ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

সুপ্রিম কোর্ট দিবস আজ

উচ্চ আদালতে ঝুলছে সাড়ে ৫ লাখ মামলা

উচ্চ আদালতে ঝুলছে সাড়ে ৫ লাখ মামলা

.

 আবু সালেহ রনি 

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:২৪ | আপডেট: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১০:২১

মামলাজটের কারণে দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা। সর্বোচ্চ আদালতের গত ৫২ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত প্রত্যেক বিচারপতির কাছে বিচারাধীন গড় মামলার সংখ্যা ৫ হাজার ৮৮৫টি। এর মধ্যে আপিল বিভাগে ৬ জন বিচারপতির কাছে রয়েছে ২৪ হাজার ৬১০টি মামলা। 

অন্যদিকে হাইকোর্ট বিভাগে ৮৮ জন বিচারপতির কাছে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সোয়া ৫ লাখের বেশি। হাইকোর্ট বিভাগের প্রত্যেক বিচারপতির কাছে ৬ হাজার ৭টি মামলা বিচারাধীন। এরই 
মধ্যে আজ সপ্তমবারের মতো পালন করা হবে সুপ্রিম কোর্ট দিবস।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাহাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে সরকারি ছুটির কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হয় দুই দিন পর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু 
শেখ মুজিবুর রহমান সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। 

বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে দিবসটি পালন না করায় ৪৫ বছর অলক্ষ্যেই ছিল দিনটি। ২০১৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম সুপ্রিম কোর্ট দিবস পালন শুরু হয়। দিবসটি পালন উপলক্ষে আজ সোমবার বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। 

সুপ্রিম কোর্ট  প্রাঙ্গণে দুপুরে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন। প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনসহ বিচার বিভাগের বিশিষ্টজন উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিও সকালে নিজস্ব মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। 

সুপ্রিম কোর্ট দিবসটি সামনে রেখে উচ্চ আদালতে মামলার সংখ্যা বিবেচনায় বিচারপতির সংখ্যা দ্বিগুণ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা। তারা বলেছেন, মামলাজটের কারণে দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে বিচারপ্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। বিচার বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দসহ পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারপতি নিয়োগেও গুরুত্ব আরোপ করেছেন তারা। 

সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলার মধ্যে ১৪ হাজার ৯০৪টি দেওয়ানি, ৯ হাজার ৫৩৪টি ফৌজদারি ও অন্যান্য ১৭২টি। এ ছাড়া হাইকোর্ট বিভাগে ৯৩ হাজার ৯১০টি দেওয়ানি, ৩ লাখ ৮ হাজার ৯৪৫টি ফৌজদারি ও ১ লাখ ২৫ হাজার ৭২৮টি অন্যান্য মামলা বিচারাধীন। আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগ মিলিয়ে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৩টি। 

আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে বর্তমানে ৯৪ জন বিচারপতি থাকলেও কর্মরত ৯১ জন। তিনজন বিচারপতি পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগে বিচারিক দায়িত্ব পালন থেকে সাড়ে ৪ বছর বিরত রয়েছেন। সে হিসাবে প্রত্যেক বিচারপতির কাছে মামলা রয়েছে ৬ হাজার ৭৯টি। 

সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে ২০০৭ সালে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হয় বিচার বিভাগ। তখন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার। বিচারপতি ছিলেন ৮১ জন। 

উচ্চ আদালতে মামলাজট নিরসনে আলোচনা চলছে বহু বছর ধরে। এর আগে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আইন কমিশন মামলাজট নিরসন বিষয়ে ২৭ দফা সুপারিশ করেছিল। কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, উচ্চ আদালতে যে সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে, দায়ের হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। এ জন্য মামলা অনুপাতে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো, ফৌজদারিসহ বেশ কিছু আইন ও বিদ্যমান কয়েকটি আইনের ধারা সংশোধনেরও প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু এখনও সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। বরং গত কয়েক বছরে শূন্য হওয়া বিচারপতির পদ পূরণ করা হয়নি। আপিল বিভাগে এক সময় ১১ জন বিচারপতি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১০১ জন বিচারপতি কর্মরত ছিলেন।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, মামলাজট বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মামলাজটের কারণে সঠিক সময়ে বিচার না পাওয়ায় প্রার্থীরা হতাশায় ভোগেন। এভাবে চলতে থাকলে তারা হয়তো আর আদালতেই আসতে চাইবেন না। এ জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ মামলা এডিআরের (আলোচনায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা) মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বে এটি এখন কার্যকর ও জনপ্রিয় পদ্ধতি। 

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক সমকালকে বলেন, মামলাজট বৃদ্ধির প্রধান কারণ বিদ্যমান আইনের নানা দুর্বলতা। অনেক দেশেই মামলাজট হয়। সবাই এ সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান করতে না পারলেও তারা জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পেরেছে। কিন্তু তাদের কাছ থেকে আমরা শেখার কোনো উদ্যোগ নিইনি। 

তাঁর মতে, বিচার বিভাগের সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন সময় উচ্চতর পদের বিচারপতিরা উদ্যোগ নিচ্ছেন। তবে মামলাজট কমানোর বিষয়টি একটি ব্যবস্থাপনার সমস্যা। এটি বিরোধ নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত বিচারিক সমস্যা নয়। এ সমস্যার ধরন ভিন্ন। তাই সমাধান করতে হবে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে। 

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, মামলা দায়ের ও নিষ্পত্তি অনুপাতে আদালতে পর্যাপ্ত সংখ্যক যোগ্যতাসম্পন্ন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া দরকার। আমরা সবাই সমস্যার কথা জানি। তবে সমাধানের বিষয়ে উদ্যোগ কম। মামলাজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে এগিয়ে যেতে হবে। বিচারপ্রার্থী জনগণের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্যই এটি করতে হবে।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, মামলাজট কমিয়ে আনার বিষয়ে বিচার বিভাগের পাশাপাশি সরকারও তৎপর। বিচারকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিচারপতিরাও চেষ্টা করছেন। এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। 

আরও পড়ুন

×