ভেতরে-বাইরে ব্যাপক বিতর্কের মধ্যেই জাতীয় সংসদে পাস হলো বহুল আলোচিত নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের বিল। গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদে বিলের ওপর আনা বিরোধীদলীয় সদস্যদের কিছু সংশোধনী গ্রহণ করা হলেও মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে এই আইন পাসের ফলে দীর্ঘদিন পরে ইসি গঠনের পদ্ধতি সাংবিধানিক পূর্ণতা পেল।
গতকাল বিল পাসের সময় আইনমন্ত্রী যে সংশোধনীগুলো গ্রহণ করেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ছয় সদস্যের অনুসন্ধান (সার্চ) কমিটিতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুই বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে একজন নারী সদস্য থাকবেন। বিষয়টি আইনে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিলে অনুসন্ধান কমিটিকে ১০ কার্যদিবস সময় দেওয়া ছিল; সেটা বাড়িয়ে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে নাম প্রস্তাব করতে বলা হয়েছে। বিলের শিরোনামে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংসদে সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে এখন নাম হবে 'প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল'। উত্থাপনের সময় বিলের নাম ছিল 'প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল'।
এ ধরনের আরও অনেকগুলো সংশোধনী প্রস্তাব আনেন বিএনপি, জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও গণফোরামের ১২ জন সংসদ সদস্য। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ২২টি গ্রহণ করেন আইনমন্ত্রী। এগুলোর বেশিরভাগই শব্দগত পরিবর্তন। রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজে আলোচিত বিষয় নিয়ে ওঠা সংশোধনী প্রস্তাবগুলো তিনি গ্রহণ করেননি।
বিলটি এখন রাষ্ট্রপতির সইয়ের পর গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। আসছে ১৪ ফেব্রুয়ারি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হলে এই আইনের অধীনে তা গঠনের সুযোগ তৈরি হবে।
এর আগে গতকাল সকালে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। এতে 'প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২' পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। জাতীয় পার্টি, বিএনপি, জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্যরা বিলের ওপর জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে প্রেরণ ও সংশোধনী প্রস্তাব দিয়ে আলোচনায় অংশ নেন।
১৭ জানুয়ারি মন্ত্রিসভায় প্রথম এই আইনের খসড়ায় নীতিগত চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে গত রোববার বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী। ওই দিনই বিলটি পরীক্ষা করে সাত দিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। বুধবার দুটি পরিবর্তনের সুপারিশসহ প্রতিবেদন সংসদে তোলেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি শহীদুজ্জামান সরকার।
পরে আলোচনায় অংশ নিয়ে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন সার্চ কমিটিতে রাষ্ট্রপতির মনোনীত দু'জন বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে একজন নারী সদস্য রাখার প্রস্তাব দেন। এ ছাড়া তিনি সার্চ কমিটির সুপারিশ করা ১০ জনের নামের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশের বিধান যুক্ত করার কথা বলেন। তার প্রথম প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হলেও দ্বিতীয়টি করা হয়নি। পাশাপাশি একাধিক সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে সার্চ কমিটিতে সংসদের প্রতিনিধিত্ব রাখার দাবি তুললেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।
বিএনপির হারুনুর রশীদ একটি নির্বাচন কমিশন আইন গঠনের দাবি জানান। তিনি বলেন, এই আইনের মাধ্যমে আগামীতে দিনের বেলা নতুন কৌশলে নির্বাচন করবে কিনা, তা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন আছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
আইনে না থাকলেও প্রধানমন্ত্রীই সব করবেন বলে উল্লেখ করেন জাতীয় পার্টির শামীম হায়দার পাটোয়ারী। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিয়েই কাজ করতে হবে। আইনে না থাকলেও সার্চ কমিটির প্রস্তাবিত ১০ জনের নাম যাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তিনি পাঁচজন নির্বাচন করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন। রাষ্ট্রপতি তাদের নিয়োগ দেবেন।
গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান বলেন, রাষ্ট্রপতির সংলাপে অংশ নিয়ে তার দল যে প্রস্তাব দিয়েছে, তার প্রতিফলন এই আইনে নেই।
'আমাকে পানি খাইয়ে দিয়েছেন' :বিলটি পাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সংসদ সদস্যদের নানা সমালোচনার জবাব দেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। একপর্যায়ে আইনমন্ত্রী কিছুটা হাস্যোচ্ছলে বলেন, 'মাননীয় স্পিকার- অনেক দিন পর এমপিরা আমাকে পানি খাইয়ে দিয়েছেন।'
জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সংসদ সদস্যদের খসড়া আইনটি 'তড়িঘড়ি করে' আনার অভিযোগের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, তড়িঘড়ি করা হয়নি। এ আইনের কথা অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। ২০১৭ সালেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান কমিশনের মেয়াদের মধ্যে আইন করা সম্ভব নয় এটাও বলেছি। কারণ, করোনার কারণে সীমিত সময়ের জন্য সংসদ বসে। এর মধ্যে এই আইন পাস করা কঠিন হবে। সংসদকে শ্রদ্ধা জানিয়েই এটা বলেছিলাম।
এই আইন নিয়ে সমালোচনায় মুখর সংসদের বাইরে থাকা সাবেক সিইসি শামসুল হুদা ও সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের খসড়া প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, তাদের দেওয়া প্রস্তাবের সঙ্গে এই আইনের মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। তাদের অনেক প্রস্তাব আইনে রাখা হয়েছে; কিছু প্রস্তাব রাখা হয়নি।
আইনে সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাব সম্পর্কে আনিসুল হক বলেন, ইসি গঠনে সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়ে ২০১২ সালে রাজনৈতিক দলগুলো সম্মত হয়েছিল। তখন থেকেই এই সার্চ কমিটির ধারণা এসেছে। এটা আকাশ থেকে পড়া কোনো আবিস্কার নয়। সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠিত দুই কমিশন হয়েছে। যার কারণে এটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ফলে জনমত যাচাই দশ বছর ধরে হয়ে গেছে।
বিএনপির এমপিদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, এই সংসদেই বলা হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে তিন মেয়াদের জন্য। এ নিয়ে মামলা হলে আদালত দুটি বিধানকেই অবৈধ ঘোষণা করেন। তারা আদালতের রায়ও মানেন না। তিনি বলেন, আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, সংসদ চাইলে পরের দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। সংসদ এটি চায়নি।
ইসি আইনে কাউকে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়নি উল্লেখ করে পাল্টা বিএনপির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত খুনিদের রক্ষায় ইনডেমনিটি দেওয়ার কথা বলেন আইনমন্ত্রী। তিনি বিএনপির এমপিদের ঐকমত্যের আহ্বান প্রসঙ্গে বলেন, ঐকমত্য করতে হলে তাদের সত্য স্বীকার করতে হবে। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে বিএনপি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতে দেয়নি, খুনিদের পুনর্বাসিত করেছে। এসব সত্য মেনে জনগণের কাছে মাফ চাইলে আমরা ঐকমত্যে আসব।
কী হবে সার্চ কমিটির কাজ :সার্চ কমিটির (অনুসন্ধান কমিটি) কাজ সম্পর্কে পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, এ কমিটি স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করবে। আইনে বেঁধে দেওয়া যোগ্যতা, অযোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সুনাম বিবেচনা করে সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে।
সার্চ কমিটি সিইসি ও কমিশনারদের প্রতি একটি পদের জন্য দু'জন করে ব্যক্তির নাম সুপারিশ করবে। কমিটি গঠনের ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সুপারিশ রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দিতে হবে। বিলে বলা হয়েছে, সার্চ কমিটি সিইসি এবং নির্বাচন কমিশনার পদে যোগ্যদের অনুসন্ধানের জন্য রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠনের কাছ থেকে নাম আহ্বান করতে পারবে।
কারা থাকবেন কমিটিতে :বিলে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি ছয় সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করবেন, যার সভাপতি হবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। সদস্য হিসেবে থাকবে- প্রধান বিচারপতির মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুইজন বিশিষ্ট নাগরিক। এ দু'জন বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে একজন নারী হবেন। তিনজন সদস্যের উপস্থিতিতে কমিটির সভার কোরাম হবে। কমিটির কাজে সাচিবিক সহায়তা দেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
সিইসি ও কমিশনারদের যোগ্যতা :সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার পদে কাউকে সুপারিশের ক্ষেত্রে তিনটি যোগ্যতা থাকতে হবে বলে বিলে বলা হয়েছে। তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে; নূ্যনতম ৫০ বছর বয়স হতে হবে; কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি, বিচার বিভাগীয়, আধাসরকারি বা বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত পদে বা পেশায় পদে তার অনূ্যন ২০ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
অযোগ্যতা :সিইসি ও কমিশনার পদের জন্য ছয়টি অযোগ্যতার কথা বিলে বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- আদালত অপ্রকৃতিস্থ ঘোষণা করলে; দেউলিয়া হওয়ার পর দায় থেকে অব্যাহতি না পেলে; কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিলে কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে; নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাদে দ্বারা পদাধিকারীকে অযোগ্য ঘোষণা করছে না, এমন পদ ব্যতীত প্রজাতন্ত্রের কর্মে লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকলে।

বিষয় : ইসি আইন

মন্তব্য করুন