সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকা 'প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' বা ইসিএ হিসেবে চিহ্নিত। এই সীমার মধ্যে পরিবেশ দূষণকারী কলকারখানা স্থাপন নিষিদ্ধ। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কার্যকলাপও নিষিদ্ধ। কিন্তু সুন্দরবনের ইসিএর মধ্যে অবৈধভাবে নির্মাণাধীন কলকারখানাকে এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কার্যকলাপকে বৈধতা দিতে ইসিএ আরও কমিয়ে আনার চিন্তাভাবনা চলছে।

জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। নির্ধারিত এই সীমারেখা পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়।

প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার মধ্যে অনেক কলকারখানা গড়ে উঠছে। নির্মাণাধীন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে এই এলাকায় শিল্পায়ন ঘটছে। কিন্তু ইসিএ ১০ কিলোমিটার থাকায় এসব শিল্পকারখানা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে আদালতের। তাই এটি কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে। অস্তিত্ব সংকটে পড়বে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এ বন।

তবে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় বলছে, সম্প্রতি কয়েকটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে আলোচনার পর বিষয়টি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেননা ইসিএ কেন ১০ কিলোমিটার ধরা হয়েছে, এর বৈজ্ঞানিক বা আইনগত ভিত্তিই বা কী, ইসিএ কি সুন্দরবনের সীমানা থেকে নাকি সুন্দরবনের যে অংশটুকু বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ, সেখান থেকে পরিমাপ করা হবে- এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

ইসিএ কেন: দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে সরকার বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সর্বশেষ সংশোধিত ২০১০) অনুসারে বিভিন্ন সময়ে কিছু এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৯৯ সালে প্রথম ইসিএ ঘোষিত হয়। এ পর্যন্ত এমন ১৩টি এলাকাকে 'প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার। এসব এলাকায় গাছপালা কাটা, প্রাণী শিকার, প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ধ্বংসকারী কার্যকলাপ, দূষণকারী কলকারখানা স্থাপন, বসতবাড়ি নির্মাণ, পাথরসহ খনিজ সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ।

প্রসঙ্গত, ভারতের বন্যপ্রাণী ও বন সংরক্ষণ কৌশল ২০০২ অনুসারে, প্রতিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা বনের ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই সীমা ২০ কিলোমিটার পর্যন্তও নির্ধারণ করা হয়।

ঝুঁকিতে সুন্দরবন: বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে পড়েছে ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। বাকি অংশ রয়েছে ভারতের মধ্যে। বাংলাদেশ অংশে এই বন দক্ষিণের সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, পিরোজপুর ও বরগুনা জেলার বিভিন্ন সীমানায় বিস্তৃত।

১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে জাতিসংঘের শিক্ষাবিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্গত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই বনের ২৩ শতাংশ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।
বন বিভাগের ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুন্দরবনের ইসিএ এলাকাতেই রয়েছে ১৯০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে ২৪টি হচ্ছে 'লাল শ্রেণির শিল্পপ্রতিষ্ঠান', যেসব কারখানা মারাত্মকভাবে পানি, বায়ু ও মাটি দূষণ করে। এসব কারখানা বন্ধ তো হয়নি, বরং এ ধরনের কারখানার সংখ্যা আরও বেড়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সমালোচিত উদ্যোগটি হলো, সুন্দরবনের ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাগেরহাটের রামপালে নির্মাণাধীন এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটিকে ঘিরে ওই অঞ্চলে আরও অনেক শিল্পকারখানা ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠছে। অনেক উদ্যোক্তা শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্দেশ্যে জমি কিনেছে, দখল করেছে। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের মুখেও বন্ধ হয়নি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ। আগামী মার্চে এই কেন্দ্রের একটি ইউনিট চালু হওয়ার কথা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বনের ভেতর দিয়ে কয়লাবাহী জাহাজের চলাচল বাড়বে। শিল্পকারখানার দাপটে সুন্দরবনের অস্তিত্বই সংকটে পড়বে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়বে এই বনের বাঘ রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, বর্তমান হারে ক্ষতিকর কার্যক্রম চলতে থাকলে ২০৫০ সালে হারিয়ে যাবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটি। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইসিএ কমানো হলে এই ধ্বংসযজ্ঞ আরও দ্রুত হবে।

জানতে চাইলে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ইসিএ ঘোষণাসংক্রান্ত বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তর দেখে। তারাই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, ইসিএ ঘোষণা করা হয় পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে। সুন্দরবনের জন্য ইসিএ ১০ কিলোমিটার। এটি পর্যালোচনা করা হবে কিনা, তা মন্ত্রণালয়ের বিষয়।

পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সুন্দরবনের ইসিএ ঘোষিত হয়েছে ১৯৯৯ সালে। এতদিন পর এটা নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করা হচ্ছে কেন? তিনি বলেন, সুন্দরবনের ইসিএ ১০ কিলোমিটারের মধ্যে যেসব কারখানা রয়েছে সেগুলো বন্ধ করতে বলেছেন আদালত। নতুন কারখানাও করা যাবে না। কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে, অনেক ব্যবসায়ী বনের আশপাশে ও বনসংলগ্ন এলাকায় জমি কিনেছেন- এসব কার্যক্রমকে বৈধতা দিতেই ইসিএ নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেছে সরকার।
পরিবেশ ও বন সচিব মোস্তফা কামাল এ প্রসঙ্গে বলেন, সুন্দরবনের ইসিএ কমানো হবে, বিষয়টি এমন নয়। কিছু যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর উত্তর খোঁজার জন্যই বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

আদলতের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে: ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট ঘোষিত হাইকোর্টের এক রায়ে সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে নতুন কোনো শিল্পকারখানা স্থাপন না করার নির্দেশনা রয়েছে। এক রিট আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি জেবিএম হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। এই রায়ে সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিতে বলা হয়।

বিষয় : সংকটাপন্ন এলাকার সীমা সুন্দরবনের সংকটাপন্ন এলাকার সীমা পরিবেশ আইনজীবী সমিতি

মন্তব্য করুন