র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর থেকে নানা গুজব ডালপালা মেলছে। প্রতিদিনই আসছে উড়ো খবর- অমুকের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বাতিল হয়েছে, তমুক ঢুকতে পারেননি। একই সঙ্গে নানা আলোচনা এখানে-সেখানে- নিষেধাজ্ঞায় সরকার কি চাপে পড়েছে? সামনের দিনগুলোতে সরকার কি আরও বড় কূটনৈতিক চাপে পড়তে যাচ্ছে?

অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার ঘটনা বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের আলাপ-আলোচনার ওপরই নির্ভর করবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে কিনা।

গত ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাব এবং র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব বিভাগ। আর পুলিশের বর্তমান মহাপরিদর্শক ও র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদের ওপর রাজস্ব বিভাগের নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর পৃথকভাবে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও দেয়।

এ নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরপরই গুজব ছড়িয়ে পড়ে, সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে অবশ্য সেই প্রতিমন্ত্রী এই গুজব উড়িয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনসহ কয়েকটি শহরে ঘুরে বেড়ানোর ছবি শেয়ার করেন ফেসবুকে। এরপর গুজব রটে, সরকারের একজন সিনিয়র সচিবকেও যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এই সিনিয়র সচিব দেশেই আছেন। এরপর আরেক সংস্থাপ্রধানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ না করতে দেওয়ার গুজব রটে। পরে দেখা যায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফরেই যাননি।
একের পর এক গুজব রটে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বাতিলের। তবে ব্যক্তির ভিসা বাতিল সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো ধরনের তথ্যই প্রকাশ করে না। ফলে এ ধরনের গুজবের বিষয়ে সত্যতা যাচাই করারও কোনো সুযোগ থাকে না।

সংশ্নিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানায়, নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি যুক্তরাষ্ট্র সরকার সংশ্নিষ্ট দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। আর ভিসা বাতিলের বিষয়টি ব্যক্তির গোপনীয় বিষয়। ফলে ভিসা বাতিল-সংক্রান্ত কোনো তথ্য কখনোই যুক্তরাষ্ট্র সংশ্নিষ্ট ব্যক্তিকে জানানো ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করে না। তবে কোনো দেশের এক বা একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্থ পাচার,

মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা গুরুতর অপরাধের তথ্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে থাকলে তা ওই দেশের সংশ্নিষ্ট সরকারি দপ্তরকে জানানো হয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা নিয়ে প্রবেশ করতে গেলেও ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা সুনির্দিষ্ট অপরাধের তথ্যের ভিত্তিতে কিংবা জোরালো সন্দেহ থাকলে কোনো ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান আছে। এটা সব দেশের নাগরিকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

বিশেষজ্ঞ মত: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমশের মবিন চৌধুরী সমকালকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশের কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এটা ইরান কিংবা উত্তর কোরিয়ার মতো ঢালাও নিষেধাজ্ঞা নয়। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না। সে কথা ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতও বলেছেন। এ নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি লিখেছেন। বস্তুত বাংলাদেশের সাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা প্রত্যাহার হবে কিনা, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের আলাপ-আলোচনার ওপর।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্নেষক হুমায়ুন কবীর বলেন, বাইডেন প্রশাসনকে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ে তথ্য ও বিশ্নেষণ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরের রিপোর্টে এবং আন্তর্জাতিক একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্ট বারবার এসেছে। সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতা এবং নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করেছে। সম্ভবত, এ রিপোর্টগুলোই যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতিনির্ধারকদের নিষেধাজ্ঞার মতো সিদ্ধান্তে নিয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। এই কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়েই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হতে পারে। কিন্তু যেসব গুজব আসছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। গুজবে কান দেওয়া কিংবা আলোচনা করা অর্থহীন।

গওহর রিজভীর সঙ্গে মিলারের সাক্ষাৎ: প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এক টুইট বার্তায় মিলার লিখেছেন, ড. গওহর রিজভী একজন বরেণ্য ইতিহাসবিদ, সজ্জন ব্যক্তি এবং বন্ধু। আলোচনায় তারা দুই দেশের আদর্শিক অবস্থানের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং ঐতিহাসিক যৌথ সহযোগিতার সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে কথা বলেছেন। তারা দুই দেশের জনগণের সঙ্গে জনগণের অটুট ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আরও এগিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন।