ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

‘ঘোল খেল’ তিন কিংস পার্টি

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

‘ঘোল খেল’ তিন কিংস পার্টি

.

 কামরুল হাসান

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:৪৭ | আপডেট: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১৬:১৪

এবারের জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টি (জাপা) আর ১৪ দলের শরিকদের জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আসন বণ্টন করলেও ভাগ পায়নি তিন কিংস পার্টি। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হলেও কোনো আসনই ‘নিশ্চিত’ করতে পারেনি তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট (বিএনএম) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি)। এমনকি দলগুলোর জ্যেষ্ঠ ছয় নেতাও পাত্তা পাননি। তাদের আসন থেকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে সরানো হয়নি। ফলে নির্বাচনে তাদের জয়ের বিষয়টি পুরোপুরি অনিশ্চিত বলে মনে করছেন দলগুলোর নেতাকর্মী। 

তারা জানান, বিতর্কের জন্ম দিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নতুন নিবন্ধন পাওয়া দুই দলের সাংগঠনিক ভিত্তি একেবারেই নেই। সাধারণ মানুষের কাছেও তেমন পরিচিত নয়। সন্দেহ-অবিশ্বাসের মধ্যে সৃষ্টি এসব দল বিগত দিনে জনগণের মধ্যে কোনো আস্থাও তৈরি করতে পারেনি। এমন দুর্বল অবস্থানে থেকে একক ক্ষমতায় নির্বাচন করলে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার শঙ্কাই বেশি বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে যোগসাজশে কোনো আপস হলে সেখানে ফলাফলের চিত্র ভিন্ন হতে পারে– এমন ধারণা অনেকের। 

জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ২৬টি ও ১৪ দলের শরিকদের ছয়টি আসন ছেড়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। শরিকদের মধ্যে জাসদ তিনটি, ওয়ার্কার্স পার্টি দুটি ও জাতীয় পার্টি (জেপি) একটি আসন পেয়েছে। তবে নির্বাচনে ঢাকঢোল পিটিয়ে মাঠে নামলেও আখেরে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে কিংস পার্টি হিসেবে পরিচিত ‘তৃণমূল বিএনপি’, ‘বিএনএম’ ও ‘বিএসপি’ নেতাদের। 
এ ব্যাপারে তৃণমূল বিএনপির মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকার সমকালকে বলেন, সরকারের কাছে তারা আসন ভাগাভাগি চাননি। যদিও অন্য দল সেটা করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তারা শুধু সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা চেয়েছেন। সেটা পেয়েছেন বলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। 

নেতারা জানান, নির্বাচনে তৃণমূল বিএনপি ২৩০ আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছে। আর বিএনএম ৮২ আসনে। এর মধ্যে তৃণমূল বিএনপি ও বিএনএমের কতজনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, এর সঠিক পরিসংখ্যান তাদের কাছেও নেই। যদিও তাদের দাবি, তৃণমূল বিএনপির ১৩৯ ও বিএনএমের ৫৭ মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে ইসি। তবে এর মধ্যে বেশির ভাগই অপরিচিত। 
জানা গেছে, শুরু থেকেই অভিজ্ঞ কিংবা হেভিওয়েট প্রার্থী সংকটে ভুগছে কিংস পার্টিগুলো। এ জন্য বিএনপিসহ অন্য দল থেকে নেতা ভাগিয়ে নেওয়ার জোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সেখানে ব্যর্থ হওয়ায় রাজনীতি আর নির্বাচনের মাঠে তাদের আর আগের মতো তেমন কদর নেই।

বিএনএমের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর সমকালকে বলেন, আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে চাই। সেখানে ভাগবাটোয়ারার প্রশ্নই আসে না।
বেশ কয়েকজন নেতা জানান, শেষ পর্যন্ত তাদের প্রত্যাশা ছিল, দলগুলোর জ্যেষ্ঠ ছয় নেতাকে শরিক দলগুলোর মতো সুযোগ দেবে আওয়ামী লীগ। সেখানে একজনকেও না দেওয়ায় হতাশ নেতাকর্মী। এর মধ্যে তৃণমূল বিএনপির চেয়ারপারসন শমসের মবিন চৌধুরী সিলেট-৬, মহাসচিব অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার নারায়ণগঞ্জ-১, নির্বাহী চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট অন্তরা হুদা মুন্সীগঞ্জ-১ এবং বিএনএমের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর ফরিদপুর-১, মহাসচিব ড. মুহাম্মদ শাহ্জাহান চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) ও দলটির সাবেক আহ্বায়ক ড. আবদুর রহমান বরগুনা-২ আসনে আছেন। এ ছয় আসনের একটিতেও আওয়ামী লীগ ছাড় দেয়নি।

এর মধ্যে সিলেট-৬ আসনে নৌকা প্রতীকে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী কানাডা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সরওয়ার হোসেন; নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজী বীরপ্রতীক। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান ভূঁইয়া ও গোলাম দস্তগীর গাজীর ছেলে গোলাম মুর্তজা; মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মহিউদ্দিন আহম্মেদ, বিকল্পধারার প্রার্থী ও বর্তমান সংসদ সদস্য মাহী বি. চৌধুরী ও আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম সারোয়ার কবীর; ফরিদপুর-১ আসনে নৌকার প্রার্থী দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান, স্বতন্ত্র প্রার্থী কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সাবেক সহসভাপতি আরিফুর রহমান দোলন ও মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বেগম; চাঁদপুর-৪ আসনে নৌকা নিয়ে বর্তমান এমপি শফিকুর রহমান ছাড়াও আওয়ামী লীগের আরও দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে সাবেক এমপি ড. শামসুল হক ভূঁইয়া ও উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে পদত্যাগকারী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম রোমান রয়েছেন। বরগুনা-২ আসনে সংসদ সদস্য সুলতানা নাদিরাসহ আরও বেশ কয়েকজন রয়েছেন। সুষ্ঠু ভোট হলে নৌকার সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীর লড়াই হবে। সেখানে ওই দু’দলের নেতাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না বলে মনে করছেন নির্বাচনী এলাকার ভোটাররা।

এদিকে তিনটি কিংস পার্টির প্রার্থীরা পড়েছেন আর্থিক সংকটে। দল থেকে প্রার্থীদের জন্য কোনো বরাদ্দই দেওয়া হচ্ছে না বলে অনেকের অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূল বিএনপির দুই প্রার্থী সমকালকে জানান, যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা ছিল, তার কিছুই এখন পূরণ করতে পারছেন না দলের শীর্ষ নেতারা।

এ বিষয়ে তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, আমরা নতুন দল। এখানে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মতো কোনো তহবিল নেই। এর পরও কিছু সহযোগিতা করা হবে।
একই অবস্থা বিরাজ করছে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিতেও। কোনো আসনে নিশ্চয়তা না পাওয়ায় হতাশ দলটির নেতাকর্মী। যদিও দলটির মহাসচিব আবদুল আউয়াল মামুন বলেন, আমরা সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। নির্বাচনে আমরা বিএনপি-জামায়াতের ভোটের বড় অংশ পাব বলে বিশ্বাস করি।

 

আরও পড়ুন

×