করোনা মহামারিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পর্যটন শিল্পের। এ ক্ষতি পূরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছরের সেপ্টেম্বরে এক হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু নানা শর্তের জটিলতায় কোনো উদ্যোক্তাই পাননি এ প্রণোদনার ঋণ। অথচ পর্যটন কেন্দ্রগুলো চালু হওয়ার পর বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই অর্থের অভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতে পারছেন না। অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলছেন। এরই মধ্যে করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের ধাক্কায় ফের পর্যটন কেন্দ্রগুলো পর্যটকশূন্য হয়ে পড়তে শুরু করেছে। ফলে আবারও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন পর্যটন উদ্যোক্তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অরুনিমা রিসোর্ট গলফ ক্লাবের চেয়ারম্যান খবির উদ্দিন আহমেদ এক কোটি টাকা ঋণের জন্য গত অক্টোবরে জনতা ব্যাংকের বড়দিয়া শাখা নড়াইল ও এরিয়া অফিস যশোর বরাবর আবেদন করেন। তিনি এ শাখার একজন নিয়মিত গ্রাহক। এর পরও ঋণ আবেদন করার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও ফাইলটি এখনও জনতা ব্যাংকের শাখা অফিসেই পড়ে আছে। একইভাবে হোটেল আগ্রাবাদের মালিক ও বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এইচএম হাকিম আলী ঋণের জন্য আবেদন করেছিলেন চট্টগ্রামের সাউথইস্ট ব্যাংকে। তিনিও এ পর্যন্ত ঋণ পাননি। ঋণ পাননি তারকা হোটেলগুলোর এ রকম ৪০ জনের বেশি মালিক। থিম বা অ্যামিউজমেন্ট পার্কের প্রায় ১০০ জন মালিকও আবেদন করে ঋণ পাননি। এ ছাড়া প্রণোদনার ঋণের পরিপত্রে ট্যুর অপারেটর, ট্যুর গাইডসহ পর্যটনের অনেক খাত, উপখাতের উল্লেখ না থাকায় ব্যাংকগুলো এসব খাতে ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে প্রণোদনা-সংক্রান্ত ঋণের নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়। কিন্তু ঋণ নেওয়ার জন্য আগের ঋণ পরিশোধের প্রত্যয়ন, ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল অ্যাসেসমেন্ট, জমির পর্চা, মিউটেশন অর্ডার শিট, মূল ও বায়া দলিল, হাল খাজনা, হাল আয়কর ও তল্লাশি প্রত্যয়ন, ইঞ্জিনিয়ার ভ্যালুয়েশনসহ অনেক ডকুমেন্ট দিতে হচ্ছে।

অথচ ট্যুর অপারেটর, গাইডসহ অনেক খাতে এসব ডকুমেন্ট দেওয়া সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ব্যাংকগুলো নিয়মনীতি মেনেই প্রণোদনার ঋণ দেবে। পর্যটন খাতে কেউ আবেদন করার পরও ঋণ না পেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে জানালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যাংকের কোন শর্ত কঠিন সেটা যদি তারা জানায় তাহলে পর্যালোচনা করে দেখা হবে, সেটি আসলে কঠিন কিনা। কোনো শর্ত বাদ বা সংশোধন করতে হলে সেটাও করা হবে। কারণ, প্রয়োজন আছে বলেই এ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সরকার।

ট্যুর অপারেটরদের ঋণ না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রজ্ঞাপনে বলা আছে, সেবা খাতে এ ঋণ দেওয়া হবে। ট্যুর অপারেটররা তো সেবা দিচ্ছে, অব্যশই তারা এ ঋণ পাবে। যদি প্রজ্ঞাপনের কথা বলে কোনো ব্যাংক ঋণ দিতে না চায়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) প্রেসিডেন্ট মো. রাফিউজ্জামান বলেন, পরিপত্রে নাম উল্লেখ না থাকায় ট্যুর অপারেটরদের ঋণ দিচ্ছে না ব্যাংকগুলো। এজন্য ট্যুরিজম বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ে আবেদনও করা হয়েছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, পর্যটন খাতের জন্য বরাদ্দ প্রণোদনা ঋণ কেউ পায়নি এমন অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে আসেনি। না পেয়ে থাকলে সহজে যেন পায়, এজন্য সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলব।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাবেদ আহমেদ বলেন, উদ্যোক্তারা প্রণোদনার ঋণ না পেলে আমাদের করার কিছু নেই। এর পরও ব্যাংকিং বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছি, এসএমই ফাউন্ডেশনকেও বলেছি। কিন্তু কেউ সহযোগিতা করেনি। কোনো সুবিধা তারা পায়নি।

করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেন। তবে শিল্প ও সেবা খাতের প্রণোদনা প্যাকেজটিই ছিল সবচেয়ে বড়। করোনার শুরু থেকে সবচেয়ে বেশি সময় বন্ধ ছিল পর্যটন শিল্প। এ খাতে লোকসান হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। চাকরি হারিয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। বিনা বেতনেও কাজ করেছে হাজার হাজার কর্মচারী। অথচ সরকারের কম সুদে ঋণ সুবিধা পর্যন্ত পায়নি পর্যটনের এই সেবা খাত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায়ীদের সহায়তা করতে কম সুদের এই ঋণ দেওয়া হয়েছে। তাই শর্ত পূরণ করলেই ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারছে। কে বেশি পেল, তা দেখা হচ্ছে না।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর পর্যটন খাতে শুধু হোটেল-মোটেল ও থিম পার্কের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দিতে এ ঋণ সুবিধার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এদিকে থিম বা অ্যামিউজমেন্ট পার্কের মালিকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় তাদের অনেক মেশিনারিজ নষ্ট হয়েছে। মেশিনারিজগুলো মেরামত করতে না পেরে বেশিরভাগ মালিক পার্ক ভালোভাবে চালাতে পারছেন না। মেশিনারিজ ঠিক থাকলে এবং পর্যটনকেন্দ্র চালু রাখা গেলে তারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সহজেই দিতে পারবেন।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যামিউজমেন্ট পার্কস অ্যান্ড অ্যাট্রাকশন্সের (বাপা) সমন্বয়ক অনুপ কুমার সরকার বলেন, ঋণ শুধু কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য। আবার এক বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে না পারলে ঋণখেলাপি হয়ে যেতে হবে। অথচ পর্যটন খাত কবে ঘুরে দাঁড়াবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এইচএম হাকিম আলী বলেন, কঠিন শর্তের কারণে তারকা হোটেলের কেউ এ ঋণ পাইনি। প্রধানমন্ত্রী যে উদ্দেশ্যে এটি ঘোষণা করেছেন, সেটি ভেস্তে যাচ্ছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এ খাতে ঋণের মোট সুদের হার হবে ৮ শতাংশ। এর মধ্যে উদ্যোক্তাকে দিতে হবে ৪ শতাংশ। সরকার ভর্তুকি হিসেবে দেবে ৪ শতাংশ। ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হলে বাড়ানো যাবে। সে ক্ষেত্রে সুদের হার ৮ শতাংশ দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা ভোগ করতে হলে ঋণ বিতরণের ১৫ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে।