শূন্যে ঝুলছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্য। একজন রাজনৈতিক বিশ্নেষক টেলিগ্রাফ পত্রিকাকে বলেছেন, চলতি সপ্তাহান্তেও বরিস জনসনকে প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল দেখলে তিনি বিস্মিত হবেন।
মোটেই বাড়িয়ে বলেননি ওই পর্যবেক্ষক। একের পর এক কেলেঙ্কারিতে বিপর্যস্ত জনসনকে যে কোনো মুহূর্তেই বিদায় নিতে হতে পারে। ডাউনিং স্ট্রিটে অবৈধ মদের পার্টির কেলেঙ্কারি নিয়ে তুমুল সমালোচনার মধ্যেই গত দু'দিনে তার আরও দুটি কাজ শোরগোল ফেলেছে। এর একটি হচ্ছে কঠোর লকডাউনের মধ্যেই সরকারি বাসভবনে জন্মদিনের পার্টি।
অন্যটি আরও বেশি বেদনাদায়ক। গত বছর তালেবানের হাতে কাবুলের পতন হওয়ার পর জনসন অসহায় আফগানদের তুলনায় পশ্চিমাদের কুকুর ও বিড়াল উদ্ধারে বেশি তৎপরতার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। এভাবে একের পর এক কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ায় জনসন তার রক্ষণশীল দলের মধ্যেও পদত্যাগ নিয়ে ভীষণ চাপের মধ্যে পড়েছেন। দলের বহু নেতা তার পদত্যাগের প্রতীক্ষায় ক্ষণ গুনছেন। জনসন সরে গেলেই তাদের কারও কারও ভাগ্য খুলে যেতে পারে।
ব্রিটিশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, জনসনের জীবনটাই কেলেঙ্কারিতে ভরপুর। তিন দশকের বেশি সময় আগে ১৯৮৮ সালে ব্রিটেনের 'টাইমস' পত্রিকায় সাংবাদিকতাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে বানোয়াট উদ্ৃব্দতি ব্যবহার করায় তার চাকরি চলে যায়। এরপর রক্ষণশীল দলের (কনজারভেটিভ পার্টি) এক নেত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে দলীয় পদও হারাতে হয় তাকে। এটা ২০০৪ সালের ঘটনা। পরে লন্ডনের মেয়র থাকাকালে এক নারীকে ব্যবসায়িক সুবিধা দিয়ে তার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু জনসন থেমে থাকেননি। নানা কৌশলে তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হতে সক্ষম হন।
সর্বশেষ কঠোর লকডাউনের মধ্যে মদের পার্টির ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর তার পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়েছে। ২০২০ সালের ২০ মে ডাউনিং স্ট্রিটের বাগানে ওই পার্টি করেছিলেন জনসন।
ওই পার্টিসহ লকডাউনের মধ্যে সরকারি কার্যালয়গুলোতে আয়োজিত পার্টি নিয়ে তদন্ত করছেন কেবিনেট অফিসের কর্মকর্তা সু গ্রে। আজকালের মধ্যে তার প্রতিবেদন জমা হতে পারে। এতে জনসনের কঠোর সমালোচনা করা হবে বলে ব্রিটিশ গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। সেটা হলে তার পদত্যাগই হবে একমাত্র উপায়। ওই রিপোর্টের জেরে পদত্যাগ করবেন না বলে জনসন মন্তব্য করলেও, রাজনৈতিক স্রোত এখন তার প্রবল প্রতিকূলে। তিনি পদত্যাগে রাজি না হলে তার বিরুদ্ধে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব উঠতে পারে।
২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে থেরেসা মে পদত্যাগ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হন জনসন। ওই বছরই কনজারভেটিভ পার্টির ইতিহাসে ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় জয় নিয়ে ক্ষমতায় আসেন জনসন।
ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দলের বেশ কয়েকজন এমপিও এরই মধ্যে খোলাখুলি তার পদত্যাগ দাবি করেছেন। তারা দলের ১৯২২ কমিটির প্রধানের কাছে জনসনের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে চিঠিও লিখেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, পার্লামেন্টের ৩৫৯ রক্ষণশীল এমপির মধ্যে ৫৪ জন জনসনের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে চিঠি লিখলে তাকে দলীয় প্রধান থাকা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। জনসন শেষ পর্যন্ত পদত্যাগে বাধ্য হলে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন। তবে চ্যান্সেলর রিশি সুনাক, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিতি প্যাটেল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্টের নামও সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে শোনা যাচ্ছে।
মানুষ নয়, প্রাণী :গত বছরের আগস্টে তালেবান কাবুল দখলের পর আফগানিস্তান থেকে মানুষের পরিবর্তে প্রাণী উদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন জনসন। বুধবার ফাঁস হওয়া এক ই-মেইল বার্তায় এ তথ্য জানা গেছে।
তালেবান কাবুল দখলের পর পশ্চিমাদের সঙ্গে কাজ করেছে বা তাদের সমর্থনে কাজ করা হাজার হাজার আফগান দেশ ছাড়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তাদের আশঙ্কা, তালেবান তাদের হত্যা করতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলো দ্রুত কাবুল থেকে তাদের কর্মী ও অনুগত আফগানদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করে। ওই সময় আফগানিস্তানে যুক্তরাজ্যের নাগরিক ফার্দিং পরিচালিত প্রাণীবিষয়ক দাতব্য সংস্থা দেশটিতে পোষা কুকুর ও বিড়াল সরিয়ে আনার দাবি জানায়। পরে ফার্দিং ও তার ১৫০টি প্রাণীকে যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে আফগানিস্তানে ফেলে আসা হয় সংস্থার ৬০ কর্মীকে। পরে এসব কর্মীকে পাকিস্তানে পাঠানো হয়। অথচ ওই সময় কাবুল বিমানবন্দরে আটকা পড়েছিল হাজার হাজার আফগান।
ওই সময় অভিযোগ ওঠে, মানুষের চেয়ে প্রাণী উদ্ধারে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল জনসন সরকার। আর এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছিলেন খোদ জনসন। অবশ্য এ অভিযোগের বিষয়ে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে জনসন একে 'অবাস্তব' বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সূত্র :বিবিসি, টেলিগ্রাফ, গার্ডিয়ান, রয়টার্স ও এএফপি।