একটি নৌকার অর্ধেক বালুতে ডোবানো। নৌকার বুকে বিঁধে আছে দুটি গজাল। গজালের পাশ দিয়েই লাল রক্ত (প্রতীকী) বের হচ্ছে। অর্ধেক বালুতে ডোবানো নৌকার পাশেই ইট-সিমেন্টের দেয়াল, যা দিয়ে বোঝানো হয়েছে নদীকে মেরে শিল্পায়নের চেষ্টা। নদী মরে যাওয়ার এমন প্রতীকের সামনে কাঠের তৈরি একটি দোতলা ঘর। সেই ঘরে দোতলায় দাঁড়িয়ে অবলোকন করা যায় আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের ৮৭টি নদনদীর পানি। স্বচ্ছ কাচের জারে সংরক্ষণ করা হয়েছে এ পানি। হারিয়ে যাওয়া নদী ও পানিকেন্দ্রিক ইতিহাসের সন্ধানও মিলবে এখানে। পাওয়া যাবে বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। আছে গ্রামীণ বাংলার মানুষের জীবিকা অর্জনের নানা উপকরণ। দেখা যাবে মাছ শিকারের ঝাঁকি জাল, খুচনি জাল, নৌকা, চাঁই, পলো, কাঁকড়া শিকারের চাঁই ও তাঁত বোনার মেশিন। কৃষিজমির উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণের জন্য মাটির তৈরি মাইড, বাঁশের তৈরি ডোলা, মুড়ি ভাজার তলছা ও ঝাঁজর, মাটির তৈরি খাদ্য রান্নার হাঁড়ি-পাতিল, খাবারের থালা ও বাসন, পিতলের তৈরি থালা, বাটি, বদনা, মগসহ নানা উপকরণ। দেয়ালে শোভা পেয়েছে দেশীয় খাল, নদনদীর ছবি, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, জেলে এবং কুমার, তাঁতিসহ সর্বস্তরের মানুষের জীবন ধারণ ও জীবিকা অর্জনের নানা দৃশ্য। মাটি দিয়ে কলাপাড়া উপজেলার একটি মানচিত্র তৈরি করে তা দেখানো হয়েছে। নদনদীবিষয়ক জার্নাল, গবেষণাধর্মী বইয়েরও একটি কর্নার রয়েছে এ ঘরে। এ যেন নদী হত্যা ও নদীপাড়ের শুকিয়ে যাওয়া মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া-কুয়াকাটা মহাসড়কের পাশে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পাখিমারা বাজারের কাছে অভিনব এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। নদনদী ও পানিসম্পদ রক্ষায় নীতিনির্ধারকদের আরও উদ্যোগী করে তোলা এবং জনসচেতনতা বাড়াতে ২০১৪ সালে চালু হয় এশিয়া মহাদেশের একমাত্র 'পানি জাদুঘর'। এরপর যতই সময় গড়িয়েছে, ততই এ জাদুঘরে দেশি-বিদেশি পর্যটকের ব্যাপ্তি বেড়েছে। শৈশব-কৈশোরের প্রিয় নদীর একটুখানি ছোঁয়া পেতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসছেন। প্রথম দিকে তেমন আগ্রহ না থাকলেও এখন দৈনিক দেড় শতাধিক মানুষ ছুটে আসেন ব্যতিক্রমী এ জাদুঘর দেখতে।

পানি জাদুঘরের তদারকির দায়িত্বে থাকা জয়নাল আবেদীন সমকালকে বলেন, এ জাদুঘর স্থাপনের পর পর্যটকের আগমন বাড়ছে। আগত পর্যটকদের নদনদী সৃষ্টির ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান অবস্থা বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়। এতে পর্যটকদের ভেতর নদী বিষয়ে সচেতনা সৃষ্টি হচ্ছে।

১৮ শতাংশ জমিতে একশনএইড বাংলাদেশের সহায়তায় গড়ে উঠেছে পানি জাদুঘর। স্থপতি রাজন দাস এই জাদুঘরের স্থাপত্য নকশা তৈরি করেছেন। তার সঙ্গে স্থপতি অমিতাভ মঙ্গল জাদুঘরের নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেন। ভবিষ্যতে পানি জাদুঘর যাতে পুরোপুরি একটি গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, সেজন্য বড় পরিসরে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা এবং মিলনায়তন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।

গত ২৪ নভেম্বর সকালে দেখা গেল ঢাকার বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী আনশা পানি জাদুঘর ঘুরে দেখছে। এসএসসি পরীক্ষা শেষ করেই বাবার হাত ধরে পটুয়াখালীতে বেড়াতে এসে তার চোখে পড়ে পানি জাদুঘর। তার কৌতূহল জাদুঘরের বিভিন্ন সামগ্রীর দিকে। সমকালকে আনশা বলে, আমার গ্রামে আসা হয় না। নদীও দেখা হয় না। আমি জানতাম না বাংলাদেশে একটি পানি জাদুঘর আছে। এখানে এসে দেখলাম, যে নদীগুলোর নাম কখনও শুনিনি, সেসব নদীর পানি, পরিচয়সহ সব আছে। নদীবিষয়ক সবকিছু এখানে জানা যায়।

জাদুঘর ঘুরে দেখা কানাডা প্রবাসী বাহাউদ্দিন সমকালকে বলেন, বরিশাল থেকে কুয়াকাটা যাওয়ার পথে জানতে পারলাম এখানে একটি পানি জাদুঘর আছে। সবকিছু দেখে মনে হয়েছে, এটা সৃজনশীল চিন্তার ফসল। নদীনালা নিয়েই তো আমাদের বাংলাদেশ, অনেক নদী থাকলেও তা এখন মৃতপ্রায়। এখানে এসে বিলুপ্তপ্রায় নদীগুলোর পানি দেখতে পেরেছি। তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি অনন্য সৃষ্টি। এই জাদুঘরটি নদী ও পানিসম্পদ রক্ষায় আমাদের চিন্তাকে একদিকে যেমনি প্রসারিত করবে, অন্যদিকে তেমনি পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সরকারকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখবে।

জাদুঘরে আন্তঃদেশীয় নদীর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা রয়েছে। এই নদীগুলো দেশের কোন কোন জেলায় প্রবাহিত, তারও উল্লেখ আছে তালিকায়। রায়মঙ্গল, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, শীতলক্ষ্যা, ইছামতী, মাথাভাঙ্গা, আত্রাই, পুনর্ভবা, করতোয়া, টাঙ্গন, নাগর, ডাহুক, তিস্তা, ধরলা, জিমজিরাম, ভোগাই, যাদুকাটা, নোয়াগাঙ, পিয়াইন, সুরমা, কুশিয়ারা, খোয়াই, সোনাই, লংলা, সালদা, ডাকাতিয়া, সিলোনিয়া, কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, নাফ নদী, নেপালের নারায়ণী ও মহাকালী নদীসহ ৮৭টি নদীর পানির নমুনা রাখা হয়েছে কাচের বোতলে। সেগুলোতে নদীর নাম এবং পানির নমুনা যিনি সংগ্রহ করেছেন, সে তথ্য তারিখসহ লেখা রয়েছে।

একশনএইডের ল্যান্ড অ্যান্ড ওয়াটার রাইটস ব্যবস্থাপক শমশের আলী সমকালকে বলেন, আমাদের দেশের অনেক মানুষের বসবাস নদীকে কেন্দ্র করে। অথচ যারা উন্নয়ন কাজের সঙ্গে জড়িত, তারা উন্নয়ন বলতে বোঝেন রাস্তাঘাট, সেতু, অট্টালিকা, শিল্পকারখানা ইত্যাদি। পানির গুরুত্ব বিবেচনা করে নদীকে প্রাধান্য দিয়ে যেন সব ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে আমরা সে কথাই বলতে চাই।

পানি জাদুঘর সোমবার থেকে শনিবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রবেশমূল্য শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা, পটুয়াখালী জেলার বাসিন্দাদের জন্য ২০ টাকা এবং অন্য এলাকার বাসিন্দাদের জন্য ১০০ টাকা।