ঢাকা সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

উন্নয়ন, সুবিচার ও স্বাধীনতা চলতে দিতে হবে একসঙ্গে

উন্নয়ন, সুবিচার ও স্বাধীনতা চলতে দিতে হবে একসঙ্গে

.

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০১:৩৭ | আপডেট: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১২:১৫

উন্নয়নের সঙ্গে সুবিচার ও স্বাধীনতাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই; বরং সুবিচার ও স্বাধীনতায় গুরুত্ব দেওয়া হলে উন্নয়নের গতি বাড়ার পাশাপাশি তা টেকসই হয়। জনকল্যাণের জন্য এগুলো একে অন্যের পরিপূরক। তিনটিই একসঙ্গে সমানতালে চলতে হবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে এমন অভিমত উঠে আসে। উন্নয়নের ওপর বিআইডিএসের এবারের সম্মেলনের বিষয় ‘উন্নয়ন, সুবিচার ও স্বাধীনতা’।

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল বৃহস্পতিবার তিন দিনের এ সম্মেলন শুরু হয়েছে। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাজ্যের আলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এস আর ওসমানী। স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন। 

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক এস আর ওসমানী বলেন, সামাজিক সুবিচার ও স্বাধীনতা– দুটোই উন্নয়নে অবদান রাখে। আগে উন্নয়ন করে পরে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। শুধু সড়ক কিংবা সেতু নির্মাণ করলে হবে না; সামাজিক সুবিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ অন্যান্য স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে সুবিচার উন্নয়নের পথ সহজ করে; অন্যদিকে সুবিচারের অভাব কিংবা সুশাসনের ঘাটতি উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। উন্নয়ন, সুবিচার ও স্বাধীনতা একসঙ্গে চলতে হবে। তবে অগ্রাধিকার দিতে হবে সুবিচার ও স্বাধীনতায়। 

গণতন্ত্র প্রসঙ্গে ড. ওসমানী বলেন, গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট গ্রহণ নয়। গণতন্ত্র মানে এই নয় যে, আপনি রাতের পরিবর্তে দিনের ভোট দিনে দিতে পারলেন। মানুষের ভালো-মন্দ নিয়ে পাবলিক ফোরামে আলোচনাও গণতন্ত্র। উন্নয়নের সুফল পেতে সব ক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক সুবিচার প্রয়োজন। স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের অভাব থাকলে উন্নয়নের সব পর্যায়ে বৈষম্য তৈরি হয়।
 এমনকি ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্য দেখা দেয়। দরিদ্ররা পর্যাপ্ত তহবিল পায় না। ব্যাংকগুলো চিন্তা করে দরিদ্র ঋণগ্রহীতারা বিরক্ত করছে। এ অবস্থা চরম হলে মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্তের মতো সামাজিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে। 

উন্নয়ন, না গণতন্ত্র– এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একতরফা উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করে তাদের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক সরকারই এই উন্নয়ন নীতির বিপরীতে কাজ করে থাকে। তাঁর মতে, সরকার যদি সুবিচার ও স্বাধীনতার প্রতি যত্ন নেয়, তাহলে জনগণ উন্নয়নের প্রতি যত্ন নেবে। 

প্রবন্ধ উপস্থাপন শেষে অন্যান্য আলোচক ও দর্শকের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের কাজ সুবিচার ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা; উন্নয়ন করবে বেসরকারি খাত। 
ড. ওসমানীর উপস্থাপনায় বলা হয়, কেউ হয়তো বলতে পারেন, আগে উন্নয়নকে প্রাধান্য দিতে হবে তার পর সুবিচার ও স্বাধীনতায় নজর দিতে হবে। কিন্তু এখানে কোনোটিই পরে করার বিষয় নয়। পরে করতে গেলে তার অর্থনৈতিক পরিণতি সুখকর হবে না। অবিচার অর্থনীতির জন্য খারাপ পরিণতি ডেকে আনে। সম্পদের অসম বণ্টন অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। সমাজের বৃহত্তর অংশ যদি ন্যায্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর তার প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি মা শিক্ষা না পায়; স্বাস্থ্য রক্ষা করতে না পারে, তাহলে শিশুর ওপর তার প্রভাব পড়ে। এভাবে চক্রাকারে যুগের পর যুগ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। শ্রমিকরা যদি তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে শুধু তাদের ক্ষতি হয় না, মালিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। কেননা, শ্রমিকরা যথাযথ সুযোগ-সুবিধা না পেলে উৎপাদনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়। যার প্রভাব মালিকের ওপরেই বেশি পড়ে। 

ড. এস আর ওসমানীর প্রবন্ধ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, গণতন্ত্র, সুশাসন ও স্বাধীনতা– এগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে সাধারণ মানুষ চায় বিদ্যুৎ, কালভার্ট। জনগণ চায় হাতের কাছে ক্লিনিক, যাতে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় সব ওষুধ সে পায়। বিদ্যুৎ কেন মাঝেমধ্যে চলে যায়, সে বিষয়ে তাদের মাথাব্যথা। সুতরাং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতাই গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। 
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, জীবন যদি একটি পণ্য হয়, সেখানে স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার উপজাত পণ্য এবং এগুলো মৌলিক জিনিস নয়। আমরা মানুষের জন্য একটি ভালো জীবন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। আমাদের পিরামিডের নিচে থাকা লোকদের জন্য আরও বেশি কাজ করতে হবে। তিনি আশা করেন, অর্থনীতিবিদরা সরকারের ধারাবাহিকতা ও উন্নয়নে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রভাব নিয়েও আলোচনা করবেন। তিনি প্রশ্ন করেন– বিদেশে বাংলাদেশিদের শ্রমের স্বাধীনতা নিয়ে সুশীলরা কেন কোনো প্রশ্ন করেন না। 

এম এ মান্নান আরও বলেন, কেউ কেউ বলে থাকেন, এক সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে স্বৈরাচারে পরিণত হতে পারে এবং স্বৈরাচার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। তাহলে এত উন্নয়ন কীভাবে হচ্ছে? মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিলেন এবং তিনি দেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে যান। সিঙ্গাপুরেও একই ঘটনা ঘটেছে। তিনি মনে করেন, ন্যায্যতা এবং শ্রেণি-বিভাজন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে প্রান্তিক পর্যায়ে বৈষম্য কিছুটা কমেছে। নিম্ন আয়, ভূমিহীন, নারী ও শিশুর উন্নয়নে সরকারের মনোযোগ বেশি। 

আলোচনায় ড. মসিউর রহমান বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সুবিচারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুবিচার প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রেরই বিষয়। উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সরকারেরই কাজ। উন্নয়নের বাকি বিষয়গুলো সরকার ও বেসরকারি খাত দুই পক্ষেরই কাজ। তাঁর মতে, ন্যায়বিচারের ব্যাখ্যা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। সমাজে এ বিষয়ে ঐকমত্য বা সমঝোতা থাকতে হয়। ন্যায়বিচারের জন্য প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। 

ড. বিনায়ক সেন বলেন, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর দর্শন অনুসরণ করতে হবে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থে বলেছেন, গণতন্ত্র না থাকলে মানুষের মন পাথরের মতো শুষ্ক হয়ে যায়। বিনায়ক সেন  বলেন, উন্নয়ন, নাকি গণতন্ত্র– সেই অগ্রাধিকার আগে নির্ধারণ করতে হবে। এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়। 

 

আরও পড়ুন

×