‘আমি হাসপাতালে যাব না, আমি তো বলেই এলাম—আমরণ অনশন করতে এসেছি। হাসপাতালে কেন যাব? আন্দোলনে এসেছি না?’

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে অনশনরত শিক্ষার্থী জান্নাতুল নাইম নিশাত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তিনি কান্না করতে করতে এসব কথা বলেন।

এর পর তাকে একপ্রকার জোর করে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। অনশনরত অসুস্থ এ শিক্ষার্থীর কান্না আর অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন পরিবেশ ভারি করে তোলে।

এ সময় পাশে থাকা আন্দোলনরত ইশরাত জাহান তৃশা নামের এক শিক্ষার্থীর কাছে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ কষ্ট আমরা আর সহ্য করতে পারছি না।’

এদিকে শিক্ষার্থীরা গত বুধবার দুপুর দুইটা ৫০ মিনিট থেকে এ পর্যন্ত মোট ২৯ ঘণ্টা ধরে অনশন চালিয়ে আসছেন। এ অবস্থায় ইতোমধ্যে ছয় শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। কিন্তু তাদের কেউ অনশন ভাঙেননি। এদের মধ্যে চারজন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং একজন জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। অনশনরত শিক্ষার্থীদের ১২ জনের শরীরে এখন স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে।

অনশনরত শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম অপূর্ব সমকালকে দুপুর ১২টার দিকে বলেছিলেন, আমাদের অনেকেই কমবেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমরা আমাদের পূর্ব ঘোষণায় অনড়, এই উপাচার্যের পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাবো।

এদিকে অনশনরত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য এসেছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

গত বুধবার ২৪ শিক্ষার্থী অনশন শুরু করলেও একজনের বাবা হার্ট অ্যাটাক করায় তিনি অনশন থেকে উঠে বাড়িতে যান।

অনশনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে এবং এর পরে শিক্ষকদের প্রতিনিধি দল এসে কথা বলে। 

সেখানে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সাস্টে কেন রক্ত, আর যেন রক্ত না ঝরে। এখন তোমাদের এবং আমাদের একটি সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য এখানে বারবার এসেছি। রক্ত যারা ঝরিয়েছে তাদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে এসেছি। তোমাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছি এবং তোমাদের সঙ্গে এক হয়ে এগুলো বন্ধ করতে চাই এবং বিচার করতে চাই।

তখন শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে মোহাইমিনুল বাশার বলেন, আপনাদের সঙ্গে আমাদের আবারও দেখা হবে। আমরা সবাই মিলে একটি সুন্দর ক্যাম্পাস তৈরি করতে চাই। কিন্তু এই উপাচার্যের কাছে আমরা নিজেদের নিরাপদ মনে করছি না, যে কথায় কথায় গুলি চালানোর হুকুম দেয়। এখন আপনারা আমাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছেন না। আমাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছেন, কিন্তু এখন আমাদের সহমর্মিতার প্রয়োজন নেই।

বেগম সিরাজুন্নেছা চৌধুরী ছাত্রী হলের প্রভোস্টের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার রাতে আন্দোলন শুরু হয়। 

সেখানে প্রভোস্ট কমিটির পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার পর থেকে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চলছে।

রোববার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। তখন শিক্ষার্থীরা ইট পাটকেল ছুড়তে থাকলে পুলিশ রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন শিক্ষক-কর্মকর্তারাও।

এ ঘটনায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নাম উল্লেখ না করে মামলা করেছে পুলিশ।

জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) মো. আবু খালেদ মামুন বলেন, রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া আইআইসসিটি ভবনের সামনে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং ক্যাম্পাসে অশান্ত পরিবেশ নিয়ে সোমবার এ মামলা করা হয়। সেখানে দুই থেকে তিনশ জনকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি।

এ ছাড়া রোববার সন্ধ্যায় জরুরি সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করার পর সোমবার দুপুর বারোটার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনের নির্দেশ উপেক্ষা করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা হলে তালা ঝুলিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।