প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইবরাহিম মোহাম্মদ সলিহর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সংযোগের উন্নয়নে ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করেছেন।
মালেতে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে দ্বিপক্ষীয় সংলাপ, মালদ্বীপ সরকারের কাছে ১৩টি সামরিক যান হস্তান্তর এবং বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর প্রত্যক্ষ করার পর সলিহর সঙ্গে যৌথ ব্রিফিংকালে তিনি বলেন, 'আমি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সংযোগ উন্নয়নের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট সলিহর সঙ্গে বিশদ আলোচনা করেছি।' প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংলাপের সময় তারা দুই দেশের মধ্যে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, যুব ও ক্রীড়া, মৎস্য ও কৃষি খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন।
দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকালে শেখ হাসিনা দুই দেশের মধ্যে একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) এবং পারস্পরিক বিনিয়োগ সুবিধার জন্য একটি দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর পুনরায় জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে এখনও পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি।'
আলোচনার ফলাফল সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আমি এ কথা জানাতে পেরে আনন্দিত যে, আমরা আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সামগ্রিক বিষয়ে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা করেছি। আমরা আমাদের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তগুলোতে এ পর্যন্ত অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছি এবং ফলাফল সন্তোষজনক পেয়েছি।'
তিনি বলেন, তারা বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতা, একে অপরের প্রার্থীদের সমর্থন এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী দু'দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার করতে গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।
তিনি বলেন, এটা অত্যন্ত সন্তুষ্টির বিষয় যে, বাংলাদেশ থেকে স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের নিয়োগের জন্য মালদ্বীপের প্রস্তাব বাংলাদেশ গ্রহণ করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি যোগ করেন, 'আমরা মালদ্বীপের ছাত্রদের জন্য বিশেষায়িত স্নাতকোত্তর মেডিকেল কোর্সের সুযোগ তৈরি করব।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলার ফ্লাইট শুরুর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে সংযোগ জোরদারে সম্মত হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিমান ভারতের চেন্নাই হয়ে মালদ্বীপের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ চালু করতে যাচ্ছে। দুই দেশ সরাসরি শিপিং লাইন স্থাপনের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা অনথিভুক্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়মিতকরণের বিষয়েও আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, বর্তমান করোনাভাইরাস মহামারি পরিস্থিতি উন্নতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার মালদ্বীপের নাগরিকদের জন্য আগমনের পর ভিসা ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর আগে সার্ক সম্মেলনে যোগ দিতে এলেও মালদ্বীপে এটি তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সাল বাংলাদেশ-মালদ্বীপ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য একটি যুগান্তকারী বছর।
যৌথ ব্রিফিংকালে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইবরাহিম মোহাম্মদ সলিহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগে আমাদের যোগাযোগ জোরদারের বিষয়টি তুলে ধরেছি। আলোচনায় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তিন চুক্তি সই :বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আজ দুই দেশের মধ্যে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দ্বৈত কর পরিহার, যুব ও ক্রীড়াক্ষেত্রে তিনটি চুক্তি স্বাক্ষরিত এবং একটি চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রেসিডেন্ট ইবরাহিম সলিহর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শেষে উভয় নেতার উপস্থিতিতে গতকাল সকালে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও মালদ্বীপের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আহমেদ নাসিম দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ওপর সমঝোতা স্মারকে সই করেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এবং মালদ্বীপের যুব, ক্রীড়া ও কমিউনিটি ক্ষমতায়নমন্ত্রী আহমেদ মাহলুফ বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে যুব ও ক্রীড়া উন্নয়নে সহযোগিতার ওপর নিজ নিজ দেশের পক্ষে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম এবং কমিশনার-জেনারেল অব ট্যাক্সেশন অব মালদ্বীপ ইনল্যান্ড রেভিনিউ অথরিটি (এমআইআরএ) ফাতুহুল্লাহ জামিল মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বৈত কর বাতিল এবং কর এড়ানো রোধে নিজ নিজ দেশের পক্ষে একটি চুক্তিতে সই করেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যসেবা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রের ওপর নিজ নিজ দেশের পক্ষে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও মালদ্বীপের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আহমেদ নাসিম নবায়নকৃত সমঝোতা স্মারকে সই করেন।
অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে মালদ্বীপকে ১৩টি সামরিক যান উপহার দিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পক্ষে চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ মালদ্বীপের চিফ অব ডিফেন্স ফোর্স মেজর জেনারেল আবদুল্লাহ শামালের কাছে সামরিক নৌযানের প্রতীকী চাবি হস্তান্তর করেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী মালেতে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে পৌঁছালে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেন। এ সময় শেখ হাসিনাকে গার্ড অব অনার প্রদান ও গান স্যালুট দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হয়। শেখ হাসিনা প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে রক্ষিত দর্শনার্থী বইয়ে স্বাক্ষর করেন এবং সেখানে ফটোসেশনে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী বুধবার ছয় দিনের দ্বিপক্ষীয় সফরে মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে পৌঁছান।
রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশগ্রহণ :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল কুরুম্বা দ্বীপে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডির দেওয়া রাষ্ট্রীয় ভোজে অংশ নেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং যোগাযোগ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অবশ্যই জোরদার করতে হবে।


বিষয় : শেখ হাসিনা-ইবরাহিম সলিহ ফলপ্রসূ আলোচনা

মন্তব্য করুন