দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট ও নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিএনপি বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, নির্বাচন সামনে রেখে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিএনপি বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করছে। এটা বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে দেশবিরোধী চক্রান্ত। এই টাকা বিএনপি কোথা থেকে পেলো? বিদেশে কীভাবে পাঠানো হলো? এর জবাবদিহি বিএনপিকেই করতে হবে। এই টাকার পাই পাই হিসাব নেওয়া হবে।

র‌্যাবের বিরুদ্ধে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার তীব্র প্রতিবাদ করে সংসদ নেতা বলেছেন, যারা সন্ত্রাস দমনে সফল; সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করল; তাদের ওপর আমেরিকার এত রাগ কেন? অবশ্য আমেরিকাকে দোষ দেব না। ঘরের মধ্যে থাকা ইঁদুর বাঁধ কেটে দিলে সেই বাঁধ কীভাবে রক্ষা করা যাবে?

বৃহস্পতিবার একাদশ জাতীয় সংসদের ষোড়শ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাতীয় সংসদে পাস হওয়া নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন আইনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতন্ত্র আরেক ধাপ এগিয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, একমাত্র আওয়ামী লীগের অধীনেই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়। মানুষের ভোটের অধিকার রক্ষাই আওয়ামী লীগের কাজ। এই কাজ আওয়ামী লীগ করেই যাবে। আর আওয়ামী লীগ এটা করতে পেরেছে বলেই আজ দেশে এত উন্নয়ন ও অগ্রগতি। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের বিস্তারের প্রেক্ষাপটে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, যারা ভ্যাকসিন নেননি; করোনায় আক্রান্ত হলে তারাই মারা যাচ্ছেন। আর যারা ভ্যাকসিন নিয়েছেন, তারা মারা যাচ্ছেন না। এটা স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে জানা গেছে। কাজেই দেশবাসীকে বলব, সবাই করোনার টিকা নেবেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন, যাতে দেশকে আমরা ওমিক্রন থেকে মুক্ত রাখতে পারি।

নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আজ নির্বাচন নিয়ে কথা হয়। এদেশের নির্বাচনের ইতিহাস কী? বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জিয়াউর রহমানই 'হ্যাঁ-না' ভোট ও প্রহসনের ভোট করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। পরে এরশাদও নির্বাচনের নামে প্রহসন করেছেন। একেকজন মিলিটারি ডিক্টেটর নির্বাচনের নামে মানুষের ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছেন।

এ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৯৯১ সালের বিএনপি এবং ২০০১-২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়কার বিভিন্ন নির্বাচনের উদাহরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন নিয়ে খেলা তো সবসময় বিএনপিই খেলেছে। একমাত্র আওয়ামী লীগই ২০০১ সালে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল। আওয়ামী লীগ আমলেই কেবল অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হতে পারে- নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনই তার প্রমাণ।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক এদিন বহুল আলোচিত নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে আইন পাস ছাড়াও চলতি বছরের প্রথম এ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির দেওয়া ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবে সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনার সমাপনী ভাষণের পর ধন্যবাদ প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। পরে অধিবেশন সমাপ্তি সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ পড়ে শোনান স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা কী চেয়েছিলেন? এদেশের জনগণ পেটভরে ভাত খাবে; সুখে-শান্তিতে থাকবে; সুন্দরভাবে বাঁচবে। এটাই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল। আর এ জন্যই তিনি জীবন দিয়ে গেছেন। জাতির পিতার সেই আদর্শ নিয়ে বর্তমান সরকার কাজ করে চলেছে। ভোট দিয়ে টানা তিনবার ক্ষমতায় এনে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তোলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, 'জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে বলেই ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে পেরেছি। এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন ও তাদের কল্যাণের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরেছিলাম। অনেক বাধা-বিপত্তি এসেছে; আমাকে হত্যার জন্য গুলি-বোমা-গ্রেনেড হামলা হয়েছে। কিন্তু এসবের পরোয়া করিনি। কারণ আমি জানি, যে লক্ষ্য নিয়ে দেশে ফিরেছিলাম; সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারলেই জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারব।'

করোনাকালেও দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনায় দেশের প্রবৃদ্ধি ৮ ভাগে পৌঁছে গিয়েছিল। যদিও করোনার কারণে এই প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমেছে। সারাবিশ্বেই এই করোনার কারণে অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। আমেরিকার মতো দেশে নতুন করে আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। কিন্তু বাংলাদেশে কেউ দারিদ্র্যসীমার নিচে যায়নি। বরং বিএনপি আমলে দারিদ্র্যের হার যে ৪০ ভাগ ছিল, সেটা থেকে কমিয়ে আমরা ২০ ভাগে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। এটা আরও কমাতে পারব।

সংসদে পাস হওয়া নির্বাচন কমিশন আইনকে 'সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিল' আখ্যা দিয়ে সংসদ নেতা বলেন, এই বিলে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ২২টি সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, বিএনপি, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদের সংশোধনী প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়েছে। কাজেই এটাকে কেবল সরকারি আইন নয়, বরং এটা বিরোধী দলের বিল। এই বিল পাসের ফলে নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতন্ত্র আরও এগিয়ে যাবে।