ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪

বীরনিবাস পেয়েও অনেক মুক্তিযোদ্ধার কপালে চিন্তার ভাঁজ

বীরনিবাস পেয়েও অনেক  মুক্তিযোদ্ধার কপালে  চিন্তার ভাঁজ

ছবি- সমকাল

 আবু সালেহ রনি

প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:৫৮ | আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১৫:৪৩

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমের গ্রাম কুমারী। গ্রামের গাঙপাড়ায় গেলেই পাকা রাস্তার ধারে নজরে পড়ে লাল-সবুজে রাঙানো দেয়াল। এটি যেন বাংলাদেশের পতাকারই প্রতিচ্ছবি। বাড়ির সামনে পাথরের নামফলকে খোদাই করে লেখা ‘বীরনিবাস’।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে নির্মিত এই বাড়ি গত জুনে বরাদ্দ পান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইউছুফ আলী। বাড়ি পেয়ে খুশি ছিলেন তিনি। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই সেই বাড়ি তাঁর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভবনের তিনটি কক্ষ, রান্নাঘর ও শৌচাগারের দেয়াল ও ছাদে দেখা দিয়েছে ছোট-বড় সাত-আটটি ফাটল। দেয়ালের অনেক জায়গায় খসে গেছে পলেস্তারা। শৌচাগারসহ ভবনে ব্যবহার্য নিম্নমানের নানা উপকরণও নষ্ট হচ্ছে।

বীরনিবাস বরাদ্দ পেয়ে শুধু ইউছুফ আলী নন, তাঁর বাড়ি থেকে ১০০ মিটার দূরে মুক্তিযোদ্ধা ফরজ উদ্দীনও এমন ভোগান্তিতে। মুক্তিযোদ্ধা ইছহাক আলী মালিথা সমকালকে বলেন, ‘তাঁর বাড়ির ছাদ উঁচু-নিচু। বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে ঘরে পানি জমে। মেঝের বিভিন্ন জায়গার মাটি সরে গিয়ে টাইলস ভাঙার পরিস্থিতি হচ্ছে। রান্নাঘরের কাজ বাকি।’ অবসরপ্রাপ্ত ল্যান্স নায়েক মুক্তিযোদ্ধা ইউছুফ আলী বলেন, ‘বৃষ্টি হলে ঘরে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। সামনের বর্ষায় কি হবে– তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

সমকালের অনুসন্ধানে দেখা যায়, হাজারো মুক্তিযোদ্ধা বাড়ি পেয়ে নানা ভোগান্তিতে আছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ পেয়ে গত তিন মাসে ২৫টি উপজেলায় গিয়ে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া হয়। বীরনিবাস প্রকল্পের বাড়িগুলো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে বরাদ্দ ও নির্মিত হয়েছে। প্রতিটি বাড়ি নির্মাণে বরাদ্দ ১৪ লাখ ১০ হাজার ৩৮২ টাকা। এই বাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের জমিতেই নির্মাণ করা হয়েছে। যাদের জমি নেই তাদের ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন থেকে খাস জমিতে বাড়ি নির্মাণ করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। চার ডেসিমাল জমিতে ৭৩২ বর্গফুট আয়তনের একতলাবিশিষ্ট বাড়িতে দুটি থাকার কক্ষ, একটি ড্রইং ও একটি ডাইনিং, দুটি শৌচাগার এবং একটি বারান্দা রয়েছে। এ ছাড়া একটি উঠান, একটি নলকূপ, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি পালনের জন্য পৃথক শেড আছে।

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলা কুমারী গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফরজ উদ্দিনের বাড়ি, দেখতে চকচক করলেও ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলা কুমারী গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফরজ উদ্দিনের বাড়ি, দেখতে চকচক করলেও ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে

উপজেলা প্রশাসন এসব ঘর নির্মাণে ঠিকাদার নিয়োগের পর অনেকেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারেননি। ঠিকাদারদের অনেকে সাব-কন্ট্রাক্টে অন্য কাউকে দিয়ে ঘর নির্মাণ কাজ করিয়েছেন। তাই অনেক উপজেলায় বীরনিবাস নির্মাণ মানসম্পন্ন হয়নি। নিম্নমানের ইট এবং কম সিমেন্ট ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট। প্রয়োজনীয় গভীরতায় পাইপ না বসানোয় নলকূপে পানি উঠছে না। ঘরের দরজার কাঠ ফেটে প্রায় দুই খণ্ড। অনেক ভবনে নিম্নমানের কাঠ ব্যবহার করায় জানালা খুলে গেছে। ভবন নির্মাণের আগে মাটি পরীক্ষা না করা, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, নতুন মাটি ফেলে ভিত উঁচু করে তার ওপর ভবন করা, ত্রুটিপূর্ণ ডিজাইন ও চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করায় ভবনগুলোতে নানা সমস্যা লেগেই রয়েছে। 

বীরনিবাস বরাদ্দ পেয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত স্বরূপকাঠি উপজেলার সুটিয়াকাঠি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফকরুল আমীন কালুও। তাঁর স্ত্রী আসমা বেগম সমকালকে বলেন, ‘পলেস্তারা ঝরছে। বাথরুমের ট্যাঙ্কসহ মালপত্র যা দিয়েছে সব দুই নম্বর। ছাদে নোনা ধরে স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে। বৃষ্টির সময় পানি চুইয়ে ঘরে পড়ে।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বামী অসুস্থ। বিছানায়ই থাকে। সে-ই যদি কষ্ট পায়, তাহলে বিল্ডিং দিয়ে কী হবে? ইউএনওরে খবর দিয়ে তিনবার আনছি। চেয়ার‍্যমান, মেম্বার সবাই আইছে। কেউ সমস্যার সমাধান করতে পারে নাই।’

যশোরের কেশবপুরে বরাদ্দ দেওয়া আটটি এবং নির্মাণাধীন চারটি বীরনিবাসে গিয়ে দেখা যায়, ছয়টির পলেস্তারা খসে পড়েছে। প্রতিটি বাড়িতেই নানা সমস্যা। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল লতিফ বলেন, ‘তিনটি কক্ষে প্লাস্টার খসে যাচ্ছে। কয়েক মাসের মধ্যে একবার রং করা হয়েছে। কিন্তু ইট, সিমেন্ট, বালু ভালো না হওয়ায় নোনা ধরে আবারও খসে যাচ্ছে। একটি দেয়ালে ফাটল ধরেছে। জানালার গ্রিলগুলো খুব পাতলা।’ সাগরদাঁড়ী ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা নিমাই দেবনাথ বলেন, ‘পানির ট্যাঙ্ক ভালো হয়নি। পানিও ঠিকমতো ওঠে না। বাথরুমে দুটি দরজা লাগানো হয়নি। প্লাস্টার খসে যাচ্ছে। ঠিকাদার পলাতক।’

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা কার্যালয়ের পেছনে একসঙ্গে তিনজন মুক্তিযোদ্ধার বীরনিবাস নির্মাণ শুরু হওয়ার পর ৯ মাস ধরে কাজ বন্ধ। মুক্তিযোদ্ধা মো. সুজায়েতুল্লাহ বলেন, ‘অনেক কাজ বাকি। জিনিসপত্র ভালো দেয় নাই। ঠিকাদারকে ফোন দিলে বলে, বিল পায় নাই। বিল পাইলে বাকি কাজ শুরু করবে।’ উপজেলায় আরও ছয়টি বীরনিবাস নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।

নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় ১২টি বীরনিবাস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বাড়িতেই সমস্যা আছে। কৈমারী ইউনিয়নের আলসিয়া পাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহিম বলেন, ‘ঠিকাদার নিম্নমানের ইট, সিমেন্ট, রড ব্যবহার করেছে। বারবার নিষেধ করলেও কথা শোনেনি। টিউবওয়েলে আয়রনযুক্ত পানি ওঠে। বাথরুমের ট্যাঙ্ক ছোট করেছে, ময়লা উঠে আশাপাশে ছড়িয়ে যায়। বিদ্যুতের বোর্ড ও সুইচগুলো ভালো দেয়নি।’ একই ইউনিয়নের মৌজা শৌলমারী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা রঙ্গলাল মহন্ত সমকালকে বলেন, ‘ঠিকাদার সব মালপত্র খুব নিম্নমানের দিয়েছে। তিন মাসের মধ্যে দরজাগুলো নষ্ট হতে বসেছে।’

লক্ষীপুর সদরে নিন্মমানের উপকরণ দিয়ে নির্মিতব্য বীর নিবাসের কাজও বন্ধ ৯ মাস ধরে

বীরনিবাস নির্মাণকাজে কিছু অনিয়ম-দুর্নীতি থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তিনি সমকালকে বলেন, ‘ইতোমধ্যে বিভিন্ন অভিযোগে সাত প্রকৌশলীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। যেসব অভিযোগ মন্ত্রণালয়ের নজরে আসছে, সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন বীরনিবাস নির্মাণ ও বরাদ্দের বিষয়টি সমন্বয় করছে। তাই দায়িত্ব তাদেরই বেশি।’

মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২১ সালে ৪ হাজার ১২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০ হাজার বীরনিবাস নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করে সরকার। মেয়াদ ধরা হয় ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ফের বাড়ানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গৃহীত প্রকল্পের মেয়াদ। ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ৭৮৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

মন্ত্রণালয়ের কার্যপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ৩০ জুন পর্যন্ত সারাদেশে ১০ হাজার ৫৫৬টি নিবাস নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। ১০ হাজার ৭২৯টির নির্মাণকাজ চলছে। মন্ত্রণালয় বলছে, ২০১৮ সালের দর অনুযায়ী ২২ হাজার ৫২৮টি বীরনিবাস নির্মাণের জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এর মধ্যে ১ হাজার ২৪৩টির নির্মাণকাজ বন্ধ আছে। 

বরাদ্দের তালিকায় সচ্ছলরাও

মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ জনপ্রতিনিধিদের কারসাজিতে প্রকৃত অসচ্ছলরা বীরনিবাস বরাদ্দের তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছেন। রাজশাহীর দুর্গাপুরের মুক্তিযোদ্ধা মুনছুর আলী প্রামাণিকের দাবি, ১২ জনের তালিকায় তাঁর নাম ছিল ৪ নম্বরে। পরে প্রভাবশালীদের চাপে তাঁকে বাদ দিয়ে সচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। 

এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, মন্ত্রণালয় থেকে ৯ জনের বাজেট অনুমোদনের পর বাছাই কমিটি তালিকার ৪, ৮ ও ১১ নম্বরের মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দেয়। তাদের মধ্যে মুনছুর আলী প্রামাণিক ও আনিসুর রহমান মোল্লা অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা। তালিকার ৭ নম্বরে বরাদ্দ পাওয়া হাবিবুর রহমান গাজীর শুধু দুর্গাপুরেই জমি আছে আট বিঘা। তিনি দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের মামা শ্বশুর। তালিকার ৫ নম্বরে থাকা আ ও ম নুরুল আলম হিরু একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তাঁর জমি আছে প্রায় ১৮ বিঘা। হিরু স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল হক টুলুর শ্বশুর। ১২ নম্বরের মৃত জোনাব আলীর স্ত্রী ঘর পেয়েছেন। তিনিও ১৩ বিঘা জমির মালিক। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সমকালকে বলেন, ‘তালিকায় আরও যারা আছেন, তাদেরও বীরনিবাস নির্মাণ করে দেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন

×