ইট-পাথরের দালান সারি সারি। জনসংখ্যায় ফুলে-ফেঁপে উঠছে তিলোত্তমা নগরী। ঢাকার নিত্যযানজট, সঙ্গে পরিবেশ আর শব্দদূষণও বাড়বাড়ন্ত। কমছে ঝোপঝাড়, নদীনালা, খালবিল ও উন্মুক্ত জমি। নগরীর প্রাণবৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থান বিপন্ন। এর মধ্যেও আছে সুখবর। রাজধানীতে যেটুকু সবুজের দোল, সেই সবুজ ঘিরেই টিকে আছে ২০৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতিকূল পরিবেশে ঢাকায় এখনও বাস করছে এসব প্রাণী। তবে তারা রয়েছে অস্তিত্ব সংকটে। সবুজের আচ্ছাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি দূষণের বর্তমান ধারা চলমান থাকলে রাজধানী থেকে এসব বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির পথে হাঁটতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফিরোজ জামানের তত্ত্বাবধানে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রমনা, উত্তরা, খিলক্ষেত, দিয়াবাড়ী, আফতাবনগরসহ রাজধানীর ২২ এলাকায় এ গবেষণা চালানো হয়। এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন মো. মোখলেছুর রহমান, মো. মাহবুব আলম, আবদুর রাজ্জাক ও সাখাওয়াত হোসেন। মাঠ পর্যায়ে মো. ফজলে রাব্বি, আবু সাইদ রানা ও আশিকুর রহমান সমীরের নেতৃত্বে কাজ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী রিসার্চ
ল্যাবরেটরির অধীনে চলা গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি ইতালির বায়োডাইভারসিটি জার্নালে প্রকাশ হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজধানীতে সবুজ ও ঝিঁঝি ব্যাঙসহ উভচর প্রাণী আছে ১২ প্রজাতির। গুইসাপ, খৈয়া গোখরা, পদ্মগোখরা ও তক্ষকের মতো ১৯ প্রজাতির সরীসৃপ প্রাণী আছে। রয়েছে বানর, শিয়াল, বনবিড়ালসহ ১৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। এর মধ্যে তুরাগ ও বুড়িগঙ্গায় থাকা ডলফিন আছে সবচেয়ে ঝুঁকিতে। চন্দনা ও হীরামন টিয়ার দেখা মেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। চন্দ্রিমা উদ্যান ও রমনা পার্কের উঁচু গাছে এমন টিয়া আছে চার প্রজাতির। ভুবনচিলের বাস কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিরীষ গাছে। মহানগরীতে শত সংকটেও টিকে আছে ঘড়িয়াল, বসন্ত বাউরি, ফিঙে ও ছোট ভীমরাজ। সব মিলিয়ে এ শহরে ১৬২ প্রজাতির পাখির খোঁজ মিলেছে গবেষণায়।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, ঢাকার কিছু বিশেষ এলাকায় বন্যপ্রাণীরা গুচ্ছাকারে বাস করছে। এর মধ্যে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, রমনা পার্ক, উত্তরা, দিয়াবাড়ী, খিলক্ষেত, রামপুরার আফতাবনগরেই সচরাচর এদের দেখা মেলে। ঢাকায় সবুজ, গেছো, কটকটি ও ঝিঁঝি ব্যাঙ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু জলাশয় দূষণ ও ভরাটের কারণে দ্রুত কমছে ব্যাঙের সংখ্যা। কিছু জলাশয়ে এখনও সুন্ধি কাছিম ও তরাকরি কাইট্টা প্রজাতির কচ্ছপ থাকলেও নেই তাদের প্রজননের পরিবেশ।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফিরোজ জামান সমকালকে বলেন, 'শহর এলাকায় এখনও বহু বন্যপ্রাণী বাস করছে। তারা আমাদের কত উপকারে আসছে, এর হিসাব আমরা রাখি না। বন্যপ্রাণীর বড় অবদান নগরকে পরিস্কার রাখা। ৫০ টন ময়লা ১০-১২ দিনে পচে না। ভুবনচিল এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। যেসব এলাকায় বেজি থাকে, সেখানে ইঁদুর থাকে না। সব ইঁদুর খেয়ে ফেলে বেজি।
গবেষণার তিন বছর পর ঢাকার বন্যপ্রাণীর অবস্থা এখন কেমন- এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ড. মোহাম্মদ ফিরোজ জামান বলেন, তিন বছরে ঢাকায় বন্যপ্রাণী বাড়তেও পারে, আবার কমতে পারে। অপরিবর্তিতও থাকতে পারে। সংখ্যা বলা কঠিন। এই গবেষণা ২০৩০ সাল পর্যন্ত চলবে।

বিষয় : জীব বৈচিত্র্য গবেষণা

মন্তব্য করুন