‘করোনা থাকছে বিশ্বব্যাপী! করোনা থাকছে আমাদের সঙ্গে নতুন নতুন নামে! করোনাভাইরাস দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আর লকডাউন দিচ্ছে না! মানুষের জীবিকা বন্ধ করে জীবন চলে না এই বোধ ফিরে এসেছে দেশে দেশে! দেশে চলছে হাট- বাজার, সুপার মার্কেট, বাণিজ্য-মেলাসহ নানা ধরনের জনসমাবেশ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন লেখক এবং বই প্রেমী। গত দুই বছর যাবত করোনা মহামারির কারণে আমাদের প্রকাশনা শিল্প যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এই সময়কালে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় সহ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মূলত কোনো ধরনের বইই বিক্রি হয়নি। যে কারণে আজকে বাংলাদেশে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পটির নাম প্রকাশনা শিল্প। আমরা মনে করি, এবারের বইমেলা স্বল্প পরিসরে আয়োজন করে ১৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা যায় কিনা তা তিনি বিবেচনা করবেন।’

শনিবার বইবাড়ি রিসোর্ট এর উদ্যোগে শাহবাগস্থ পাঠক সমাবেশ কেন্দ্রে 'কেমন চাই অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২২' লেখক-পাঠক-প্রকাশক আড্ডায় এসব কথা বলেন বক্তারা। আড্ডায় লেখক পাঠক প্রকাশকবৃন্দ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেখ আদনান ফাহাদ, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক বিক্রেতা সমিতির সাবেক সভাপতি আকাশ প্রকাশনীর আলমগীর সিকদার লোটন, শ্রাবণ প্রকাশনীর রবীন আহসান, এক রঙা এক ঘুড়ি প্রকাশনীর শিমুল আহমেদ, নির্মাতা ও কথাসাহিত্যিক রেজা ঘটক, কবি ও সংগঠক নীলসাধু, বইবাড়ি রিসোর্টের সাইফুজ্জামান, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট যুবরাজ, কবি ও কথাসাহিত্যিক আরিফ ইমতিয়াজ উপস্থিত ছিলেন।

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ দ্রুত সময়ে জনগণের বড় অংশকে টিকা দিতে সক্ষম হয়েছে যা এই সরকারের একটি বড় সফলতা। এ বছর করোনার মধ্যেও প্রিয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা বন্ধ করে রাখার কোনো বাস্তবতা নেই। এবার করোনা পরিস্থিতি এখনও বিপদজনক কোনো পর্যায়ে আসেনি। তাই বাংলা একাডেমিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ১৫ দিনব্যাপী (ফেব্রুয়ারি ৭ থেকে ফেব্রুয়ারি ২১) অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২২ আয়োজনের আহ্বান জানাচ্ছি।

করোনার সংক্রমণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২২ সফল করার জন্য লেখক-পাঠক-প্রকাশকরা ১০টি সুপারিশ, প্রস্তাবনা দেন। সেগুলো হলো:

(১) স্বাস্থ্যবিধি মেনে 'নো মাস্ক নো এন্ট্রি' ও টিকা সনদ প্রদর্শন করে প্রবেশ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

(২) স্বাস্থ্যবিধির প্রয়োজনে মেলায় একাধিক ‘প্রবেশ পথ’ ও ‘বাহির পথ’ এর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

(৩) অমর একুশে বইমেলা ২০২২-এর সময় সূচি করা হোক প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা। ঢাকা শহর ও সারা দেশের মানুষের আগমন ও নির্গমন সুবিধার কথা চিন্তা করে এবং ভিড় এড়িয়ে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বইমেলার সময় সূচি নির্ধারণ করলে, একদিকে মানুষের ভিড় এড়ানো সুবিধা হবে। আবার অফিস ফেরত মানুষও বইমেলায় আসতে পারবেন।

(৪) অমর একুশে বইমেলা ২০২২ সফল করার জন্য ও বইমেলায় যাওয়া-আসার জন্য বইমেলা প্রাঙ্গণকে ঘিরে ঢাকা শহরের বিভিন্ন রুটে অন্তত ৫০টি বাস চালু করা হোক। বাংলা একাডেমি বিআরটিসি ও সিটি কর্পোরেশনকে সঙ্গে নিয়ে বইমেলার জন্য অতি সহজেই বাস সার্ভিস চালু করতে পারে। এখানে সদিচ্ছা ও উদ্যোগ নেওয়াটাই প্রধান ব্যাপার। আমরা চাই সবাই নির্বিঘ্নে বইমেলায় আসতে বা বাসায় যেতে পারেন এমন বাস সার্ভিস স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরেই চালু হোক।

(৫) ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স-সীমাদের জন্য মেলায় প্রবেশের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে করে অনাহুত জনসমাগম এড়ানো যাবে এবং যারা বইপ্রেমী মূলত তারাই বইমেলায় যাবেন ও বই সংগ্রহ করতে পারবেন। ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের আইডি কার্ড দেখিয়ে বিনা টিকেটে মেলায় প্রবেশ করতে পারবেন।

(৬) প্যাভিলিয়ন চতুর্দিকে খোলা না রেখে প্রবেশ ও বাহির পথসহ নির্মাণ করতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু জোনে নয়, প্যাভিলিয়নের অবস্থান হতে হবে পুরো মেলার সমানুপাতিক অবস্থানে। (প্রায় ৬০০ স্টলের বিপরীতে মাত্র ২০/২২টি প্রতিষ্ঠানকে প্যাভিলিয়ন নামের বড় অংশ বরাদ্দ দিয়ে পুরো মেলাকে ছন্দহীন করে রাখা হচ্ছে বছরের পর বছর। সামগ্রিক বিবেচনায় আমরা মনে করি, এই মেলায় প্যাভিলিয়ন বরাদ্ধ বন্ধ রাখা যেতে পারে যা বইমেলার নির্মল সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনবে।)

(৭) মেলায় প্রবেশ ও বাহির পথের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শাহবাগ, দোয়েল চত্বর ও রমনার মোড়ের ট্রাফিক ও পথচারীদের চলাচলের পথ সুগম রাখতে হবে। মেট্রো রেলের নির্মাণ স্থাপনা ও বিভিন্ন রোড ডিভাইডার ইত্যাদি সুশৃঙ্খল করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ দিবস (ভ্যালেন্টাইন ডে, পহেলা ফাল্গুন, অমর একুশ, শুক্রবার ও শনিবার) নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা করার প্রয়োজন, সেই দিনগুলোতে সর্বোচ্চ সংখ্যক পাঠক ক্রেতা মেলায় আসেন। নিরাপত্তা ইস্যু সহ পাঠক ক্রেতা দর্শনার্থীদের আসা যাওয়া নির্বিঘ্ন করার পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

(৮) খাবারের দোকান/ক্যান্টিন ছড়িয়ে ছিটিয়ে না দিয়ে নির্দিষ্ট জোনে দিতে হবে। টিএসসির গেট দিয়ে উদ্যানে প্রবেশের পর এলোপাতাড়ি খাবার ও কাবাব ইত্যাদির দোকান বরাদ্দ বন্ধ করতে হবে।

(৯) অমর একুশে বইমেলাকে শিশু বান্ধব বইমেলায় পরিণত করতে হবে। স্টল সজ্জা শিশুদের উপযোগী করে তৈরি করতে হবে। শিশুরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে মেলায় ঘুরাঘুরি সহ স্টলে প্রদর্শিত বই দেখতে পারে।

(১০) লেখক কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে যে আলোচনা আয়োজনটি নিয়মিত মেলা প্রাঙ্গণে হয় সেটির কলেবর আরও বৃদ্ধি করা হোক।