বা এটি ঘটছে এমন নয়, এটি ইচ্ছাকৃত।'
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক সময়ের তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ও গুলিবিনিময়ে নিহত হয় অন্তত ৩৬১ জন। ২০২০ সালে ১৮৮ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৪৩ জন।
সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মার্কিন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এনজিওগুলোর তথ্য তুলে ধরে দাবি করা হয়, র‌্যাব এবং অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ২০০৯ সাল থেকে প্রায় ৬০০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকা এবং ৬০০-এরও বেশি লোকের গুম ও নির্যাতনের জন্য দায়ী।
ওই নিষেধাজ্ঞার পর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, 'আমাদের সিস্টেমে কেউ ইচ্ছা করে ক্রসফায়ার বা ইচ্ছা করে গুলি করতে পারে না। ক্রসফায়ারের পেছনে যথাযথ কারণ আছে। এই সমস্ত ঘটনা শুধু বাংলাদেশে না, পৃথিবীর সব দেশে এগুলো চলছে এবং চালু আছে।'
তিনি বলেন, 'আমাদের সিস্টেম কিন্তু অনেক সুন্দর সিস্টেম। আমাদের এখানে কেউ ইচ্ছা করলেই ক্রসফায়ার বা গুলি করতে পারে না। কারণ প্রত্যেকটা ঘটনার জুডিশিয়াল তদন্ত হয়।'
মার্কিন প্রতিবেদনে ২০১৮ সালের ২৬ মে মাদকবিরোধী অভিযানকালে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হকের মৃত্যুর উল্লেখ করা হয়েছে।
একরামুলের মোবাইল ফোনের শব্দ ও তার পরিবারের সদস্যদের আর্তনাদ ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়ায় দেশে বিশেষ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। গতকাল একরামুল হকের স্ত্রী আয়েশা বেগমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সাড়ে তিন বছরে তিনি তার স্বামীর হত্যার বিচার পাননি। তাকে মামলা দায়ের করতে বিরত করা হয়েছিল জানিয়ে বলেন, 'তখন তো কোনোকিছু না করার জন্য মন্ত্রীরা নিষেধ করেছিলেন। সুষ্ঠু বিচার, সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দিয়েছিলেন সবাই। কিছুই পাইনি।'