ক্রিকেট দুনিয়ায় ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগগুলোর মধ্যে কোনটি সেরা, এর কোনো মানদণ্ড নেই। তবে আকার, জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন, উঁচুমানের তারকাদের উপস্থিতি ও বাণিজ্যিক প্রসার—সব মিলিয়ে যেকোনো বিচারেই সবার ওপরে রাখা যায় ভারতের টি-টোয়েন্টি লিগ আইপিএলকে। এদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট মনে করে, ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টগুলোর মধ্যে ভারতের আইপিএলের পরই বিপিএলের অবস্থান। কিন্তু পরে শুরু করেও বিপিএলকে ছাপিয়ে আইপিএলের সাথে টক্কর দিচ্ছে পিএসএল। 

ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে জমজমাট আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) মানেই বিতর্ক আর অসংলগ্নতার ছড়াছড়ি। শুরুর আগেই প্রতিটি জায়গাতে অগোছালো আর অব্যবস্থাপনার ছাপ। প্রতিটি আসরেই বিপিএল দেখা মেলে এমন হ-য-ব-র-ল অবস্থা। করোনার কারণে ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে জমজমাটপূর্ণ এই টুর্নামেন্ট মাঠে গড়াচ্ছে এক মৌসুম পর। এটি হবে বিপিএলের অষ্টম আসর। ৭টি আসর পার করে এসেও বিপিএলে যেন খুঁজ পায়নি শক্ত ভিত। প্রতিবারই জোড়াতালি, আক্ষেপ আর অতৃপ্তি নিয়ে শুরু হয় বিপিএল।

আইপিলে বিশ্বমানের খেলার পাশাপাশি ক্রিকেটাররা পায় বিশ্বমানের অনুশীলন সুবিধা। প্রতিটি দলেরই আছে নিজস্ব হোম গ্রাউন্ড, নিজস্ব জিম ব্যবস্থা। কিন্তু বিপিএলের ছয় দল অনুশীলন করে একই মাঠে, গাদাগাদি করে। এখানে ভাগাভাগি করে চলে ফ্রাঞ্চাইজিদের অনুশীলন পর্ব। বিপিএল এলেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে মিরপুরের একাডেমি মাঠ। কেউ বিশ মিনিট, কেউ ত্রিশ মিনিট- এভাবেই চলে প্রস্তুতি। 

গতকাল বিসিবি একাডেমি মাঠের সেন্টার উইকেটে সকাল থেকেই অনুশীলন করছিলেন নুরুল হাসান সোহান। সাকিব আল হাসান মাঠে ঢোকার পর নেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন উইকেটরক্ষক এ ব্যাটার। উইকেট অন্য কারও দখলে চলে যেতে পারে ভেবে সাকিব আরও কিছুক্ষণ নেটে থেকে যেতে বলেন সোহানকে। কারণ সেন্টার উইকেটে ব্যাটিং সেশন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাকিব। কোনো বিড়ম্বনা ছাড়াই শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং অনুশীলন করতে পারেন সাকিব। বিষয়টি সাধারণ মনে হলেও দেশসেরা ক্রিকেটারের নেটের দখল পাওয়ার বিষয়টি মাঠস্বল্পতার বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়। ভাগাভাগির একখণ্ড মাঠে সবার থাকা চাই একসঙ্গে।

ঢাকার ক্রিকেট মানেই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম। অনুশীলনের ভেন্যু বলতে বিসিবি একাডেমি মাঠ। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, জাতীয় লিগ, বিসিএল, বিপিএল, জাতীয় দল, বয়সভিত্তিক দল, নারী দল সাবার ক্রিকেট অনুশীলন হয় এ মাঠে। বিপিএলে ছয় দলের অনুশীলনের ঠাসা সূচি রাখা হয়েছে একাডেমি মাঠে। 

গতকাল যেমন মাঠের পূর্ব দিকে ছিল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের অনুশীলন, পশ্চিমে ফরচুন বরিশালের। ফুটবল মাঠের আয়তনের এ ক্রিকেট ভেন্যুতে একসঙ্গে দুই দলের ৬০ জন থাকলে মনে হতে পারে সভা-সেমিনার হচ্ছে। মাঠটি আয়তনে এত ছোট যে, সেন্টার উইকেটে সেশন করলে বল উড়ে গিয়ে পড়ে বিসিবি কমপ্লেক্সে। কখনও কখনও রাস্তা থেকে বল কুড়িয়ে আনতে হয়। সাকিবের সেশনে গতকাল যেমন হলো, সাপোর্ট স্টাফদের ব্যস্ত থাকতে হলো বল কুড়িয়ে আনতে। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে দুটি দলের অনুশীলন শেষ হওয়ার আগে অন্য দুই দল অপেক্ষায় থাকে ভেন্যু পাওয়ার জন্য। সিলেটি স্যান্ড দিয়ে একাডেমি মাঠ তৈরি করা হলেও অনুশীলনের চাপে মাঠে ধুলা উড়তে থাকে। এর মধ্যেই মুখ বুজে অনুশীলন করতে হয় ক্রিকেটারদের। 

সেন্টার উইকেটে ব্যাটিংয়ের সুযোগ নিশ্চিত করতে সাকিবকে তাই বলতে হলো, 'সোহান আরও পাঁচ মিনিট থাক। আমি ব্যাট করব।' ক্লান্ত সোহান সাকিবের ডাকে সাড়া দিতে না পারায় অন্য দলের এক ক্রিকেটার সাকিবকে আশ্বস্ত করেন, 'কেউ নেই ব্যাট করার। সোহান ভাই গেলে সমস্যা নেই। আপনি করতে পারবেন ভাই।'

বিপিএলের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের অনুশীলন করার মতো তেমন কোনো মাঠ নেই ঢাকা শহরে। তবে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো চেষ্টা করলে ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় মাঠ ভাড়া নিয়ে ক্রিকেটারদের নিবিড় অনুশীলনের সুযোগ করে দিতে পারে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মাসকো সাকিব একাডেমিতে যেতে পারে কোনো কোনো দল। বাড্ডার বেরাইদেও আছে বেসরকারি একাডেমি মাঠ। 

ঢাকার বেড়িবাঁধের কাছে ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠেও প্রস্তুতির সুযোগ নিতে পারে। করোনা বাস্তবতায় সেটা সম্ভব না হলেও বিসিবি উদ্যোগ নিলে এই ভেন্যুগুলোকে কাজে লাগানো যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট মাঠেও খেলা হয় ক্রিকেট। সেখানেও বাধা থাকার কথা না অনুশীলনের। প্রয়োজন শুধু বিসিবির উদ্যোগ আর ফ্র্যাঞ্চাইজিদের অর্থ খরচের মানসিকতা দেখানো।