মাঝেমধ্যে আমরা আত্মহত্যার কারণকে সামান্য বলে থাকি। এ কথার মধ্য দিয়ে আমরা একজন মানুষকে মূল্যায়ন করি না। মানুষ কোন অবস্থায় গেলে আত্মহত্যা করতে পারে, তা আমরা খতিয়ে দেখি না। আমরা হুট করে বলি, কেন আত্মহত্যা করল, বাবা-মায়ের কথা চিন্তা করল না। অনেকেই জানেন শরীরের কষ্টের চেয়ে মনের কষ্ট অনেক বড়। শরীরের কষ্ট সবাইকে বলা যায়। এই কষ্ট নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে ওষুধ দিচ্ছেন। কিন্তু মনের ব্যথা কি এভাবে কমানো যায়? মনের ভীষণ কষ্টের কথা তো অনেক সময় বাবা-মায়ের কাছেও বলা যায় না। সম্পর্কের অবনতির কথাও কাউকে বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়গুলো মা-বাবাকে বললে তারা নেতিবাচক অনুভূতি দেখান। ফলে বাচ্চারা বাবা-মাকে মনের কথা বলে না। সন্তান যখন বলে তার মনের চিকিৎসা দরকার, তখন মা-বাবারা খুব বিরক্ত হন। মানসিক স্বাস্থ্যকে সব ক্ষেত্রেই এভাবে অবহেলা করা হচ্ছে। মন খারাপ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা বাংলাদেশে তেমন নেই।

একটা বয়সে ছেলেমেয়ের বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের সম্পর্ক হওয়া খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এ স্বাভাবিক বিষয়কে বাবা-মা মেনে নিতে পারেন না। ফলে বাচ্চারা অনেক কিছু লুকিয়ে রাখে। আমাদেরই বাবা-মা হিসেবে ওদের কাছে টানতে হবে। ওরা আমাদের কাছে আসবে না, কারণ ওরা তো আরেকটি যুগে বসবাস করছে। তাদের সারা পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক হচ্ছে।

শিক্ষক, বাবা-মা, ভাইবোনসহ বাচ্চাদের পরামর্শ-উপদেশদাতা অনেক আছেন। কিন্তু বেশি উপদেশ অনেক বাচ্চার ভালো লাগে না। ফলে আমাদের কাছে মানসিক সমস্যা নিয়ে কেউ এলে আমরা সাইকোলজিক্যালি তাদের চিকিৎসা দিই। আমরা কোনো পরামর্শ, উপদেশ ও সিদ্ধান্ত দিই না। কেউ কোনো সমস্যায় পড়ে সিদ্ধান্ত চাইলেও আমরা দিই না। মানসিক সমস্যার বিষয়ে কাউকে সিদ্ধান্ত দেওয়া অনৈতিক। কারণ, আরেকটি মানুষ নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত যেন নিজে নিতে পারে। সে যেন নিজের মানসিক জায়গা শক্ত করে আবেগ ম্যানেজ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সে যেন আত্মবিশ্বাসী হয়। আমরা একটি সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে না। তাকে কোনো সিদ্ধান্ত দিলে তার কষ্ট আরও বেড়েও যেতে পারে।

কিন্তু সন্তানকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাবা-মা কিংবা স্কুলে শেখানো হয় না। ফলে তাদের জীবন দক্ষতা কম থাকে। আমরা শুধু পাঠ্যবই পাড়াচ্ছি। জীবনের ধাক্কাগুলো সামলে নেওয়ার বিষয়ে কেউ আমাদের শেখাচ্ছে না। একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, মর্যদাবোধ, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, মানসিক চাপ সংবরণের ক্ষমতা ও নেতিবাচক আবেগের সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দরকার। ফলে আমি শিক্ষার্থীদের কোনো উপদেশ দিতে চাই না। কারণ, এসব কথা কোনো কাজে লাগে না। আমরা যেন সন্তানের মনের কথা বুঝতে পারি। তাদের মনোজগৎ কীভাবে গড়ে উঠছে তা দেখতে হবে। বাচ্চাদের যথেষ্ট সম্মান করতে হবে। তাদের সব ইচ্ছার কথা শুনতে হবে। সব ইচ্ছা পূরণ করতে না পারলেও ভালো ব্যাখ্যা দিতে হবে। কিন্তু বাবা-মা তার সন্তানকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে চান। সন্তানকে তারা নিয়ে আসেন নিজের স্বার্থের জন্য। কিন্তু 'তুমি ধন্য থাকো, তোমাকে আমি পৃথিবীতে নিয়ে এসেছি'- বারবার এমন কথা শোনাতে শোনাতে তাকে বড় করা হয়। কিন্তু আমি যে আমার সুখের জন্য তাকে নিয়ে এসেছি, তা বলি না। এটা বললে সন্তানের মধ্যে অনেক বেশি আত্মমর্যাদা বাড়ত, সে নিজেকে গুরুত্ব দিত, নিজেকে মূল্যবান মনে করতে পারত।

ওদের মনকে কাছে টানার চেষ্টা করতে হবে। ওদের বুকের মধ্যে যখন কষ্ট হবে, তখন যেন বাবা-মায়ের ঘাড়ে মাথা রেখে কাঁদতে পারে। এখন একটি ছেলে প্রেমিকার কাছ থেকে কষ্ট পেলে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে না। কারণ তার সেই আস্থা নেই। আবার সন্তান যা চাইবে তাও দেওয়া যাবে না, তাকে ধৈর্য ধরা শেখাতে হবে। আসলে অনেক -মা-বাবাই এ বিষয়গুলো জানেন না। কারণ তাদের এ বিষয়গুলো কেউ শেখাননি। এ জন্য নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দেওয়া উচিত।

লেখক: অধ্যাপক, এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়