বয়সের চৌকাঠ ষাট পেরোনো জুলেখা। তার হাতের রেখায় রেখায় যেন মামলা লেখা। এক-দুই নয়, ২১ মামলা মাথায় নিয়ে ঘোরেন এই 'মাদক রানী'। গুনেও রেখেছেন, জেলে গেছেন কয়বার! জেনে রাখুন, সংখ্যাটা ৩০ বার। চারটি মামলায় সাজাও খাটা হয়ে গেছে তার। শুধু কী বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, মাদক বিস্তারে পাহাড়-সমুদ্রও আলাদা পছন্দ এই নারীর। সে জন্য কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবানেও আছে জুলেখার 'মাদক রাজ্য'। সেখানকার থানায় থানায় মামলার নথিতে আছে তার মাদক কারবারের ফিরিস্তি।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাদক মাঠে ৩০৪ নারীর বিচরণ থাকলেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ফর্দে আছে শীর্ষ ৪১ রানীর নাম। জুলেখা তাদেরই একজন। জুলেখার মতো আকলিমাও একই পথের পথিক! তার নামে মাদকের ১৮ মামলা। কারাগারের চৌদ্দ শিক ঘুরে এসেছেন ২১ বার। নগরের সিআরবি, বিআরটিসি, গোয়ালপাড়া, রেলওয়ে কলোনি ও তুলাতলীতে রাজত্ব করেন এই 'রানী'। গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা তার কাছে মামুলি। মাদক কারবার চালাতে গিয়ে পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানাতে পটু চল্লিশোর্ধ্ব এই নারী।

ভাই 'ডাইল করিমে'র হাত ধরে মাদকের নীল জগতে ঢুকে যাওয়া নগরের ছোটপুল এলাকার পারভীন মামলা খেয়েছেন ১২ বার। মাদক কারবারে পা রেখেই পারভীনের সম্পদের পালে লেগেছে হাওয়া।

আরও আছেন সাত মামলার আসামি ছোটপুল মুন্সিবাড়ির আবদুল গফুরের স্ত্রী বেবি আক্তার, পাঁচ মামলার আসামি আরেফিন নগরের মাহমুদা আক্তার মনিকা, টেকনাফের ফাতেমা বেগম ও হাবিবা খাতুন, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের অনন্তপুরের বাহার উদ্দিনের স্ত্রী মাহমুদ আক্তার, চার মামলার আসামি কুমিল্লার পাখি আক্তার, তিন মামলার আসামি রেশমি আক্তার, রাজিয়া বেগম ও মাহমুদা আক্তার মুনিয়া। তারা মাদকসহ ধরা পড়ে কারাগারে গেলেও কিছুদিন পর জামিন নিয়ে বের হয়ে আবার চেনা পথেই হাঁটেন।

সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সাদিয়ার গল্পটা আবার অন্যরকম। চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের এই নারী গত ১২ নভেম্বর ইয়াবা পাচারের সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। মাদক পাচারের সময় ঢাল হিসেবে তার সঙ্গী ছিল সাড়ে ছয় বছরের ছেলে ও তিন বছরের মেয়ে। নিজের শারীরিক অবস্থা ও দুই শিশু সন্তানকে ঢাল বানিয়েই মাদক কারবার জারি রেখেছিলেন তিনি। আগেও দু'বার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান সাদিয়া। এভাবে সন্তানদের ঢাল বানিয়ে মাদক কারবার করে কারাগারে আসা-যাওয়া এখন তার কাছে ডাল-ভাত!

শুধু সাদিয়াই নন, নিষ্পাপ শিশু সন্তানদের ঢাল বানিয়ে মাদক কারবারে জড়িয়ে যান কুমিল্লার বুড়িচংয়ের মেয়ে সোনিয়া। নগরের খুলশী থানার মাদক মামলায় ছয় বছরের ছেলে ও তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে ১৩ নভেম্বর ইয়াবা নিয়ে গ্রেপ্তার হন তিনি। মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জের চাঁদনী ৮ নভেম্বর মাদক মামলায় ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে কারাগারে যান।

একইভাবে এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে লক্ষ্মীপুর সদরের শরীফের স্ত্রী খায়রুন্নেচ্ছা মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হন। ২৬ নভেম্বর থেকে চট্টগ্রাম কারাগারে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে কারাভোগ করছেন তিনি। তাদের মতো ২০২১ সালে দুই সন্তান ও এক সন্তান নিয়ে মাদক মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন ১৫৩ নারী মাদক কারবারি ও পাচারকারী।

মায়ের অপরাধে ৭১৫ শিশুর বিনাদোষে কারাভোগ :পৃথিবীর আলোতে চোখ ফেলার পর মায়ের ভালোবাসায় শিশুরা বেড়ে ওঠে ধীরে ধীরে। তবে ৭১৫ শিশুর ভাগ্যে ছিল উল্টো যাত্রা। ভালোমন্দ বোঝার আগেই শিশুদের রঙিন জীবনটা বন্দি হয়ে পড়ে কারাগারের চার দেয়ালে। শিশুদের পড়াশোনা, বিনোদনসহ সব ব্যবস্থা সমাজসেবা ও এনজিও থেকে করা হলেও কারাগারে তাদের মানসিক বিকাশ ঠিকভাবে হয় না বলে মনে করেন কারা হাসপাতালের সহকারী সার্জন ডা. শামীম রেজা।

মাদকে ধরা ৩০০২ নারী, দণ্ডিত ১৪৫ :পাঁচশ কিংবা হাজার নয়; পাঁচ বছরে তিন হাজার দুই নারী মাদক নিয়ে ধরা পড়েছেন। বিপুল সংখ্যক নারী মাদকে জড়িয়ে যাওয়া সত্যিই ভয়ানক ও আতঙ্কের। এসব নারীর মধ্যে বহু নারী আছেন একবার মাদক নিয়ে ধরা পড়ে কারাগারে গিয়ে জামিন নিয়ে ফের মাদক নিয়ে ধরা পড়ে জড়াচ্ছেন নতুন মামলায়। একাধিক মামলায় অসংখ্যবার কারাভোগ করেছেন এরকম নারীর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যে পাঁচ বছরে ১৪৫ নারীকে মাদক মামলায় কারাদণ্ড দেন আদালত।

শীর্ষ সেই ৪১ রানী :মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় থাকা শীর্ষ ৪১ নারী মাদক কারবারি হলেন- জুলেখা, সানজিদা, রোজিনা, আয়েশা, রাজিয়া, দেলোয়ারা, রাশতী, আকলিমা (১), সাদিয়া, ইকরা চৌধুরী, জোসনা, আকলিমা (২), জিডি নাতাশা, নেহা, পরী, ফারজানা, মনিকা, নাছিমা, মনোয়ারা, রহিমা, পারভীন, পাখি, খাদিজা, বেবি, ফাতেমা, মারজান, হাবিবা, রেশমি, রোকসানা, সেলিনা, তাহমিনা, রোকছানা, যুঁথি, সীমা, জান্নাত, রিমা, হ্যাপি, কেয়া, দিলদার, ওয়াছ ও জোহরা। তারা নগরের রেলস্টেশন, কদমতলী বাস টার্মিনাল, মতিঝরনা, এনায়েতবাজার গোয়ালপাড়া, বায়েজিদ শেরশাহ কলোনি, বার্মা কলোনি, অক্সিজেন মোড়, ফিরোজ শাহ কলোনি, অলংকার মোড়, পাহাড়তলী, টাইগারপাস, বাটালি হিলসহ ৫০৯ স্পটে মাদক বিকিকিনি করেন।

দাপট বাড়ছে পাহাড়ি নারীর :মাদক কারবার ও পরিবহনে রোহিঙ্গা নারীদের দাপট থাকলেও এখন সেই জায়গায় ভাগ বসিয়েছে পাহাড়ি নারীরাও। আগে কোনো পাহাড়ি নারীর মাদক নিয়ে ধরা পড়ার রেকর্ড না থাকলেও এখন প্রতি মাসেই মাদক নিয়ে ধরা পড়ছেন তারা। ২০২১ সালে ২০ মাদক মামলায় ২১ পাহাড়ি নারী গ্রেপ্তার হন, যার বেশির ভাগের বাড়ি রাঙামাটি।

মাদক কারবারে যত কৌশল :পেটের ভেতর, পেঁয়াজ, কুমড়ায়, স্বামী-স্ত্রী, মা-ছেলে, সুন্দরী নারী, ভ্যানেটি ব্যাগসহ নানা অভিনব কৌশলে মাদক পাচারে যুক্ত নারী। ভুয়া স্বামী বানিয়ে মারজান আক্তার ট্রলিতে করে কুমিল্লা থেকে ১০ কেজি গাজা নিয়ে ফিরছিলেন চট্টগ্রামে। খুলশীর পাহাড়িকা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মারজান ও মানিক গ্রেপ্তার হয়। গ্রিন লাইনের মতো বিলাসবহুল বাসে যাতাযাত করে রোকসানা ডিলারদের কাছে পৌঁছে দিতেন ইয়াবা। রেলস্টেশন থেকে মা মর্জিনা ও ছেলে কাউছার আহমেদ তুহিন মাদক নিয়ে ধরা পড়েন। দেওয়ানহাটের পানির দীঘি এলাকায় পান বিক্রির আড়ালে স্বামী সাজু মিয়া ও স্ত্রী তাহমিনা বিকিকিনি করতেন মাদক। তাদের মতো কামাল ও যুঁথি দম্পতি, বাবুল-হিরণী, সাহাবুদ্দিন-হিরুণী, শাহাজাহান-সীমা বেগম দম্পতিও মাদক কারবারে ডুবে আছেন।

মাদকে বিদেশি নারী, পুলিশকে দেয় ধোঁকা :মাদক নিয়ে চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার ৩০-৪০ শতাংশ আসামিই রোহিঙ্গা নারী। খুবই কম টাকায় তাদের এ কাজে ব্যবহার করা যায়। তাদের মতো ২০ হাজার ইয়াবা নিয়ে ভারতীয় নাগরিক কোমল কর গ্রেপ্তার হন। ভারতের উত্তরাখে র নানকমাথা এলাকায় বাড়ি তার। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার রোজিনাও একই এলাকার বাসিন্দা। মাদক কারবার করতে গিয়ে পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানাচ্ছেন নারীরাও। গত বছরের ৩১ জানুয়ারি পটিয়া থানার টয়লেটের ভেন্টিলেটর ভেঙে চম্পট দেন লাইজু। যদিও সাড়ে পাঁচ মাস পর ফের তিনি ধরা পড়েন।

কে কী বলছেন :এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলোজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মাদকের সামাজিক, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মাদক কারবারিরা প্রথমে নারীদের টার্গেট করে মাদক সেবনে অভ্যস্ত করে। এরপর ওই নারীরাই মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করতে মাদক বহন, বিক্রি ও বাজার প্রসারিত করছেন। অনেক নারী আবার সংসারের আর্থিক সংকট নিরসনেও মাদকে জড়িয়ে পড়ছেন। তারা টাকার জন্য সব ধরনের ঝুঁকি নিচ্ছেন। আমি মনে করি, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এই সমস্যার লাগাম টানা যেতে পারে।
এক প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখার বলেন, মায়ের অপরাধে শিশুদের কারাভোগ যন্ত্রণাদায়ক। কারাগারে বেড়ে ওঠা শিশুরা চাইলেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক জীবনে যেতে পারবে না। তাদের মনটা অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠবে, যা সমাজের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের উপ-পরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, চট্টগ্রামে যত মাদক মামলা হচ্ছে, তার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ আসামিই নারী। দিন দিন মাদকে নারী কারবারি ও বাহকের সংখ্যা বাড়ছে। কারবারিরা সহজেই ও কম খরচে নারীদের দিয়ে মাদক পরিবহন করছেন। কারণ নারী ও শিশুদের প্রতি সবারই সহানুভূতি থাকে, সেটাকে কাজে লাগিয়ে থাকে পেশাদার মাদক কারবারিরা।
কারাগারের জেলার দেওয়ান মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, কারাগারে নারী বন্দিদের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই মাদক মামলার আসামি। অনেকে শিশু সন্তান নিয়েও আসছেন। যারা সন্তান নিয়ে কারাগারে আসেন, তাদের আলাদাভাবে রাখা হয়ে থাকে।