এতদিন সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে সাধারণত এড়িয়ে যেতেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। নির্দিষ্ট ইস্যু ছাড়া কথা বলতেন না। কিন্তু মেয়াদ শেষের ১৮ দিন আগে গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি হয়ে উঠলেন সর্বাত্মক আক্রমণমূলক। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, সিইসির কঠোর বাক্যে সমালোচনা করলেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ কমিশনের সমালোচকদের একহাত নিলেন। রেহাই পাননি তার সহকর্মী নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারও।
গতকাল নির্বাচন কমিশন বিষয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন 'রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি-আরএফইডির সঙ্গে এক সংলাপে অংশ নেন নূরুল হুদা। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচন কমিশন নিয়ে সমালোচনা থাকবেই। এটা বন্ধ করা যাবে না। সমালোচনা বন্ধ করতে হলে মার্শাল ল দিতে হবে। সেটা আর সম্ভব না।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে হওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে সিইসি বলেন, 'অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে আমি সিদ্ধান্তমূলক (কনক্লুসিভ) কিছু বলতে পারি না। কারণ, আমি তো দেখি নাই। আপনিও দেখেননি যে রাতে ভোট হয়েছে। এটা অভিযোগ আকারেই থেকে গেছে। আদালতের নির্দেশনা ছাড়া অভিযোগের তদন্ত হয় না।'
নূরুল হুদা বলেন, 'তদন্ত হলে বেরিয়ে আসত, বেরিয়ে এলে আদালতের নির্দেশে নির্বাচন বন্ধ হয়ে যেত। সারাদেশের নির্বাচনও বন্ধ হয়ে যেতে পারত। রাজনৈতিক দলগুলো কেন আদালতে অভিযোগ দেয়নি সেটা তাদের বিষয়। এ সুযোগ তারা হাতছাড়া করেছে।'

শামসুল হুদাকে অধিকার কে দিয়েছে :সাবেক সিইসি শামসুল হুদার উদ্দেশে নূরুল হুদা বলেন, 'কয়েক দিন আগে এটিএম শামসুল হুদা সাহেব সবক দিলেন। তিনি বললেন, আমাদের অনেক কাজ করার কথা ছিল, করতে পারিনি, বিতর্ক সৃষ্টি করেছি। একজন সিইসি হিসেবে তার কথা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।'
'নির্বাচন কমিশন সবচেয়ে জটিল প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এর মধ্যে একজন বাহবা নিয়ে যাবেন বা স্বীকৃতি নিয়ে যেতে পারে, এটা সম্ভব না। তার (শামসুল হুদা) পক্ষে সম্ভব; আমিত্ব বোধ থেকে বলতে পারেন,' বলেন সিইসি।
এটিএম শামসুল হুদা সাংবিধানিক ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ তুলে সিইসি বলেন, 'ইসির দায়িত্ব ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করা। তিনি নির্বাচন করেছেন ৬৯০ দিন পরে। এ সাংবিধানিক ব্যত্যয় ঘটানোর অধিকার তাকে কে দিয়েছে? তখন গণতান্ত্রিক সরকার ছিল না, সেনা সমর্থিত সরকার ছিল; ইমার্জেন্সির কারণে এটা করেছে। গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে করা সম্ভব না।'
তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করে নূরুল হুদা বলেন, ওই সময়ে মানুষের বাকস্বাধীনতা ছিল না। মানুষের মাথায় লাঠি ধরে, বন্দুকের নল উঁচিয়ে জরুরি অবস্থার মধ্যে নির্বাচন হয়েছে। এজন্য তখন এটিএম শামসুল হুদা কমিশন প্রশংসা পেয়েছিল। গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে নির্বাচন করা কঠিন।
বদিউল আলম মজুমদারকে একহাত :নবম সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে সুশাসনের জন্য নাগরিককে (সুজন) প্রার্থীদের হলফনামা প্রচারের কাজ দেওয়ার সমালোচনা করেন সিইসি নূরুল হুদা। তিনি বলেন, 'বিরাজনীতির পরিবেশের মধ্যে তিনি (শামসুল হুদা) এটা করেছেন। তিনি বদিউল আলম মজুমদারকে কীভাবে নিয়োগ দিয়েছেন? লাখ লাখ টাকা কীভাবে দিলেন? এ রকম অনেক কিছু করা যায়। ভেবেচিন্তে কাজ করতে হবে। অনেক কিছু সমালোচনার আছে।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, আগে থেকে পরিচিত হলেও সুজনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মসহ নানা ধরনের অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় ওই সংগঠনকে কোনো কাজে সম্পৃক্ত করেনি বর্তমান কমিশন।
'বদিউল আলম মজুমদার এই কমিশন নিয়ে অনেক কথা বলে ফেলেন। এটার একটা ইতিহাস আছে। এখানে যোগদানের পর থেকে সঙ্গে দেখা করতে চান। তাকে নিয়ে অনেক ঝামেলা, অনিয়ম। এক কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, কাজ না করে টাকা দেওয়া, নির্বাচন কমিশনে সভায় অনিয়ম নিয়ে সিদ্ধান্ত আছে। বর্তমান ইসির সময়ে কাজ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে বদিউল আলম এখন কমিশনের সমালোচনা করছেন,' বলেন নূরুল হুদা।
তিনি আরও বলেন, '(বদিউল আলম মজুমদার) দুই বছর আমার পেছনে ঘুর ঘুর করছেন। একা একা এসেছেন। খবর পেয়েছি প্রায় এক কোটি টাকা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ও অন্যান্য অভিযোগ রয়েছে। এ লোকের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা করা যায় না, বিশ্বাস করা যায় না। উনি নির্বাচন সংশ্নিষ্ট কোনো বিশেষজ্ঞ ..., কাজ নেই। সংবাদ সম্মেলন করার বিশেষজ্ঞ উনি। আমাদের তো তার দরকার নেই।'
বদিউল আলম মজুমদারকে উদ্দেশ করে নূরুল হুদা বলেন, 'তখন ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ইমার্জেন্সি সরকার, সেনাশাসিত একটা অবস্থা। ওই অবস্থা আর এখনকার অবস্থা এক না। কাউকে কাজ দিলে আমাকে বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে, যোগ্যতা আছে কিনা, যে কাজের জন্য বলছেন এ জন্য আপনার প্রয়োজন নেই।'
ইসির দায়িত্ব পালনে তার ওপরে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না বলে দাবি করেন সিইসি। তিনি বর্তমান নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের সমালোচনা করে বলেন, তার চিকিৎসার জন্য ইসি বছরে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এ ছাড়া তিনি কমিশনে কোনো মিটিং থাকলে তা নিয়ে আগে থেকেই খুঁত ধরতে থাকেন। গণমাধ্যম 'খাবে' এমন কথা বলতে থাকেন।
'নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, নির্বাচনব্যবস্থা এখন আইসিইউতে'-এ বিষয়ে নূরুল হুদা বলেন, 'উনি অসুস্থ মানুষ। নিজেও আইসিইউতে ছিলেন। ভারতে চিকিৎসা নিয়েছেন। আইসিইউ শব্দটি পরিচিত বলে ব্যবহার করেছেন।

প্রসঙ্গ দুর্নীতি :কমিশনের বিরুদ্ধে দেশের বিশিষ্ট ৪২ নাগরিকের দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে সিইসির ভাষ্য, ইভিএম ক্রয়ে কোনো অনিয়ম হয়নি। সরকারের ক্রয়নীতি অনুসরণ করেই এগুলো কেনা হয়েছে। প্রশিক্ষণে ব্যয় নিয়ে যে অডিট আপত্তি, এটা সব প্রতিষ্ঠানে হয়ে থাকে। অডিট আপত্তি মানেই দুর্নীতি নয়। এটা নিষ্পত্তিযোগ্য। নিষ্পত্তি হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এখনও হয়নি।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে বিনা ভোটে জয়ী হওয়ার বিষয়ে সিইসি বলেন, এতে কমিশনের কিছু করার নেই। এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। কোথাও কোথাও শতভাগের বেশি হারে ভোট পড়ার বিষয়ে নূরুল হুদা বলেন, ফল প্রকাশের পর ইসির আর কিছু করার থাকে না।
সরকারি গেজেট হওয়ার আগে এ ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনার বিরুদ্ধে ইসির কিছু করার আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ভোটকেন্দ্রের সমন্বিত ফলাফল আমাদের কাছে আসতে দেরি হয়। ফলাফল প্রকাশের আগে কমিশন নির্বাচন বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু আমাদের কাছে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে ইভিএমে বাতিল ভোট দেখানো হয়েছে, এটা কীভাবে সম্ভব- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, 'বিষয়টি জানা নেই।' প্রচার রয়েছে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংসের অভিযোগে আপনার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে- এ প্রশ্নের জবাবে নূরুল হুদা বলেন, এ ধরনের কোনো চিঠি তিনি পাননি।
সকাল ১১টায় নির্বাচন কমিশনের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন সচিব ও কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তাসহ সংশ্নিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।