ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিজয় একাত্তর হলে প্রথম বর্ষের এক অসুস্থ শিক্ষার্থীকে গেস্টরুমে ডেকে নিয়ে গালিগালাজ, শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কয়েক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। বুধবার রাত ১০টার দিকে হলের টিভিরুমে এই ঘটনা ঘটে। 

ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর নাম আকতারুল ইসলাম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী। এই ঘটনায় তিনি হলের প্রাধ্যক্ষ ও কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুল বাছির বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

যাদের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ করেছেন- সমাজবিজ্ঞান বিভাগের কামরুজ্জামান রাজু, ইতিহাস বিভাগের হৃদয় আহমেদ কাজল, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইয়ামিম ইসলাম, মনোবিজ্ঞান বিভাগের ওমর ফারুক শুভ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাইফুল ইসলাম এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের সাইফুল ইসলাম রোমান। তারা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ সেশনের (দ্বিতীয় বর্ষ) শিক্ষার্থী। গেস্টরুমে উপস্থিত অন্যদের নাম জানা যায়নি।

এরা ছাত্রলীগের হল কমিটির পদপ্রত্যাশী আবু ইউনুস এবং রবিউল হাসান রানার অনুসারী। ইউনুস ও রানা ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের রাজনীতি করেন। ২০১৭ সালের ৩ জুন গায়ে ধাক্কা লাগা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে বেদম মারধরের অভিযোগে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার হন রবিউল হাসান রানা এবং আবু ইউনুস।  

জানা যায়, গত এক সপ্তাহ আগে বাবা স্ট্রোক করায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন ভুক্তভোগী আকতার। এছাড়া শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় তিনি গতকাল গেস্টরুমে যেতে পারেননি। অসুস্থতার কথা শুনেও তাকে রাত ১০টার দিকে হলের টিভিরুমে ডেকে পাঠায় অভিযুক্তরা। বাবার স্ট্রোক এবং শারীরিক অসুস্থতার কথা বলেও নিস্তার পাননি তিনি। উল্টো অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে তাকে ১০ মিনিট লাইটের দিকে তাকিয়ে থাকতে বলেন এই ‘বড় ভাইরা’। 

এমন মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন আকতার। একপর্যায়ে অবস্থা খারাপ দেখে তাকে রুমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রুমে গেলে তার বুকের ব্যথা শুরু হয় এবং একপর্যায়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। পরে তার রুমমেটরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যান। অবস্থা দেখে তার ইসিজি করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হলে ফেরেন তিনি।

এই ঘটনায় এখনও মানসিক অস্থিতরতায় ভুগছেন আকতার। তিনি বলেন, ভাইরা আমাকে ভয় দেখিয়ে হাসপাতালে আসার কথা কাউকে বলতে নিষেধ করেছেন। আমি খুব ভয়ে আছি। এখন যদি আমাকে হল থেকে বের করে দেয়।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আবু ইউনুছ বলেন, এটা আসলে অপ্রত্যাশিত। তারা যে গেস্টরুম নিচ্ছে সে বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। হল প্রশাসনের প্রতি আহ্বান থাকবে যেন দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। 

রবিউল হাসান রানা বলেন, এটা আসলে তারা ঠিক করেনি। প্রশাসনের প্রতি তদন্ত সাপেক্ষে  সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান থাকবে। 

এই বিষয়ে ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, এই বিষয়ে আমি জেনেছি। ছাত্রলীগের নাম ব্যবহারে কোনো ধরনের অন্যায় সহ্য করা হবে না। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। এছাড়া ছাত্রলীগের কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীর প্রতি ন্যূনতম অসম্মানজনক আচরণ করে থাকে, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আবদুল বাছির ভুক্তভুগীর সঙ্গে দেখা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন। এ বিষয়ে প্রাধ্যক্ষ বলেন, এই বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটিকে তিন কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হবে। সেই  আলোকে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদেরকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে।

টানা দেড় বছর বন্ধ থাকার পর গতবছরের ৫ অক্টোবর খুলে দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো। হল খোলার পর গণরুম বিলুপ্তির কথা থাকলেও আদতে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি, বন্ধ হয়নি গেস্টরুম। ক্যাম্পাস খোলার পর বিভিন্ন হলে অন্তত ১৫ শিক্ষার্থী বিভিন্ন সময় গেস্টরুমে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।