ঢাকা বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

বিরোধী দল নির্বাচনে এলে দলীয় প্রতীকে ভোট

কৌশল ঠিক করছে আওয়ামী লীগ

উপজেলা নির্বাচন

কৌশল ঠিক করছে  আওয়ামী লীগ

.

 অমরেশ রায়

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৪ | ০০:২৩ | আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২৪ | ১০:০৩

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের কৌশল ঠিক করছে আওয়ামী লীগ। এ ক্ষেত্রে দুই ধরনের চিন্তাভাবনা চলছে দলের নীতিনির্ধারক নেতাদের মধ্যে। বিএনপি ও তার মিত্ররা নির্বাচনে এলে গতবারের মতো এবারও নৌকা প্রতীকে দলীয় প্রার্থী নিয়ে ভোটের মাঠে থাকবে ক্ষমতাসীন দলটি। সরকারবিরোধীরা নির্বাচন বর্জন করলে স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন দলের সব নেতার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দলীয় মনোনয়ন দিয়েও অন্য সবার জন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের সুযোগ করে দেওয়া হবে।

তবে সবার আগে সদ্যসমাপ্ত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নৌকা ও দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে বিরোধে সৃষ্ট সহিংসতাপূর্ণ পরিস্থিতি তথা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কোন্দল মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জেলায় জেলায় সফর করে এ বিরোধ মেটানো হবে। সব মিলিয়ে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল মিটিয়েই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যাবে আওয়ামী লীগ। 

বিএনপিবিহীন জাতীয় নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে ও ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে ওই নির্বাচন উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ফলে নৌকা প্রতীকের দলীয় প্রার্থী ছাড়াও শতাধিক আসনে স্বতন্ত্রভাবে লড়েছেন দলীয় নেতারা; যার মধ্যে বেশির ভাগ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের এমন ‘নির্বাচনী কৌশল’ অনেকটা সফল হলেও দলের মধ্যে ভিন্ন রকম সংকট সৃষ্টি করেছে। দলীয় দ্বন্দ্ব-কোন্দল নতুন মাত্রা নেওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনের আগে-পরে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা, ভাঙচুর এবং সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে ছয়জন নিহত হওয়া ছাড়াও অনেকেই আহত হয়েছেন।

দলের কয়েকজন নীতিনির্ধারক নেতা বলেছেন, আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা ১৫ জানুয়ারি দলের যৌথ সভায় নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ‘সবকিছু ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার’ আহ্বান জানানোর পর নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার মাত্রা অনেকটাই কমে এসেছে। তবে ভেতরে ভেতরে দলীয় কোন্দল রয়েই গেছে। যার প্রভাব আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থাতেই বিবদমান সব পক্ষকে দলের মধ্যে এককাতারে নিয়ে আসতেই দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা তৃণমূল সফরে যাচ্ছেন।

নির্বাচন কমিশন থেকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তপশিল এখনও ঘোষণা করা হয়নি। তবে রোজার আগে আগামী মার্চে কয়েকটি ধাপের এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের আভাস মিলেছে নির্বাচন কমিশন থেকে; যা চলতে পারে এপ্রিল পর্যন্ত। আগামী সপ্তাহেই প্রথম ধাপের প্রায় ১০০ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা হতে পারে। দেশের ৪৯২টি উপজেলার মধ্যে ৪৮৫টি নির্বাচন যোগ্য হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে। 

সর্বশেষ ২০১৯ সালের মার্চ ও এপ্রিলে মোট পাঁচ ধাপে উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমবার দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ সমমনা বিরোধী দল। তবে তৃণমূলে অনেক বিএনপি নেতাই দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। 

এদিকে, উপজেলার তপশিল ঘোষণা না হলেও জাতীয় নির্বাচন-উত্তর ‘বিশেষ পরিস্থিতি’তে এবার আগেভাগেই স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ততা শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগে। তৃণমূলে সম্ভাব্য প্রার্থী ও নেতাকর্মীও এরই মধ্যে প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন। গত বুধবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন নেতাদের যৌথ সভা এবং পরে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের আলাদা বৈঠকেও এ নিয়ে কিছুটা আলোচনা হয়েছে। ওই সভা শেষে দলের কয়েকজন নেতা উপজেলা নির্বাচনে নৌকা প্রতীক না রাখার প্রস্তাব করেন। এ ক্ষেত্রে উপজেলা চেয়ারম্যান পদগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন তারা। এমন প্রস্তাবের জবাবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

২০১৫ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন প্রণয়নের পর থেকে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করে আসছে রাজনৈতিক দলগুলো। উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান এবং পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে দলীয়ভাবে মনোনয়ন দেওয়ার নিয়ম এখনও বিদ্যমান। তবে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর এবং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে যার যার মতো করে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দলগুলো কাউকে সমর্থন দিতে পারে মাত্র। তবে ২০১৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন উন্মুক্ত রেখেছিল আওয়ামী লীগ। 

নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচনে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে কম ভোট পড়েছে। অতীতে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ৬০-৭০ শতাংশ ভোটার ভোট দেন। কিন্তু ২০১৯ সালের সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৪০ দশমিক ২২ শতাংশ। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও ওই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদের পাশাপাশি ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদেও বিপুলসংখ্যক প্রার্থী ছিলেন। এরপরও ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার বিষয়টি আওয়ামী লীগকেও ভাবিয়ে তুলছে। এমন ভাবনায় ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা থেকেই আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে উন্মুক্ত রাখা হতে পারে বলেও দলটির কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন। 

নেতারা আরও বলছেন, জাতীয় নির্বাচন বর্জনের ধারাবাহিকতায় বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অংশ নেবে না বলেই অনেকটা নিশ্চিত তারা। ফলে ভোটকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করা এবং ভোটার উপস্থিতি বাড়াতেই জাতীয় নির্বাচনের মতো উপজেলা নির্বাচনকেও উন্মুক্ত করে দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে। আবার প্রার্থিতা উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে সারাদেশের বিপুলসংখ্যক উপজেলায় এ নিয়ে নতুন করে দ্বন্দ্ব-কোন্দল দেখা দেয় কিনা, সেটা নিয়েও দুশ্চিন্তা রয়েছে। এই কারণেই উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীক রাখা বা না রাখা– দুই কৌশলের সুফল-কুফল নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছেন তারা। তবে সব কিছু নির্ভর করছে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের ওপর।

এ ছাড়া নির্বাচন উন্মুক্ত করা হলে উপজেলা নির্বাচনের প্রার্থী হওয়া সব নেতা ও তাদের পক্ষে কাজ করা নেতাকর্মীকে সাংগঠনিক শাস্তির আওতামুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত আসবে বলেও জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা। এ ক্ষেত্রে সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের কৌশলের পুনরাবৃত্তি করা হবে। দলের গঠনতন্ত্র অনুসারে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার পর কেউ এর বিরোধিতা করে নিজে নির্বাচনে অংশ নিলে বা অন্য কারও পক্ষে ভোট করলে তাঁকে দল থেকে সরাসরি বহিষ্কার করা হয়। ২০১৫ সালের পর সব ধরনের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নেতাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে এবার জাতীয় নির্বাচনে দল সিদ্ধান্ত নিয়েই স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। ফলে গঠনতন্ত্রের এই ধারার প্রয়োগ করা হয়নি।

গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, তপশিল ঘোষণার পর দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকেই উপজেলা নির্বাচনের বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ সমকালকে বলেছেন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের মধ্যে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী হোক– সেটাই আওয়ামী লীগের চাওয়া। সে জন্যই উপজেলা পরিষদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন দরকার। এখন বিএনপি যদি না আসে, তাহলে এই নির্বাচনে দল স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতি হয়তো বা নমনীয় থাকবে। তবে বিএনপি নির্বাচনে এলে আওয়ামী লীগ গতবারের মতো দলীয় প্রতীক নিয়েই নির্বাচনে অংশ নেবে।

 

আরও পড়ুন

×