ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

ভোটের আগে কর্মসূচি দিল কৌশলী হেফাজত

২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ

ভোটের আগে কর্মসূচি দিল কৌশলী হেফাজত

কোলাজ

 সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:৩৯ | আপডেট: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১২:৫১

নানা হিসাবনিকাশ কষেই ভোটের মাত্র ৯ দিন আগে হেফাজতে ইসলাম নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তবে এ নিয়ে সতর্ক হয়ে উঠেছে সরকার। ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় সংগঠনটির মহাসমাবেশ নতুন করে ভাবাচ্ছে সরকারকে। স্পর্শকাতর এই সময়ে ঢাকায় কোনো কর্মসূচি না দিতে সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে হেফাজতকে। কারণ, নির্বাচন ঠেকাতে একই সময়ে বিএনপি-জামায়াতও ঢাকাকেন্দ্রিক যুগপৎ আন্দোলনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ সময় কোনো অঘটন ঘটলে তার দায় হেফাজতের ওপর বর্তাবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে।

তবে হেফাজতে এখন চালকের আসনে সরকারবিরোধী অংশটি। তারা চাচ্ছে ভোটের মাঠে উত্তাপ বাড়াতে। মামুনুল হকসহ কারাবন্দি নেতাদের মুক্তি এবং মামলা প্রত্যাহারের এটাই মোক্ষম সময় বলে মনে করছে তারা। এই অংশটি চাচ্ছে, ভোটের আগে টানা কর্মসূচি। এই ধারার বাইরে হেফাজতে আছে মধ্যপন্থি আরেকটি ধারা। নেতাকর্মীর মুক্তির দাবিতে একমত হলেও তারা চাচ্ছে না, এই ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে এমন স্পর্শকাতর সময়ে নতুন করে বিরোধে জড়াতে। নরমে-গরমে দাবি আদায় করে নেওয়ার পক্ষে তারা।

নতুন কর্মসূচি প্রসঙ্গে হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান বলেন, ‘মামুনুল হকসহ অনেক আলেমকে বিনা অপরাধে কারাবন্দি করে রাখা হয়েছে। আলেমদের প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখানো হচ্ছে না। আইনি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও অন্যায়ভাবে বৈষম্য করা হচ্ছে। আবার  যেসব আলেম কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, তাদেরও  বেশির ভাগ দিন আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। আলেমদের সঙ্গে হয়রানিমূলক এমন আচরণ বন্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছি আমরা অনেক দিন ধরে। কিন্তু উল্লেখ করার মতো কোনো অগ্রগতি দেখছি না। তাই গত শুক্রবার বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছি আমরা।’

হেফাজতে ইসলাম বলছে, এখনও তাদের ১১ জন শীর্ষ নেতাসহ শতাধিক লোক কারাবন্দি। সম্প্রতি আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মাওলানা কামরুদ্দিন, মিজানুর রহমান ও রফিকুল ইসলাম মাদানী জামিনে মুক্ত হয়েছেন। তবে আটক রয়েছেন হেফাজতের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক, সহকারী মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হুসাইন রাজী, সাবেক অর্থ সম্পাদক মুফতি মুনির হুসেন কাসেমী, সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি নুর হুসাইন নুরানী, আবদুল মান্নান ও দিদারুল আলম। শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবিতে এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করেছেন হেফাজত নেতারা। সেখানে যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।

ভোটের আগে ঢাকায় নতুন কর্মসূচি দিতে তৎপর ছিলেন হেফাজতের সরকারবিরোধী অংশের নেতারা। এর মধ্যে আছেন– মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব, মাওলানা  মুহিউদ্দীন রাব্বানী, মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী, মাওলানা আজিজুল হক, মাওলানা মীর ইদরিস প্রমুখ। ঢাকার বিক্ষোভ সমাবেশে তাদের অনেকে বক্তব্যও দেন।

এ নেতাদের সঙ্গে আরও আছেন হেফাজতের নতুন কমিটিতে যুক্ত হওয়া নেজামে ইসলামের নেতা হারুণ ইজাহার, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামীর নেতা আবদুর রব ইউসুফী, খেলাফত মজলিসের নেতা সাখাওয়াত হোসাইন, শোয়ায়েব জমিরি প্রমুখ।

চলতি বছর হেফাজতের নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এবার ২১১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়। একই সময়ে ৫৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা পরিষদের তালিকাও প্রকাশ করা হয়।
হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মীর ইদরিস বলেন, ‘সংগঠনের সবাই চায় মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার হোক। আটক নেতাকর্মীর মুক্তি নিয়ে কারও কোনো দ্বিমত নেই। আমরা সরকারের কাছে একাধিকবার দাবি জানিয়েছি। পর্যাপ্ত সময়ও দিয়েছি। কিন্তু এখনও আমাদের অনেক নেতাকর্মী আটক আছেন। তাদের মুক্তির দাবিতে তাই নতুন কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।’

২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ঘোষিত নারী নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রধান শাহ আহমদ শফীকে প্রধান করে গঠন করা হয় অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। তবে এর নেতাদের প্রায় সবাই ছিলেন ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দলের নেতা। সে সময় এই নেতাদের বেশির ভাগই ছিলেন বিএনপি-জামায়াত জোটের অংশীদার। ২০১৩ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলার সময় এই আন্দোলনের নেতাদের ‘নাস্তিক’ আখ্যা দিয়ে ৫ মে রাজধানী অবরোধ করে হেফাজত। সে সময় সরকার ফেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়। তবে গত এক দশকে এই সমীকরণ পাল্টেছে অনেকটাই। 

পরের কয়েক বছরে হেফাজত নেতাদের অনেকের অবস্থান বদলে যায়। কওমি মাদ্রাসাকে স্বীকৃতি দেয় সরকার। হেফাজতের মধ্যে তাই সক্রিয় হয় সরকার পক্ষের একটি ধারা। এই পক্ষ চাচ্ছে সংঘাতে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে দাবি আদায় করে নিতে। গত এক বছর এই ধারার নেতারা সক্রিয় থাকায় সরকারবিরোধী বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি দেয়নি হেফাজতে ইসলাম। কিন্তু এখন আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে সরকারবিরোধী অংশটি। তারা চাচ্ছে, ভোটের আগে আরও একাধিক কর্মসূচি দিয়ে শীর্ষ নেতাদের দ্রুততম সময়ে মুক্তি নিশ্চিত করতে।

তবে মধ্যপন্থি অংশটি বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে নতুন কোনো ইস্যুতে জড়াতে চায় না। যুগ্ম মহাসচিব ও একাধিক নায়েবে আমিরের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তারা কেউ নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি। তবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িয়ে নতুন কোনো সমস্যায় না পড়তে সরকারের পক্ষ থেকে হেফাজতকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। ঢাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটলে তার দায় হেফাজতের ওপর বর্তাবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে হেফাজতকে।

হেফাজতের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ২৫০টির মতো মামলা তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ২০২১ সালের মার্চ মাসে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ১৯ জনের মৃত্যু হয়। এসব ঘটনায় সারাদেশে ১৩৪টি মামলা হয়।

২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে তাণ্ডবের ঘটনায় ঢাকা ও ঢাকার বাইরে মোট মামলা হয় ৮৩টি। এর বাইরে আরও মামলা আছে। হেফাজত নেতারা জানান, মামলাগুলো ২০১৩, ২০১৬, ২০১৮ ও ২০২১ সালের। এসব মামলায় আটক নেতাকর্মীর মুক্তি দাবিতে আন্দোলন করছেন তারা। 

আরও পড়ুন

×