রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা বলেছেন, এ ভাষণে দেশের প্রতিটি খাতে এ সরকারের আমলে অর্জিত বিস্ময়কর উন্নয়নের চিত্র নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি বলেছে, সরকারের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে, পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

নিয়মানুযায়ী গত ১৬ জানুয়ারি বছরের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি। রীতি অনুযায়ী এ ভাষণ সম্পর্কে চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এতে সমর্থন জানান সরকারি দলের সদস্য সামসুল হক টুকু। এর পর আলোচনায় রোববার অংশ নেন আওয়ামী লীগের মোসলেম উদ্দিন আহমেদ, প্রাণ গোপাল দত্ত, নুরুন্নবী চৌধুরী, নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন, হাবিবুর রহমান, কাজী নাবিল আহমেদ, নেসার আহমেদ, সৈয়দা রুবিনা আখতার, সুবর্ণা মোস্তাফা, মমতা হেনা লাভলী, নার্গিস জামান, বেগম জাকিয়া পারভীন খানম, বিএনপির রুমিন ফারহানা, ওয়ার্কার্স পার্টির লুৎফুন্নেসা খান এবং স্বতন্ত্র সদস্য রেজাউল করিম বাবলু।

আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের সদস্যরা বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণে গত সাড়ে ১৩ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের সাফল্য সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এত কম সময়ে এ উন্নয়ন বিশ্বের অনেক দেশের কাছে অনুকরণীয় হচ্ছে।

তারা বলেন, শেখ হাসিনা দেশের দায়িত্ব নেওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশ আবার বঙ্গবন্ধুর আদর্শে পরিচালনা করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা ও তার সুযোগ্য ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের হাত ধরে দেশ আজ ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরিত হয়েছে। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করে বিশ্বে স্যাটেলাইট ক্লাবের সদস্য হিসেবে দেশকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি চলছে।

এ ছাড়া তাদের বক্তব্যে উঠে আসে, দক্ষতার সঙ্গে বৈশ্বিক মহামারি করোনা মোকাবিলা করে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা সম্ভব হয়েছে। করোনাকালে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ। এ ধারা অব্যাহত রেখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সরকারের বিভিন্ন কাজের কঠোর সমালোচনা করেন। র্যাবের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কথা তুলে ধরে বিএনপির এই এমপি বলেন, পরিস্থিতি দেখে এটি স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এখানেই শেষ হচ্ছে না। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিশ্বের স্বনামধন্য ১২টি মানবাধিকার সংস্থা র্যাবের সদস্যদের জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে পদায়নের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে জাতিসংঘের কাছে দাবি জানিয়েছে। জাতিসংঘও বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে। জনগণের করের টাকায় চলা একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে দলীয় ক্যাডারের মতো ব্যবহার করে তাতে কর্মরত অনেক নিরপরাধ মানুষ এবং তাদের পরিবারের জীবনে সংকট তৈরি করেছে সরকার।

রুমিন বলেন, নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর এখন আর র্যাব গভীর রাতে সন্ত্রাসীদের নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে যাচ্ছে না। গোপন সংবাদ পেয়ে কোনো সন্ত্রাসীকে ধরতে গিয়ে আগে থেকে ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা পুলিশ বা র্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে না। আর তার পর পালানোর সময় মারা যাচ্ছে না কোনো নির্দিষ্ট মানুষ। ঠিক যেমন সন্ত্রাসীরা সাধু হয়ে গিয়ে র্যাবকে গুলি করা বন্ধ করেছিল সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদকে হত্যার পরপর।

রুমিন ফারহানা বলেন, এখন মার্কিন চাপে নানা দিকে তোড়জোড় শুরু করেছে সরকার। এখানেও আবার সঠিক পথে না গিয়ে উল্টো পথে হাঁটছে। গুম হওয়া বেশ কিছু মানুষের ব্যাপারে জাতিসংঘ তথ্য চেয়েছে। সরকার ব্যাপারটির সমাধান করতে চাইছে গুম হওয়া মানুষদের পরিবারের ওপর নতুন করে নিপীড়ন চালিয়ে। তাদের স্বজনকে কেউ তুলে নিয়ে যায়নি, এমন কথা লিখিত দিতে আর সাদা কাগজে সই দিতে বাধ্য করছে পুলিশ।

নির্বাচন কমিশন গঠন প্রসঙ্গে এই সংসদ সদস্য বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনকালীন সরকারের আচরণ। বাংলাদেশে যে চারটি নির্বাচনকে সুষ্ঠু ধরা হয়, তার প্রতিটিই হয়েছে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। ২০১৪ ও ২০১৮-এর পর নির্বাচনী বাস্তবতা আরও অনেক বেশি কঠিন। এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশনে যদি পাঁচজন ফেরেশতাও বসানো হয় তারপরও আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া অসম্ভব। সুতরাং এখনই সময় এই বিষয়ে একটি স্থির সিদ্ধান্তে আসা।

রুমিন বলেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু, বিরোধী দল ও মত দমন, বিরাজনীতিকরণ, সেপারেশন অব পাওয়ার মুছে ফেলে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের অধীন করা, বীভৎস দুর্নীতি, সবকিছুর ফল হয়েছে এই যুক্তরাষ্ট্রের মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশনের প্রতিবেদনে।

তিনি বলেন, গণতন্ত্রের সূচক প্রকাশকারী ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, ফ্রিডম হাউস, বেরটেলসম্যান স্টিফ টুং, ভি-ডেম, ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেক্টোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স, মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, সিভিল লিবার্টি নিয়ে কাজ করা সিভিকাস, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স, আইনের শাসনের সূচক প্রকাশকারী ওয়ার্ল্ড জাস্টিস রিপোর্ট, দুর্নীতির সূচক প্রকাশ করা টিআই, নির্বাচনের মান নিয়ে সূচক প্রকাশ করা ইলেক্টোরাল ইন্টেগ্রিটি প্রজেক্টের গত কয়েক বছরের রিপোর্টে বাংলাদেশের দুরবস্থার চিত্র পরিস্কার। এসবই সরকারের বিদায়ের ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। সরকারের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।