মূল নকশায় জায়গাটি ছিল রাস্তা। সেই রাস্তাকে প্লট বানিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হলো প্রভাবশালীদের। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হলো, বরাদ্দ বাতিল করা হবে। বরাদ্দ বাতিল তো দূরের কথা, পরে ওই প্লটের বিপরীতে রাজউক থেকে দেওয়া হলো বহুতল ভবনের নকশার অনুমোদন। এখন দেখে বোঝার উপায় নেই, সেখানে একদা রাস্তা ছিল।
যেন সুকুমার রায়ের হযবরল গল্পের মতো- 'ছিল রুমাল, হয়ে গেল একটা বেড়াল!' তাতে 'মুশকিল আবার কী? এ তো হামেশাই হচ্ছে'। তা অবশ্য হচ্ছে। কিন্তু মুশকিল হয়েছে মানুষের। রাস্তার জায়গায় বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের পর সাধারণ মানুষকে এখন অনেক ঘোরা পথে গন্তব্যে পৌঁছতে হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়েছে জটিল। বেড়েছে যানজট। পাশাপাশি বিপুল অর্থে দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিল তৈরির উদ্দেশ্যও অনেকটা ব্যাহত হয়েছে। আর এসব হয়েছে তেজগাঁও শিল্প এলাকায় রাস্তাকে প্লট বানিয়ে বরাদ্দ দেওয়ার কারণে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান সমকালকে বলেন, নকশা পরিবর্তন করারও একটি প্রক্রিয়া আছে। কিন্তু রাস্তাকে প্লট বানিয়ে বরাদ্দ দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। কারণ এটা জনগণের সুবিধার জন্য। যেখানে নাগরিক সুবিধার বিষয় যুক্ত থাকে, সেখানে নকশা কর্তন করে নাগরিক স্বার্থবিরোধী কাজ করার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, এমনিতেই আমাদের শহরে যে পরিমাণ রাস্তা থাকা প্রয়োজন, সেটার অভাব; তার ওপর রাস্তাকে প্লট বানিয়ে বরাদ্দ দেওয়া একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এ ক্ষেত্রে যারা এই কাজগুলো করেছে তাদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। বের করা প্রয়োজন কী স্বার্থ তাদের ছিল রাস্তাকে প্লট বানিয়ে বরাদ্দ দেওয়ার পেছনে।
এক যুগ আগে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে জনস্বার্থে আদালতে একটি রিট মামলা দায়ের করেছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি সমকালকে বলেন, তেজগাঁও শিল্প এলাকার মূল নকশাকে অবজ্ঞা করে উন্মুক্ত স্থান ও রাস্তার জায়গায় বিভিন্ন সময়ে ২১টি প্লট বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে জনসাধারণের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিসাধন হয়েছে রাস্তার জায়গায় প্লট বরাদ্দ দেওয়ায়। বিষয়টি নিয়ে তিনি আদালতে রিট করেছিলেন। আদালতে বিষয়টি নিয়ে শুনানি চলছে। সামনে আরেকটি শুনানিরও দিন আছে।
বিগত সরকারের আমলে তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এসব প্লটের বরাদ্দ বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনোটিই বাতিল করা হয়নি। বরং সেসব প্লটে ইতোমধ্যে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে।
রাস্তার জায়গায় বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন প্রসঙ্গে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান এবিএম আমিন উল্লাহ নূরী বলেন, রাজউক এলাকায় সরকারি কোনো সংস্থা কোথাও প্লট বরাদ্দ করলে বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি সেখানে ভবনের নকশা অনুমোদন নিতে চাইলে রাজউকের কিছু করার থাকে না। তবে সরকার সিদ্ধান্ত নিলে রাষ্ট্রের স্বার্থে যে কোনো সময় বরাদ্দ বাতিল হতে পারে।
জানা যায়, পঞ্চাশের দশকে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় প্লট বিন্যাস করে একটি পরিকল্পিত শিল্প এলাকা তৈরি করে সেগুলো ব্যবসায়ীদের মধ্যে বরাদ্দ দেয় তৎকালীন পূর্ত বিভাগ। পর্যায়ক্রমে সেখানে তেজগাঁও শিল্প এলাকা গড়ে ওঠে। নকশায় ওই শিল্প এলাকার মূল সড়কগুলোর প্রশস্ততা ছিল অন্তত ৬০ ফুট। এর মধ্যে তাজউদ্দীন আহমদ সরণি থেকে লাভ রোড হয়ে শিল্প এলাকার তেজগাঁও থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউট সংলগ্ন ১৩৬ ও ১৩৭ নম্বর প্লটের মধ্য দিয়ে একটি ৬০ ফুট প্রশস্ত সড়ক ছিল হাতিরঝিল পর্যন্ত। একইভাবে ১২২ ও ১৩৫ নম্বর প্লটের মধ্য দিয়ে আরেকটি সড়ক হাতিরঝিলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু হাতিরঝিলের আধুনিকায়নের আগে ওই রাস্তার ওপর অস্থায়ী অবকাঠামো বানিয়ে কিছু লোকজন ব্যবসা-বাণিজ্য ও বসতি গড়ে তোলে। গণপূর্ত অধিদপ্তরও তাদের কখনও উচ্ছেদ করেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ওই দুটি সড়ককে প্লট তৈরি করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই প্লটগুলো বরাদ্দ পান সাবেক বিএনপি নেতা জিয়াউল হক জিয়া, মেজর (অব.) কামরুল ইসলাম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং কামাল উদ্দিন নামের একজন ব্যবসায়ী। আরেকটি প্লটের বর্তমান মালিক সাবেক বিএনপি নেতা এম মোরশেদ খান ও আরেক ব্যবসায়ী। নতুন তৈরি করা প্লটগুলোর নাম দেওয়া হয় ১৩৬/১, ১৩৩/১, ১৭১/১, ১৭১/২, ১২২/১ ও ১২৩/১। কিন্তু হাতিরঝিলের কাজ শেষ হওয়ার পর ওই রাস্তা দুটির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কিন্তু ততদিনে ওই প্লটের কয়েকটিতে স্থায়ী অবকাঠামো উঠেছে। বরাদ্দপ্রাপ্তরা বরাদ্দ পাওয়ার পর গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, তারা প্লটের আবেদন করেছিলেন। সরকার তাদের প্লট দিয়েছে। কাজেই এ ব্যাপারে বরাদ্দপ্রাপ্তদের কোনো দায় নেই।
রাস্তাকে প্লট বানিয়ে বরাদ্দ না দিলে তাজউদ্দীন আহমদ সরণি থেকে লাভ রোড দিয়ে মানুষ সোজা হাতিরঝিলে যাওয়ার সুযোগ পেতেন। হাতিরঝিলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে সম্প্রতি ১২৮ ও ১৭৩ নম্বর প্লট সংলগ্ন রিং রোডের সঙ্গে একটি সড়ক তৈরি করে হাতিরঝিলের সঙ্গে সংযুক্ত করে মানুষের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে এখন অনেকটা ঘুরে হাতিরঝিলে যেতে হচ্ছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নকশার রাস্তার জায়গায় ১৩৬ নম্বর প্লটের পাশে নতুনভাবে বরাদ্দ দেওয়া ১৩৬/১ নম্বর নামের ওই প্লটে একটি বিদেশি গাড়ি কোম্পানির সার্ভিসিং সেন্টার ও ওয়ার্কশপ। তার পেছনেই ১৩৩/১ নম্বর নতুন প্লটে তৈরি করা হয়েছে আরেকটি বহুতল ভবন। আর ১২৩ ও ১৩৪ নম্বর প্লটের মাঝে তৈরি করা ১২৩/১ নম্বর নামের নতুন প্লটে তৈরি করা হয়েছে একটি গার্মেন্ট। আর ১২২ ও ১৩৫ নম্বর প্লটের মধ্যবর্তী সড়কে নতুনভাবে তৈরি করা ১২২/১ নম্বর প্লটে তৈরি করা হয়েছে আরেকটি বহুতল ভবন।
রাস্তাকে প্লট বানিয়ে বরাদ্দ দেওয়ার পর তা কেন বাতিল করা হলো না সে প্রসঙ্গে বর্তমান গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহেমদ বলেন, এসব ঘটনা অনেক আগে ঘটেছে। আর বরাদ্দ দেওয়ার পরই বরাদ্দপ্রাপ্তরা সেখানে ভবন তৈরির কাজ শুরু করে দেন। যে কারণে পরে আর বাতিল করা সম্ভব হয়নি। তবে এখনও পর্যালোচনা করার সুযোগ আছে।
হাতিরঝিল প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজউকের একজন প্রকৌশলী বলেন, ওখানে প্লট বরাদ্দ দেওয়ায় সংযোগ সড়কটি জটিলতায় পড়েছে। কারণ মূল পরিকল্পনায় কিছু পয়েন্টে রাস্তাগুলো হাতিরঝিলের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার কথা। তাহলে পূর্ব-পশ্চিমের যোগাযোগটা সহজ হয়ে যেত। সেটা না হওয়ায় ওই এলাকার যানজট সমস্যা রয়েই যাবে।